kalerkantho

এ দেশেই রোহিঙ্গাদের অধিকারের আবদার

মিয়ানমারকে চাপ দেওয়ার বিষয়ে আগ্রহ কম জাতিসংঘ ও দাতাগোষ্ঠীর ♦ ভাসানচরে স্থানান্তর পরিকল্পনা নিয়ে শর্তের খড়্গ

মেহেদী হাসান   

২৬ মার্চ, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৪ মিনিটে



গণহত্যা চালিয়ে সাত লাখের বেশি রোহিঙ্গাকে তাড়ানোর পরও মিয়ানমারের বিরুদ্ধে তেমন কোনো ব্যবস্থাই নিতে পারেনি জাতিসংঘসহ আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়। বাংলাদেশে আশ্রয় নেওয়া সেই রোহিঙ্গাদের তাদের মাতৃভূমি মিয়ানমারে অধিকারসহ ফেরত পাঠানোর চেয়ে বরং এ দেশেই তাদের অধিকার প্রতিষ্ঠায় তৎপর হয়ে উঠেছে তারা। সংকটের টেকসই রাজনৈতিক সমাধানের চেয়ে দৃশ্যত মানবিক তৎপরতার দিকেই বেশি নজর তাদের। এখন তারা এ দেশেই রোহিঙ্গাদের শিক্ষা, জীবিকার সুযোগ সৃষ্টি, চলাফেরার অধিকার প্রতিষ্ঠার জন্য বাংলাদেশের প্রতি আহ্বান জানাচ্ছে।

এদিকে কক্সবাজারে আশ্রিত ১০ লাখেরও বেশি রোহিঙ্গার মধ্যে এক লাখ রোহিঙ্গাকে নোয়াখালীর ভাসানচরে স্থানান্তরে সরকারের পরিকল্পনা নিয়েও নানা প্রশ্ন তুলে শর্তের খড়্গ চাপাচ্ছে জাতিসংঘ ও এর সংস্থাগুলো। প্রায় দেড় বছর আগে মিয়ানমার থেকে এ দেশে নতুন করে রোহিঙ্গা ঢল নামার পর তাদের কক্সবাজারে একটি স্থানে না রেখে দেশের বিভিন্ন স্থানে রাখার পরামর্শ দিয়েছিল তারা। বাংলাদেশ রোহিঙ্গাদের জন্য ভাসানচর পুনর্গঠন করা শুরু করলে প্রথম দিকে পুরোপুরি নেতিবাচক অবস্থানেই ছিল জাতিসংঘ। তবে সংস্থাটি এখন সুর পাল্টে ‘অন্যত্র স্থানান্তর পরিকল্পনা’কে স্বাগত জানালেও ভাসানচর নিয়ে কারিগরি সমীক্ষা চালানোর কথা বলেছে।

ঢাকায় জাতিসংঘের আবাসিক সমন্বয়ের দপ্তর গতকাল সোমবার ভাসানচরে রোহিঙ্গা স্থানান্তর পরিকল্পনা প্রসঙ্গে বলেছে, “অন্যত্র স্থানান্তরের পদ্ধতিগুলো কী হবে সে বিষয়ে আমরা বাংলাদেশ সরকারের কাছে ব্যাখ্যা চাচ্ছি। ভাসানচরে যদি তাদের স্থানান্তরের সিদ্ধান্ত হয় তবে সেখানে বসবাসের পরিবেশ কেমন হবে, শরণার্থীরা কী ধরনের মৌলিক অধিকার ও সেবা পাবে, পাশাপাশি সেখানে ‘গভর্ন্যান্স’ কী হবে এবং দ্বীপটিতে জাতিসংঘ ও তার অংশীদারদের প্রবেশাধিকার ব্যবস্থা কী হবে সে বিষয়েও আমরা ব্যাখ্যা চাচ্ছি।”

জাতিসংঘ বলেছে, তারা ভাসানচরে সম্ভাব্য মানবিক সহায়তা কার্যক্রম বিষয়েও সমীক্ষা চালাচ্ছে। রোহিঙ্গাদের অন্যত্র স্থানান্তরের ক্ষেত্রে যথাসময়ে পর্যাপ্ত তথ্য সরবরাহ করে এবং রোহিঙ্গাদের সম্মতির ভিত্তিতেই তা বাস্তবায়নের ওপর জাতিসংঘ গুরুত্ব দিচ্ছে। এ ছাড়া এই প্রক্রিয়ায় রোহিঙ্গাদের মতামত নেওয়া ‘আবশ্যিক’ বলেও জানিয়েছে জাতিসংঘ।

সংশ্লিষ্ট একাধিক সূত্রে জানা যায়, ভাসানচর নিয়ে জাতিসংঘ ও এর সংস্থাগুলো রীতিমতো সরকারের সঙ্গে দর-কষাকষি করছে। ভাসানচরে স্থানান্তর করা রোহিঙ্গাদের আলাদা করে কোনো সুযোগ দেওয়া হলে পরে কক্সবাজারে অবস্থানরত অবশিষ্ট রোহিঙ্গাদেরও সেই সুযোগ দেওয়ার চাপ আসতে পারে।

এদিকে গতকাল ঢাকায় একটি হোটেলে ‘উচ্চপর্যায়ের যৌথ অংশীদারি মিশনের’ প্রতিনিধিরা রোহিঙ্গাদের শিক্ষা, জীবিকার সুযোগের ওপর গুরুত্বারোপ করেন। জাতিসংঘের পাশাপাশি ইউরোপীয় ইউনিয়ন (ইইউ), সৌদি আরব, কুয়েত, কাতার ও সংযুক্ত আরব আমিরাতের প্রতিনিধিরা ওই মিশনে ছিলেন। মধ্য এশিয়া ও মধ্যপ্রাচ্যের সঙ্গে জাতিসংঘের মানবিক অংশীদারিবিষয়ক সহকারী মহাসচিব রাশিদ খালিকভ বলেন, তাঁদের মিশন রোহিঙ্গাদের টেকসই ও নিরাপদভাবে ফেরার জন্য অনুকূল পরিবেশ সৃষ্টিতে মিয়ানমারে ‘ইতিবাচক উদ্যোগ’ অব্যাহত রাখার সুপারিশ করছে।

রোহিঙ্গা সংকটের রাজনৈতিক সমাধানের ওপর গুরুত্বারোপ করেন ঢাকায় কুয়েতের রাষ্ট্রদূত আদেল মোহাম্মদ হায়াতও। ইইউর মানবিক ত্রাণ সহায়তা দপ্তরের পরিচালক অ্যান্দ্রোলা কামিনারা রোহিঙ্গাদের জন্য এ দেশেই প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা ও জীবিকার সুযোগ দেওয়ার আহ্বান জানান। দীর্ঘ মেয়াদে বাংলাদেশেই রোহিঙ্গাদের অধিকার প্রতিষ্ঠার কথা বলছেন কি না জানতে চাইলে তিনি বলেন, শিগগিরই এ সংকট কাটবে কি না সে ব্যাপারে তিনি কোনো ভবিষ্যদ্বাণী করতে পারেন না। তবে দৈবক্রমে যদি আজ মিয়ানমারে সব কিছু ঠিক হয়ে যায় তবুও আগামীকালই রোহিঙ্গারা ফিরে যাবে না। যেকোনো জরুরি পরিস্থিতিতে শিক্ষার সুযোগসহ অধিকারের পক্ষে জোর দিয়ে তিনি বলেন, ‘শিক্ষার সুযোগ না থাকলে রোহিঙ্গাদের এই প্রজন্ম হারিয়ে যাবে।’

জাতিসংঘ শরণার্থী সংস্থার (ইউএনএইচসিআর) আঞ্চলিক প্রতিনিধি খালিদ খলিফা জানান, রোহিঙ্গাদের জন্য এ বছরের শুরুতে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের কাছে ৯২ কোটি মার্কিন ডলারের যে তহবিল চাওয়া হয়েছিল তার মাত্র ১৪ শতাংশ পাওয়া গেছে।

রোহিঙ্গাদের জন্য তহবিলের বড় অংশ মানবিক সেবা দেওয়া সংস্থাগুলোর প্রশাসনিক ও ভ্রমণকাজে ব্যয় করার অভিযোগ প্রসঙ্গে ইউএনএইচসিআরের আঞ্চলিক প্রতিনিধি বলেন, এই অভিযোগ ভিত্তিহীন। ত্রাণকর্মীরা বিনা পারিশ্রমিকে কাজ করবে না। তহবিল যৌক্তিকভাবে ব্যবহার করা হচ্ছে।

মন্তব্য