kalerkantho


চার ছিনতাইকারীর জবানবন্দি

টাকা ফোন দিতে না চাওয়ায় চলন্ত ট্রেন থেকে ফেলে হত্যা!

রেজোয়ান বিশ্বাস   

১২ জানুয়ারি, ২০১৯ ০০:০০



টাকা ফোন দিতে না চাওয়ায় চলন্ত ট্রেন থেকে ফেলে হত্যা!

প্রতীকী ছবি

কিশোরগঞ্জের চার ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী মোস্তাক আহম্মেদ মোস্তফা, আবুল কালাম, হোসেন ও আলামিন একসঙ্গে ঢাকায় আসছিলেন কিছু মালপত্র কিনতে। তাঁদের প্রত্যেকের সঙ্গে ছিল ৩০ হাজার করে টাকা। ট্রেনের ইঞ্জিন ও তার পেছনের বগির মাঝের অংশে বসে ছিলেন তাঁরা। গত ১৯ ডিসেম্বর সকালে ঢাকার বিমানবন্দর রেলস্টেশন পার হওয়ার পরপরই এক দল ছিনতাইকারী হামলে পড়ে তাঁদের ওপর। টাকা, মোবাইল ফোন ছিনিয়ে নিয়ে তিনজনকে চলন্ত ট্রেন থেকে ফেলে দেয় ওই ছিনতাইকারীরা। এতে মোস্তফা ঘটনাস্থলেই মারা যান। অন্যরা মারাত্মকভাবে আহত হন।  

ছেলে নিহত হওয়ায় জিআরপি থানায় হত্যা মামলা দায়ের করেন মোস্তফার বাবা। এরপর পুলিশ তামিম, মারুফ, হৃদয় ও ইসমাইল হোসেন সাগর নামের চারজনকে গ্রেপ্তার করে। চারজনের বয়স ১৮ থেকে ২২ বছরের মধ্যে। তাঁরা প্রত্যেকেই আদালতে ১৬৪ ধারায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছেন। জবানবন্দির একটি কপি পাওয়া গেছে। এতে দেখা যায়, চারজন একই রকম তথ্য দিয়েছেন।

সাগর তাঁর জবানবন্দিতে বলেন, তিনি বিমানবন্দর রেলস্টেশনসহ আশপাশের এলাকায় বোতল ও ‘ভাঙ্গারি’ টোকানোর কাজ করতেন। চট্টগ্রাম থেকে আসা মেইল ট্রেন গত ১৯ ডিসেম্বর সকাল সাড়ে ৬টার দিকে বিমানবন্দর রেলস্টেশনে পৌঁছলে তিনি ও তাঁর সহযোগী ইউসুফ ট্রেনের ইঞ্জিনের সামনে দিয়ে ছাদে উঠে দেখতে পান, তাঁদের পরিচিত তামিম, মারুফ ও হৃদয় আগে থেকে সেখানে ছিলেন। ওই সময় সাগর ও ইউসুফ তাদের কাছে গিয়ে ট্রেনে যাত্রীদের কাছ থেকে টাকা, মোবাইল ফোন ছিনতাইয়ের পরিকল্পনার কথা জানান। ইউসুফ সাগর ও হৃদয়কে দুটি চাকু দেন। ওই চাকু দিয়ে ট্রেনের যাত্রীদের কাছে যেতে বলেন এবং বাধা পেলে চাকু দিয়ে আঘাত করতে বলেন। এরপর ট্রেনটি ক্যান্টনমেন্ট রেলস্টেশন পার হলে সাগর, ইউসুফ, মারুফ ও হৃদয় ইঞ্জিনের পেছনে থাকা লোকজনের কাছে যান। সেখানে চারজনকে দেখতে পান তাঁরা। সাগর প্রথমে একজনের (মোস্তফা) কাছে সিগারেট চান। মোস্তফা সিগারেট নেই বলে জানালে তাঁকে ধমক দিয়ে তাঁরা বলেন, ‘তোর কাছে কী আছে, তা বের করে দে।’ সৈনিক ক্লাবের একটু পরে মোস্তফা টাকা ও মোবাইল ফোন দিতে রাজি না হলে ইউসুফ ও সাগর তাঁকে ধাক্কা দিয়ে নিচে ফেলে দেন। এরপর সাগর ও ইউসুফ আরেকজনের কাছে কী কী আছে দিতে বলেন। না দিলে ছুরি দিয়ে পায়ের হাঁটুতে ও মাথার পাশে আঘাত করেন। এরপর পকেট থেকে টাকা ও মোবাইল ফোন জোর করে ছিনিয়ে নিয়ে তাঁদেরও (কালাম ও আলামিন) চলন্ত ট্রেন থেকে বনানী এলাকায় ধাক্কা দিয়ে ফেলে দেওয়া হয়।

সাগর আরো বলেন, দুজনকে ফেলে দেওয়ার পর তাঁরা চতুর্থ লোকের (হোসেন) কাছে গিয়ে বলেন, ‘তোর কাছে কী আছে তাড়াতাড়ি বের করে দে। না হলে তোর পরিণতিও ওই দুজনের মতো হবে।’ তখন হোসেন ভয়ে কান্নাকাটি করলে তাঁকে চড়-থাপ্পড় মেরে কাছে থাকা নগদ টাকা ছিনিয়ে নেন তাঁরা। তবে তাঁকে ট্রেন থেকে ফেলে দেওয়া হয়নি। পরে ট্রেনটি কমলাপুর রেলস্টেশনে ঢোকার জন্য গতি কমালে খিলগাঁও ব্রিজের কাছে গিয়ে তারা ট্রেনের ইঞ্জিন থেকে ছাদে ওঠেন। এরপর সবাই মিলে ট্রেন থেকে নেমে কমলাপুর রেলস্টেশনের উত্তর-পূর্ব পাশের বাগানে চলে যান।

মোস্তফার মৃত্যুর কথা মনে পড়লে কান্নায় ভেঙে পড়েন তাঁর সেদিনের সঙ্গী আবুল কালাম, আলামিন ও হোসেন।

ট্রেনে ছিনতাইয়ের বিষয়ে কমলাপুর রেলওয়ে থানার ওসি ইয়াসিন ফারুক মজুমদার কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘ট্রেনে ছিনতাইয়ের ঘটনায় গত এক বছরে ৫০ জনের বেশি ছিনতাইকারীকে গ্রেপ্তার করেছি। ওই ছিনতাইকারীদের বেশির ভাগ ছিন্নমূল পথশিশু, কিশোর ও তরুণ। মোস্তফা হত্যাকাণ্ডে ব্যবহার করা দুটি ছুরি বিমানবন্দর স্টেশন এলাকার একটি পুকুর থেকে উদ্ধার করা হয়েছে। এ ছাড়া মোস্তফা ও তাঁর সঙ্গীদের কাছ থেকে ছিনিয়ে নেওয়া টাকার মধ্যে ১৯ হাজার টাকা উদ্ধার করা হয়েছে।’



মন্তব্য