kalerkantho


জাতির শ্রেষ্ঠ সন্তানদের গভীর শ্রদ্ধায় স্মরণ
শহীদ বুদ্ধিজীবী দিবস পালিত

‘কোনো স্বাধীনতাবিরোধীকে দেখতে চাই না’

নিজস্ব প্রতিবেদক   

১৫ ডিসেম্বর, ২০১৮ ০০:০০



‘কোনো স্বাধীনতাবিরোধীকে দেখতে চাই না’

গতকাল রায়েরবাজার স্মৃতিসৌধে মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় নতুন প্রজন্ম গড়ে তোলার প্রত্যয় নিয়ে হাজারো জনতা জাতির শ্রেষ্ঠ সন্তান শহীদ বুদ্ধিজীবীদের স্মরণ করে। ছবি : কালের কণ্ঠ

রাজধানীর রায়েরবাজার বধ্যভূমি। স্মৃতিসৌধের সামনে দাঁড়িয়ে আছেন শহীদ বুদ্ধিজীবীদের সন্তানরা। হাতে ধরে আছেন একটি ব্যানার। এতে লেখা ‘আমরা কোনো স্বাধীনতাবিরোধীকে দেখতে চাই না।’

গতকাল শুক্রবার সকালে শহীদ বুদ্ধিজীবী দিবসে এ দাবি নিয়েই মানববন্ধন করেন তাঁরা। ‘প্রজন্ম ৭১’ ব্যানারে হয় এ মানববন্ধন। অবশ্য বুদ্ধিজীবীদের সন্তানদের কণ্ঠেই শুধু নয়, বিভিন্ন বধ্যভূমি ও শহীদ মিনারসহ সারা দেশে একই আহ্বান শোনা গেছে জনতার মুখে। 

দিবসটি উপলক্ষে সকালে কালো পতাকা উত্তোলন, জাতীয় পতাকা অর্ধনমিতকরণ, শহীদদের স্মরণে নির্মিত স্মৃতিসৌধে পুষ্পস্তবক অর্পণের কর্মসূচি ছিল। ছিল আলোচনাসভা, শহীদদের স্মরণে মোমবাতি প্রজ্বালন, শোকযাত্রা, চিত্রাঙ্কন প্রতিযোগিতা, মিলাদ মাহফিলসহ নানা কর্মসূচি। ১৯৭১ সালের ডিসেম্বরে চূড়ান্ত বিজয়ের দুই দিন আগে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী ও তাদের দোসররা পরিকল্পিতভাবে দেশের মেধাবী সন্তানদের হত্যা করে।

গতকাল মিরপুর শহীদ বুদ্ধিজীবী স্মৃতিসৌধেও মানুষের ঢল নামে সূর্যোদয়ের আগেই। সকাল ৭টার দিকে ফুল দিয়ে শহীদ বুদ্ধিজীবীদের শ্রদ্ধা জানান রাষ্ট্রপতি মো. আবদুল হামিদ। শ্রদ্ধা নিবেদনের পর তিনি সেখানে কিছুক্ষণ নীরবে দাঁড়িয়ে থাকেন। এরপর রাষ্ট্রপতি যুদ্ধাহত মুক্তিযোদ্ধা ও শহীদ বুদ্ধিজীবীর স্বজনদের সঙ্গে কথা বলেন। রাষ্ট্রপতির পর প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা জাতির শ্রেষ্ঠ সন্তানদের শ্রদ্ধা জানান। প্রধানমন্ত্রী সেখানে কিছুক্ষণ নীরবে দাঁড়িয়ে থাকেন। এ সময় মন্ত্রিপরিষদের সদস্য, সংসদ সদস্য, তিন বাহিনীর প্রধান, ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের (ডিএসসিসি) মেয়র এবং উচ্চপর্যায়ের সামরিক ও বেসামরিক কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।

শেখ হাসিনা আওয়ামী লীগের সভাপতি হিসেবে দলের কেন্দ্রীয় নেতাদের নিয়ে শহীদ বুদ্ধিজীবী স্মৃতিসৌধে আরেকটি পুষ্পস্তবক অর্পণ করেন। এ সময় আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের, সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য অ্যাডভোকেট আব্দুল মতিন খসরুসহ দলের জ্যেষ্ঠ নেতারা উপস্থিত ছিলেন।

সকাল ৮টা ৫০ মিনিটে ধানমণ্ডি ৩২ নম্বরে বঙ্গবন্ধুর প্রতিকৃতিতে আওয়ামী লীগের পক্ষ থেকে শ্রদ্ধা জানানো হয়। মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রীর নেতৃত্বে শহীদ পরিবারের সদস্য ও বীর মুক্তিযোদ্ধারা সকাল ৭টা ২২ মিনিটে বুদ্ধিজীবী স্মৃতিসৌধে এবং সকাল সাড়ে ৮টায় রায়েরবাজার বধ্যভূমি স্মৃতিসৌধে পুষ্পার্ঘ্য অর্পণ করেন। একে একে শহীদ বেদিতে শ্রদ্ধা জানায় কেন্দ্রীয় ১৪ দল, শহীদ পরিবারের সন্তান ও যুদ্ধাহত মুক্তিযোদ্ধা, জাতীয় পার্টি, জাসদ, ওয়ার্কার্স পার্টি, বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টি, বাসদ, গণফোরামসহ বিভিন্ন সামাজিক ও সাংস্কৃতিক সংগঠন।

এদিকে রায়েরবাজারে আওয়ামী লীগের পক্ষ থেকে পুষ্পস্তবক অর্পণ করেন দলের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের। এ সময় দলের জ্যেষ্ঠ নেতারাও উপস্থিত ছিলেন। এরপর শ্রদ্ধা জানাতে আসেন নৌপরিবহনমন্ত্রী শাজাহান খান। এ ছাড়া ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়, বুয়েট, গণ বিশ্ববিদ্যালয়, ঢাকা প্রযুক্তি ও প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়, ডুয়েট, ইউনিভার্সিটি অব ডেভেলপমেন্ট অল্টারনেটিভসহ বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীরা শ্রদ্ধা জানায়। কেন্দ্রীয় খেলাঘর আসর, প্রজন্ম-৭১সহ শ্রদ্ধা জানাতে আসেন বিভিন্ন সাংস্কৃতিক সংগঠনের কর্মীরাও।

শহীদ বুদ্ধিজীবী ডা. আবদুল আলীম চৌধুরীর মেয়ে ডা. নুজহাত চৌধুরী বলেন, ‘আজ শহীদ বুদ্ধিজীবীদের সন্তানদের একটাই চাওয়া—দেশ থেকে যুদ্ধাপরাধীদের চিরতরে বিনাশ করতে হবে। সামনে নির্বাচন। আমরা জনগণের কাছে আপিল রাখতে চাই, যুদ্ধাপরাধী, যুদ্ধাপরাধীদের সহযোগী ও তাদের সন্তানদের ঘৃণাভরে প্রত্যাখ্যান করুন।’

ইউনিভার্সিটি অব ডেভেলপমেন্ট অল্টারনেটিভের (ইউডা) চেয়ারম্যান মুজিব খান বিশ্ববিদ্যালয়টির শিক্ষক ও শিক্ষার্থীদের নিয়ে রায়েরবাজারে শহীদ বুদ্ধিজীবীদের স্মৃতিসৌধে পুষ্পমাল্য অর্পণ করেন। তিনি কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘যে উদ্দেশ্যে শহীদরা আত্মাহুতি দিয়েছেন, তা যেন বাস্তবায়িত হয়—সেটাই আশা করি।’

ফুটে উঠল সেই আবহ : শহীদদের প্রতি শ্রদ্ধা জানাতে প্রতীকী অবস্থান কর্মসূচি পালন করে কেন্দ্রীয় খেলাঘর আসর। ‘স্মৃতিতে রায়েরবাজার বধ্যভূমি’ শীর্ষক এ কর্মসূচিতে খেলাঘরের কর্মীরা সাদা কাপড় পরে চোখে কালো কাপড় বেঁধে অবস্থান করেন। প্রতীকীভাবে অনেক শিশুকে গুলিবিদ্ধ হয়ে পড়ে থাকতে দেখা যায়, যেখানে ইট-পাথরের ওপর ছোপ ছোপ রক্তের আবহও ছিল। এর মধ্য দিয়ে ১৯৭১ সালের ১৪ ডিসেম্বরের বুদ্ধিজীবীদের হত্যার সময়কার একটি আবহ তৈরি করা হয়।

এদিকে দিবসটি উপলক্ষে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ঐতিহাসিক আমতলায় উদীচী শিল্পীগোষ্ঠী আয়োজন করে আলোচনাসভা। সেখানে মুক্তিযুদ্ধের চেতনাবিরোধী শক্তিকে বর্জন করে দেশপ্রেমিক প্রার্থীদের ভোটে বিজয়ী করার আহ্বান জানানো হয়। দিবসটি উপলক্ষে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সংগঠন স্বনন পরিবেশন করে গদ্যে-পদ্যে সাজানো অনুষ্ঠান ‘রক্তস্নাত বিজয়ী বাঙালি’।



মন্তব্য