kalerkantho


পিবিআইয়ের তদন্তে বেরোল খুনের নেপথ্য কাহিনি

আবদুর রহমান, কুমিল্লা দক্ষিণ প্রতিনিধি   

১৮ অক্টোবর, ২০১৮ ০০:০০



পিবিআইয়ের তদন্তে বেরোল খুনের নেপথ্য কাহিনি

কুমিল্লার মনোহরগঞ্জের কৃষক ইসমাইল হোসেন বাবুল (৪৮) সড়ক দুর্ঘটনায় মারা যাননি। তাঁকে খুন করা হয়েছে পরিকল্পিতভাবেই। অথচ হতদরিদ্র ওই কৃষকের লাশ উদ্ধারের পর থেকেই প্রচারণা চালানো হয়—সড়ক দুর্ঘটনায় তাঁর মৃত্যু হয়েছে। শুধু তাই নয়, লাশ উদ্ধারের পর প্রথমে সড়ক দুর্ঘটনা উল্লেখ করে সুরতহাল প্রতিবেদনও দেয় পুলিশ। নিহতের পরিবারের সদস্যরা হত্যা মামলা করতে গেলে মামলা না নিয়ে পুলিশ নিজেই বাদী হয়ে থানায় একটি সড়ক দুর্ঘটনার মামলা এফআইআর করে। এই খুনের ঘটনাকে ধামাচাপা দিয়ে আদালতে চূড়ান্ত প্রতিবেদনও (ফাইনাল রিপোর্ট) দেওয়া হয়। সেখানেও বলা হয়, কৃষক বাবুলের মৃত্যু হয়েছে অজ্ঞাতপরিচয় কোনো গাড়ির ধাক্কায়। পরে ওই কৃষকের স্ত্রী পুলিশের দেওয়া সেই প্রতিবেদনের বিরুদ্ধে আদালতে একটি নারাজি আবেদন করেন। আদালত বিষয়টি আমলে নিয়ে পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই) কুমিল্লাকে মামলাটি তদন্তের নির্দেশ দেন। তাদের তদন্তে বেরিয়ে আসে খুন আর খুনের নেপথ্যের কাহিনি।

গত ৫ অক্টোবর কালের কণ্ঠ’র শেষ পৃষ্ঠায় “পরিকল্পিত খুন’কে পুলিশ বানাল সড়ক দুর্ঘটনা!’ শিরোনামে অনুসন্ধানী প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়। এর পর ঘটনাটি নিয়ে সমালোচনার ঝড় ওঠে। খোদ পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশনের (পিবিআই) প্রধান পুলিশের উপমহাপরিদর্শক (ডিআইজি) বনজ কুমার মজুমদারের তদারকিতে সংস্থাটির কুমিল্লা টিম এই ঘটনার রহস্য বের করতে মাঠে নামে। এরপর মাত্র ১১ দিনের মধ্যেই কুমিল্লা জেলা পিবিআই প্রধান অতিরিক্ত পুলিশ সুপার মো. ওসমান গনির নেতৃত্বে সংস্থাটির কুমিল্লা ইউনিটের সদস্যরা ওই কৃষকের মৃত্যুর রহস্য বের করতে সক্ষম হন। পিবিআইয়ের তদন্তে বের হয়ে আসে সড়ক দুর্ঘটনায় নয়, পরিকল্পিতভাবেই খুন করা হয় কৃষক ইসমাইল হোসেন বাবুলকে। এর পর কয়েক দফা অভিযান চালিয়ে এই খুনের ঘটনায় পাঁচজনকে গ্রেপ্তার করে পিবিআই।

জানা গেছে, গত বছরের ২৫ আগস্ট রাত ২টার দিকে উপজেলার মনোহরগঞ্জ-হাসনাবাদ সড়কের দাদঘর গ্রামের রশিদ মিয়ার বাড়ির সামনে থেকে একই উপজেলার দুর্গাপুর গ্রামের অলি আহাম্মদের ছেলে ইসমাইল হোসেন বাবুলের লাশ উদ্ধার করে পুলিশ। আট সন্তানের জনক এই ব্যক্তি তাঁর পরিবার নিয়ে প্রায় ১১ বছর ধরে দুর্গাপুর গ্রাম থেকে প্রায় সাত কিলোমিটার দূরে বাইশগাঁও ইউনিয়নের লাকতমা এলাকায় স্থায়ীভাবে বসবাস করতেন। বাবুলের লাশ উদ্ধারের পর তাঁর বাঁ গালে আঘাতের চিহ্ন ছিল। শরীরের আর কোথাও আঘাতের চিহ্ন ছিল না। সে সময় স্থানীয় লোকজন ধারণা করে, বাবুলকে পরিকল্পিতভাবে হত্যা করা হয়েছে। বাবুলের ভাই ইউনুছ মিয়ার অভিযোগ, ঘটনার পর পুলিশ ঘটনাকে দুর্ঘটনা বানিয়ে প্রথমে একটি সুরতহাল প্রতিবেদন তৈরি করে। পরদিন তাঁরা থানায় হত্যা মামলা করতে গেলেও পুলিশ মামলা নেয়নি। উল্টো হুমকি দিয়ে তাঁদের থানা থেকে বের করে দেয়। পরে এক এএসআইকে বাদী করে একটি সড়ক দুর্ঘটনার মামলা করে পুলিশ। ঘটনার পাঁচ দিন পর ওই বছরের ৩০ আগস্ট তাঁর ভাবি মরিয়ম বেগম আদালতে ৯ জনকে আসামি করে একটি হত্যা মামলা দায়ের করেন। কিন্তু ওই মামলা নিয়েও পুলিশ গা করেনি।

যেভাবে মৃত্যুর রহস্য উদ্ঘাটন ও আসামিদের ধরল পিবিআই : চলতি বছরের ৩ এপ্রিল বাবুলের মৃত্যু হয়েছে অজ্ঞাতপরিচয় কোনো গাড়ির ধাক্কায় এমন কথা উল্লেখ করে মনোহরগঞ্জ থানার তৎকালীন পুলিশ পরিদর্শক (তদন্ত) মো. নজরুল ইসলাম আদালতে একটি চূড়ান্ত প্রতিবেদন দাখিল করেন। গত ৭ আগস্ট পুলিশের দেওয়া সেই প্রতিবেদনের বিরুদ্ধে আদালতে নারাজি আবেদন করলে কয়েক দফা শুনানি শেষে আদালত মামলাটি পিবিআইকে তদন্তের নির্দেশ দেন। গত ২ অক্টোবর মামলাটি তদন্তের দায়িত্ব পান পিবিআই কুমিল্লার উপপরিদর্শক (এসআই) মো.শাহজাহান। এরপর ৫ অক্টোবর কালের কণ্ঠে ওই অনুসন্ধানী প্রতিবেদন প্রকাশিত হলে বিষয়টি নজরে আসে সবার।

পিবিআই প্রধান পুলিশের উপমহাপরিদর্শক (ডিআইজি) বনজ কুমার মজুমদার, চট্টগ্রাম বিভাগীয় বিশেষ পুলিশ সুপার মোহাম্মদ ইকবাল, কুমিল্লা জেলা পিবিআই প্রধান অতিরিক্ত পুলিশ সুপার মো. ওসমান গনিসহ ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা মামলাটি তদারকি শুরু করেন। সংস্থাটির কুমিল্লা টিমের সদস্যরাও এ ঘটনার রহস্য বের করতে মাঠে নামেন। তাঁরা বিভিন্ন মাধ্যমে অনুসন্ধান ও তদন্তের মাধ্যমে জানতে পারেন সেদিন রাতে (২০১৭ সালের ২৫ আগস্ট) একটি ব্যাটারিচালিত অটোরিকশায় করে লাশটি ফেলা হয়েছিল। ওই দিন রাতে স্থানীয় একজন ব্যক্তি অটোরিকশাটির চালককে চিনতে পেরেছিলেন। পরে পিবিআই সদস্যরা খোঁজ নিয়ে জানতে পারেন, গত কয়েক মাস ধরে ওই অটোরিকশাচালক এলাকা থেকে লাপাত্তা। এরপর বিভিন্ন মাধ্যমে তথ্য সংগ্রহ করে পিবিআই সদস্যরা জানতে পারেন ওই অটোরিকশাচালক বর্তমানে চট্টগ্রামে পরিচয় গোপন করে রিকশা চালাচ্ছে। এরপর গোপন সূত্রের দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে তাঁরা জানতে পারেন চট্টগ্রামের বন্দর থানাধীন ফকিরহাট এলাকার রোহিঙ্গাপাড়া এলাকায় ওই অটোচালক রয়েছে। মামলার তদন্ত কর্মকর্তা এসআই মো. শাহজাহান পিবিআই জেলা প্রধানের সঙ্গে পরামর্শ করে ওই অটোচালকে গত ১৩ অক্টোবর রাতে সেখান থেকে আটক করেন। ওই অটোচালকের নাম মো. নাসির।

তাকে কুমিল্লায় এনে জিজ্ঞাসাবাদের একপর্যায়ে ওই অটোচালক হত্যার ঘটনার বর্ণনা এবং হত্যাকারীদের নাম প্রকাশ করে। এরপর ১৫ অক্টোবর সোমবার আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিলে আদালত ওই অটোচালককে জেলহাজতে প্রেরণের নির্দেশ দেন। সব শেষ ওই অটোচালকের দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে পিবিআই কুমিল্লা জেলা টিমের সদস্যরা সোমবার রাত থেকে মঙ্গলবার বিকেল পর্যন্ত অভিযান চালিয়ে এই পরিকল্পিত খুনের ঘটনায় চারজনকে গ্রেপ্তার করেন। গতকাল বুধবার দুপুরে গ্রেপ্তারকৃতদের কুমিল্লার আদালতের মাধ্যমে জেলহাজতে প্রেরণ করা হয়েছে। গ্রেপ্তারকৃতরা হলো—উপজেলা সদরের দিশাবন্দ গ্রামের আবুল কালাম ওরফে কালু মেম্বার, দুর্গাপুর গ্রামের বর্তমান মেম্বার আবদুল হক, একই গ্রামের ইসমাইল হোসেন ও মো. সুমন। এদের মধ্যে মেম্বার আবদুল হক ও ইসমাইল আদালতে বাবুলের স্ত্রীর দায়ের করা মামলার আসামি।

পিবিআই কর্মকর্তাদের বক্তব্য : মামলার তদন্ত কর্মকর্তা পিবিআই কুমিল্লার উপপরিদর্শক (এসআই) মো. শাহজাহান কালের কণ্ঠকে বলেন, সম্পত্তিসংক্রান্ত বিরোধের জেরে এই খুনের ঘটনা ঘটেছে বলে প্রাথমিকভাবে আসামিদের কাছ থেকে জানা গেছে। এ ছাড়া গ্রেপ্তারকৃতদের আরো বিস্তারিত জিজ্ঞাসাবাদের জন্য আদালতে রিমান্ডের আবেদন করা হয়েছে।

 

 

 



মন্তব্য