kalerkantho


হাজিরাতে ২৭ বছর পার, বিচার শেষ হয় না

আশরাফ-উল-আলম   

১৮ সেপ্টেম্বর, ২০১৮ ০০:০০



হাজিরাতে ২৭ বছর পার, বিচার শেষ হয় না

‘২৭ বছর জীবনের অনেক বছর। তখন ছিলাম যুবক। এখন বয়স বেড়েছে। অসুখ-বিসুখে ভুগছি। এখন আর পারছি না। এতগুলো বছর আদালতে ঘুরছি। কিন্তু আইন আমাকে কী দিয়েছে? শুধু লাঞ্ছনা-গঞ্জনা আর ভোগান্তি। বেঁচে থাকতে প্রমাণ করতে চেয়েছিলাম—আমি নির্দোষ। কিন্তু সে সুযোগ হয়তো আর হবে না। মামলার যে গতি, জীবদ্দশায় শেষ হবে কি না, জানি না।’

কথাগুলো কালের কণ্ঠ’র কাছে বলছিলেন ঢাকার আদালতে বিচারাধীন একটি মামলার আসামি সৈয়দ মোশাররফ হোসেন মীর।

মোশাররফ জানান, রাজধানীর তেজগাঁও থানায় ১৯৯১ সালে দায়ের করা এক ডাকাতি মামলার আসামি তিনি। ২৭ বছর আগে তিনি বিএডিসিতে (বাংলাদেশ কৃষি উন্নয়ন করপোরেশন) শ্রমিক পদে চাকরি করতেন। ওই সময় বিএডিসির কেন্দ্রীয় সংরক্ষণাগারের মালপত্র লুট করে নিয়ে যায় দুষ্কৃতকারীরা। ওই মামলায় অন্যদের সঙ্গে আসামি করা হয় তাঁকে। সেই থেকে তিনি এই মামলায় হাজিরা দিচ্ছেন। তিনি এখন এই শেষ বয়সে নিষ্কৃতি চান।

মোশাররফ এটাও জানান যে তাঁকে প্রথম সন্দেহমূলকভাবে গ্রেপ্তার করে পুলিশ। তারপর পুলিশ অনেক টাকা চায়। টাকা না দেওয়ায় তাঁকে আসামি করা হয়। তিনি বিশ্বাস করেন, এ মামলায় তিনি খালাস পাবেন।

ঘটনার বিবরণ : ১৯৯১ সালের ১৬ মে রাত ২টার দিকে রাজধানীর তেজগাঁওয়ে বাংলাদেশ কৃষি উন্নয়ন সংস্থার (বিএডিসি) কেন্দ্রীয় সংরক্ষণাগারের তিনজন পাহারাদারের হাত, পা, চোখ, মুখ বেঁধে তালা ভেঙে দৃষ্কৃতকারীরা ভেতরে থাকা সেচযন্ত্রের বিভিন্ন যন্ত্রপাতি ও অন্যান্য কৃষি যন্ত্রপাতি বের করে একটি পিকআপে করে নিয়ে যায়। পরে স্থানীয় লোকজন ও ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা ঘটনাস্থলে এসে পাহারাদারদের বাঁধন খুলে দেন। এ ঘটনার পরদিন কেন্দ্রীয় সংরক্ষণাগারের নির্বাহী প্রকৌশলী (যন্ত্রাংশ) মো. মহসীন ভূঁইয়া বাদী হয়ে তেজগাঁও থানায় একটি ডাকাতি মামলা করেন। মামলায় দুষ্কৃতকারীরা আনুমানিক ১০-১৫ লাখ টাকার মালপত্র লুট করে বলে অভিযোগ করা হয়।

তদন্ত চলে ১৯ বছর : মামলাটি হওয়ার পর পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি) তদন্তভার নেয়। কয়েকজন কর্মকর্তা এই মামলা তদন্ত করেন। তদন্তকালে ঘটনার সঙ্গে জড়িত সন্দেহে বিএডিসির উপসহকারী প্রকৌশলী মো. মঞ্জুর রহমান খানসহ বিএডিসির বেশ কয়েকজন কর্মকর্তা-কর্মচারী ও শ্রমিককে গ্রেপ্তার করা হয়। তদন্ত চলাকালে গ্রেপ্তারকৃত মঞ্জুর রহমান খান ও মোবারক হোসেন ১৯৯৩ সালের ৫ জানুয়ারি হাইকোর্টে মামলার কার্যক্রম বাতিলের আবেদন জানান। এই আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে হাইকোর্ট মামলার কার্যক্রম স্থগিত করেন। প্রায় আট বছর কার্যক্রম স্থগিত ছিল। পরে স্থগিতাদেশ প্রত্যাহার হলে ২০০২ সাল থেকে আবার তদন্ত শুরু হয়। ২০১০ সালের ১০ অক্টোবর মঞ্জুর রহমান খান, বিপুল চন্দ্র বিশ্বাস, খন্দকার রফিকুজ্জামান, মো. মোবারক হোসেন, শ্রমিক সৈয়দ মোশাররফ হোসেন মীর, আবদুর রহমান বাবলু, আবদুল মালেক, আবুল হোসেন, শাহজাহান হাওলাদার, মোবারক ও রুহুল আমিনের বিরুদ্ধে অভিযোগপত্র (চার্জশিট) দেয় সিআইডি। অব্যাহতি দেওয়া হয় আটজনকে।

বিচারের জন্য স্থানান্তর : অভিযোগপত্র দেওয়ার পর ঢাকার মুখ্য মহানগর হাকিম আদালত থেকে মহানগর দায়রা আদালতে নথি পাঠানো হয়। পরে মামলাটি দ্বিতীয় অতিরিক্ত মহানগর দায়রা জজ আদালতে স্থানান্তর করা হয়। ২০১১ সালে আসামিদের বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠন করা হয়। ছয় বছর ধরে বিচার চলছে। মাত্র একজন সাক্ষী সাক্ষ্য দিয়েছেন।

আসামিপক্ষের আইনজীবী মো. হাফিজুর রহমান কালের কণ্ঠকে বলেন, এ মামলায় মোট ৭৪ জনকে সাক্ষী করেছেন তদন্ত কর্মকর্তা। এ কারণে মামলা নিষ্পত্তি হবে, সে নিশ্চয়তা নেই। তিনি বলেন, এই মামলার আসামিরা চরম ভোগান্তি পোহাচ্ছেন।

আদালতের অতিরিক্ত সরকারি কৌঁসুলি (পিপি) মো. এস এম জাহিদ হোসেন বলেন, সাক্ষীদের হাজির করার জন্য আদালত থেকে সব ধরনের চেষ্টা করা হচ্ছে। কিন্তু সাক্ষী হাজির হচ্ছেন না। এ কারণেই মামলা নিষ্পত্তি হচ্ছে না। মামলা যাতে দ্রুত নিষ্পত্তি করা যায় সে চেষ্টা করা হবে।

আসামি-সাক্ষীর মৃত্যু : মামলার নথি থেকে জানা যায়, এ মামলা দায়েরের পর গ্রেপ্তার হয়েছিলেন মেহের আলী ও মহব্বতউল্লাহ মণ্ডল নামের আরো দুজন। মামলার তদন্ত চলাকালেই এই দুজন মৃত্যুবরণ করেন।

আসামি মোশাররফ হোসেন জানান, যাঁরা আসামি তাঁদের মধ্যে আরো দু-তিনজন মারা গেছেন। সাক্ষীদের মধ্যেও অনেকে মারা গেছেন বলে তিনি শুনেছেন।

সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী জাকারিয়া হায়দার কালের কণ্ঠকে বলেন, ২৭ বছর আগের ঘটনার সাক্ষীদের অনেকেই এখন চাকরিতে নেই। অনেকের মৃত্যু হওয়াও স্বাভাবিক। অনেকেই ঢাকার বাসাবাড়ি ছেড়ে চলে গেছেন। এ মামলা যত দিনই চলতে থাকবে সাক্ষী পাওয়া যাবে না। কাজেই মামলা দ্রুত নিষ্পত্তির পথ খুঁজে বের করতে হবে। রাষ্ট্রপক্ষকে উদ্যোগ নিতে হবে। তিনি বলেন, একটি অপরাধের বিচার হতে হবে। আবার ওই বিচার করতে কাউকে চরম ভোগান্তিতে ফেলে দেওয়াও অন্যায়, অবিচার।



মন্তব্য