kalerkantho


পরিচ্ছন্নতাকর্মী-জনসাধারণ সবাই স্বাস্থ্যঝুঁকিতে

রাজধানীতে খোলা ভ্যানে বর্জ্য সংগ্রহ

শাখাওয়াত হোসাইন   

১৫ সেপ্টেম্বর, ২০১৮ ০০:০০



রাজধানীর বাড্ডা এলাকার হাছেন আলী রোড। উপচে পড়া বর্জ্যবোঝাই খোলা ভ্যান টেনে নিয়ে যাচ্ছেন দুই যুবক। গন্তব্য নতুন বাজার এলাকার সেকেন্ডারি ট্রান্সফার স্টেশন (এসটিএস)। বর্জ্য বহনকারী ভ্যানটিও যেন ময়লার ভাগাড়! পচা গন্ধে নাক চেপে ধরেছে বিরক্ত পথচারীরা। জামা নাকে গুঁজে দিয়েছে পথচারী নারীরা। এত কিছুর পরও হয়তো বমির উদ্রেক হয় অনেকের। এদিকে কাঁধে পুরনো টিউব জড়িয়ে বেপরোয়া গতিতে ভ্যান ঠেলে চলেছেন নির্বিকার দুই যুবক। গায়ে ময়লা থেকে সুরক্ষার কোনো পোশাক নেই। জুতা জোড়া জরাজীর্ণ। বৃহস্পতিবার সরেজমিন ঘুরে এমন দৃশ্য দেখা গেছে ঢাকা উত্তর ও দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের আরো বেশ কয়েকটি এলাকায়।

খোলা ভ্যানে বর্জ্য সংগ্রহ ও পরিবহনের কারণে এমন ভোগান্তির শিকার হচ্ছে রাজধানীবাসী। এ ছাড়া অস্বাস্থ্যকর পরিবেশে বর্জ্য সংগ্রহ এবং সুরক্ষামূলক পোশাক না পরায় মারাত্মক স্বাস্থ্যঝুঁকিতে রয়েছেন দুই সিটির প্রায় ছয় হাজার পরিচ্ছন্নতাকর্মী—এমনটা মনে করেন বিশেষজ্ঞরা। বর্জ্য শ্রমিকদের স্বাস্থ্য সুরক্ষায় ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের বেশ কিছু তৎপরতা থাকলেও উদাসীন দক্ষিণ সিটি করপোরেশন।

সকাল ৬টার দিকে পরিচ্ছন্নতাকর্মীরা ভ্যান নিয়ে বাসাবাড়ির বর্জ্য সংগ্রহ করতে নামেন। এলাকাভেদে এ কাজ চলে দুপুর পর্যন্ত। ময়লার দুর্গন্ধ ও চালকদের বেপরোয়া ভ্যান চালানোর কারণে রাস্তায় হাঁটাচলা কষ্টকর হয়ে ওঠে বলে অভিযোগ করেছে দুই সিটি করপোরেশনের বিভিন্ন এলাকার বাসিন্দারা। সিটি করপোরেশন কর্তৃক ঠিক করে দেওয়া চাঁদার চেয়ে অতিরিক্ত অর্থ সংগ্রহেরও অভিযোগ করেছে অনেকে।

উত্তরার গরীবে নেওয়াজ রোডের ৪ নম্বর প্লটের বাসিন্দা শহিদুন্নেসা কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘ময়লার কর্মীরা একেক দিন একেক সময় আসে। এ ছাড়া খোলা ও দুর্গন্ধযুক্ত ভ্যানে ময়লা পরিবহন করায় ব্যাপক দুর্গন্ধ ছড়ায়। ময়লার বিল বাবদ প্রতি মাসে ১০০ টাকা করে নেওয়া হয় উত্তরা এলাকা থেকে।’

একই অভিযোগ উত্তর সিটি করপোরেশনের আওতাভুক্ত মানিকদীর বালুরঘাট এলাকার ১৬/৫ নম্বর প্লটের বাসিন্দা শরাফত ও মিরপুর বিহারিপল্লীর বাসিন্দা শাহজাহান খানের।

ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের চানখাঁরপুল, যাত্রাবাড়ী, লালবাগ ও ধানমণ্ডি এলাকার বাসিন্দারাও একই অভিযোগ করেছে। চানখাঁরপুল এলাকার জমিদার গলির ৫৯/১ নম্বর বাড়ির বাসিন্দা মনিরুজ্জামান রিজন বলেন, ‘আমার বাসা থেকে প্রাতবাসে ময়লা বিল বাবদ ৮০ টাকা নেওয়া হয়। ময়লা সংগ্রহকারীরা খোলা ভ্যানেই তা সংগ্রহ ও পরিবহন করে, যা খুব বিরক্তিকর।’

জানা গেছে, রাজধানীর দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের ৫৭টি ওয়ার্ড মোট পাঁচটি অঞ্চলে বিভক্ত। ওই সব এলাকায় পাঁচ হাজার ২১৭ জন চুক্তিভিত্তিক পরিচ্ছন্নতাকর্মী কাজ করেন। গড়ে প্রতিদিন ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের সব কয়টি ওয়ার্ডে প্রায় দুই হাজার ৬০০ থেকে তিন হাজার টন বর্জ্য উৎপন্ন হয়। এ বিপুল পরিমাণ বর্জ্য বাসাবাড়ি থেকে প্রাথমিকভাবে সংগ্রহের জন্য তিন হাজার শ্রমিক ও দেড় হাজার ভ্যান রয়েছে। সব কয়টি ভ্যানই খোলা। ভ্যানে করে ময়লা নিয়ে তা নির্দিষ্ট কনটেইনারে রাখা হয়। ওই সব বর্জ্যবাহী কনটেইনার রাজধানীর মাতুয়াইলে অবস্থিত ল্যান্ডফিলে ফেলার জন্য প্রতি ওয়ার্ডে দুটি গাড়ি নিয়োজিত। এ ছাড়া বাসা থেকে সংগৃহীত ময়লা নির্দিষ্ট স্থানে ফেলার জন্য ১৬টি এসটিএস নির্মাণ করেছে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন। জায়গার অভাবে এসটিএস নির্মাণ করতে পারছে না ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন। অস্বাস্থ্যকর পরিবেশে ময়লা সংগ্রহ ও পরিবহন করার কারণে অসুস্থ হওয়ার পরও ওই সব শ্রমিকের চিকিৎসার জন্য নেই কোনো ব্যবস্থা। পরিচ্ছন্নতাকর্মীরা এ অভিযোগ করলেও নাম প্রকাশে রাজি নন।

এ ব্যাপারে জানতে চাইলে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের প্রধান বর্জ্য ব্যবস্থাপনা কর্মকর্তা এয়ার কমোডর মো. জাহিদ হোসেন কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘ঢাকনাযুক্ত ভ্যানে বর্জ্য সংগ্রহ এখনো করতে পারছি না আমরা। কারণ এসব ভ্যানের মালিক প্রাথমিক বর্জ্য সংগ্রহের কাজে নিয়োজিত ব্যক্তিরা। তবে স্বাস্থ্যকর পরিবেশে বর্জ্য সংগ্রহের জন্য তাদের প্রতি নির্দেশনা অব্যাহত রয়েছে।’ তিনি আরো বলেন, ‘বর্জ্য সংগ্রহের জন্য ঘরপ্রতি ৩০ টাকা আদায়ের নিয়ম রয়েছে। তবে অতিরিক্ত অর্থ সংগ্রহের ব্যাপারে আমরা অবগত। অচিরেই প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’ পরিচ্ছন্নতাকর্মীদের স্বাস্থ্যগত সুরক্ষার বিষয়ে তিনি বলেন, ‘শ্রমিকদের স্বাস্থ্য সুরক্ষার বিষয়ে কোনো নীতিমালা নেই। তবে তাদের জন্য গ্রুপ ইনস্যুরেন্স করার পরিকল্পনা আমাদের রয়েছে। এখন অপ্রাতিষ্ঠানিক উপায়ে তাদের চিকিৎসার ব্যবস্থা করি।’

ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনও পাঁচটি অঞ্চলে বিভক্ত। ওই সব অঞ্চলে ৫১টি এসটিএস রয়েছে। প্রায় তিন হাজার পরিচ্ছন্নতাকর্মী বাসাবাড়ি থেকে সংগৃহীত বর্জ্য ওই সব এসটিএসে ফেলেন। প্রায় দেড় হাজার ভ্যান নিয়োজিত বর্জ্য সংগ্রহের কাজে। কোনোটিরই নেই ঢাকনা।

ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের প্রধান বর্জ্য ব্যবস্থাপনা কর্মকর্তা কমোডর এম এ রাজ্জাক কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘২০০৯ সালে প্রতিটি বাসা থেকে বর্জ্য সংগ্রহ বাবদ ৩০ টাকা নেওয়ার একটা নির্দেশনা দেওয়া হয়। কিন্তু এত কম টাকা দিয়ে এখন সংগ্রহকারীদের পোষায় না। তাই তারা অতিরিক্ত অর্থ নিয়ে থাকে। বর্জ্য ব্যবস্থাপনা উন্নততর করতে এরই মধ্যে একটি নীতিমালা প্রণয়ন করা হয়েছে।’

শ্রমিকদের স্বাস্থ্য সুরক্ষার বিষয়ে তিনি বলেন, ‘বেশ কিছু পদক্ষেপ এরই মধ্যে নেওয়া হয়েছে। যার মধ্যে রয়েছে ইবনে সিনা হাসপাতালে ডিসকাউন্টে টেস্ট এবং প্রতিবছর ক্যান্সার স্ক্রিনিং টেস্ট। এ ছাড়া বেশ কয়েকটি হাসপাতালের সঙ্গে চুক্তির বিষয়টি বিবেচনায় রয়েছে।’

বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলনের (বাপা) সাধারণ সম্পাদক ডা. মো. আব্দুল মতিন কালের কণ্ঠকে বলেন, খোলা ভ্যানে বা গাড়িতে বর্জ্য পরিবহন শ্রমিক ও সাধারণ মানুষ ছাড়াও বায়ু ও মাটির ব্যাপকতর দূষণের কারণ হচ্ছে।



মন্তব্য