kalerkantho


‘গণহত্যা’ সংজ্ঞায়িত করতে করতেই গণহত্যা সম্পন্ন

‘জাতিগত নির্মূলে’র অপরাধগুলোও গণহত্যা সনদের আওতায় পড়তে পারে

মেহেদী হাসান   

৭ সেপ্টেম্বর, ২০১৮ ০০:০০



দায় এড়াতে রোহিঙ্গা নিধনযজ্ঞকে এখনো ‘জেনোসাইড’ (গণহত্যা) বলছে না যুক্তরাষ্ট্রের মতো প্রভাবশালী পশ্চিমা দেশগুলো। ‘এথনিক ক্লিনজিং’ (জাতিগত নির্মূল) বলেই পরিস্থিতির ভয়াবহতা স্বীকার করছে তারা। কারণ গণহত্যা প্রতিরোধে সুনির্দিষ্ট আন্তর্জাতিক সনদ থাকলেও ‘জাতিগত নির্মূল’ ঠেকানোর সনদ নেই। ১৯৪৮ সালের ‘গণহত্যার অপরাধ প্রতিরোধ ও শাস্তি প্রদান’ বিষয়ক সনদে গত জানুয়ারি মাস পর্যন্ত বিশ্বের ১৪৯টি দেশ সই করেছে। ওই সনদ অনুযায়ী, সই করা রাষ্ট্রগুলো ‘গণহত্যা’ ঠেকাতে ব্যবস্থা নিতে বাধ্য।

রোহিঙ্গা গণহত্যা নিয়ে কাজ করছে—এমন কূটনৈতিক সূত্রগুলো বলছে, সংঘাতময় এলাকা নিয়ে প্রতিটি দেশেরই স্বার্থ আছে। বিশেষ করে, পরাশক্তিগুলোর বড় ধরনের ভূ-রাজনৈতিক স্বার্থ রয়েছে। ওই স্বার্থের কারণে তারা গণহত্যা ঘটলেও তা স্বীকার করতে চায় না। আর এর ফলে গণহত্যার প্রক্রিয়াটি সম্পন্ন হয়ে যাচ্ছে।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক কূটনীতিক কালের কণ্ঠকে বলেন, আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় ব্যবস্থা নেওয়ার আগেই মিয়ানমার সফলভাবে রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর সিংহভাগকেই দেশছাড়া করেছে। রোহিঙ্গারা তাদের মাতৃভূমি রাখাইন থেকে বাস্তুচ্যুত হয়ে বাংলাদেশে আশ্রয় নিয়েছে। সেখানে অবশিষ্ট যে দুই-তিন লাখ রোহিঙ্গা আছে তাদের ওপর নানা বিধি-নিষেধ অব্যাহত রয়েছে বলে খবর পাওয়া যাচ্ছে।

ওই কূটনীতিক বলেন, ১৯৮২ সালে মিয়ানমার রোহিঙ্গাদের নাগরিকত্ব বাতিল ও সব নাগরিক সুবিধা বন্ধ করে দিয়েছে। এরপর বিভিন্ন সময় নির্যাতন-নিপীড়ন চালিয়ে তাদের কয়েক দফায় দেশছাড়া করা হয়েছে। আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের চাপে  মিয়ানমার গত বছর নভেম্বর মাসে বাংলাদেশের সঙ্গে প্রত্যাবাসন চুক্তি করলেও রোহিঙ্গারা ফিরতে উৎসাহী হয়—এমন কোনো উদ্যোগ নেয়নি। বরং মিয়ানমারে অবস্থানরত রোহিঙ্গাদের চলাফেরা, চিকিৎসাসেবা ও ত্রাণসামগ্রী পাওয়ার ক্ষেত্রে বাধা সৃষ্টি করে কার্যত তাদের দেশ ছাড়তেই বাধ্য করা হচ্ছে। বিশেষ করে মিয়ানমার সরকার রাখাইনে ত্রাণ কার্যক্রম চালাতে দিচ্ছে না। এতে খাদ্যাভাবসহ নানা সমস্যায় ধুঁকছে রোহিঙ্গারা।

জাতিসংঘের সাবেক সহকারী মহাসচিব এবং ১৯৯৪ সালে রুয়ান্ডায় গণহত্যার সময় জাতিসংঘের মানবিক সহায়তা কার্যক্রমবিষয়ক উপসমন্বয়ক চার্লস জেমস পেটরি গত মঙ্গলবার ব্রিটিশ দৈনিক দ্য গার্ডিয়ানে এক নিবন্ধে লিখেছেন, ‘গণহত্যার সংজ্ঞা নিয়ে বিতর্ক করে রোহিঙ্গাদের বাঁচানো যাবে না।’ তিনি আরো লিখেছেন, ‘আলোচনার সময় ফুরিয়ে গেছে। আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে এখন কাজ করতে হবে, নয়তো রুয়ান্ডার মতো তারা মিয়ানমারেও ব্যর্থ হবে।’

ঢাকার কূটনৈতিক সূত্রগুলো বলছে, আইনি নানা দিক পরীক্ষা-নিরীক্ষা করেই বাংলাদেশ আন্তর্জাতিক ফৌজদারি আদালতকে (আইসিসি) জানিয়েছে যে এ দেশে আশ্রয় নেওয়া রোহিঙ্গাদের ওপর আইসিসির পূর্ণ এখতিয়ার আছে। আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় রোহিঙ্গা নিধনযজ্ঞকে ‘জাতিগত নির্মূল’ হিসেবে অভিহিত করেও যদি সেই অপরাধ তদন্তের উদ্যোগ নেয় তবে গণহত্যার চিত্র আরো স্পষ্ট হতে পারে।

কূটনৈতিক সূত্রগুলো বলছে, ‘জাতিগত নির্মূল’ বলতে যা বোঝায় তাও অনেক গুরুতর অপরাধ। জাতিসংঘের বিশেষজ্ঞরাও জাতিগত নির্মূলের আওতায় সংঘটিত অপরাধগুলোকেও গণহত্যা সনদের আওতায় অপরাধ হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন।

গণহত্যা প্রতিরোধ ও সুরক্ষার দায়িত্ববিষয়ক জাতিসংঘ দপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, ‘জাতিগত নির্মূল’ আন্তর্জাতিক আইনে এখনো স্বতন্ত্র অপরাধ হিসেবে স্বীকৃতি পায়নি। ১৯৯০-এর দশকে সাবেক যুগোস্লাভিয়ায় সংঘাতের প্রেক্ষাপটে ওই শব্দগুচ্ছের প্রচলন হয়। জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদ ও সাধারণ পরিষদের প্রস্তাবেও ‘জাতিগত নির্মূল’ শব্দগুচ্ছ ব্যবহার করা হয়েছে। সাবেক যুগোস্লাভিয়ার জন্য আন্তর্জাতিক ফৌজদারি ট্রাইব্যুনালও (আইসিটিওয়াই) এ শব্দগুচ্ছ ব্যবহার করেন, কিন্তু এর কোনো সংজ্ঞা দেননি।

অবশ্য গণহত্যা প্রতিরোধ ও সুরক্ষার দায়িত্ববিষয়ক জাতিসংঘ দপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, সাবেক যুগোস্লাভিয়ায় আন্তর্জাতিক মানবিক আইন লঙ্ঘন তদন্তে নিয়োজিত জাতিসংঘের বিশেষজ্ঞদের কমিশন তাদের অন্তর্বর্তী ও চূড়ান্ত প্রতিবেদনে জাতিগত নির্মূলের সংজ্ঞা দিয়েছে। অন্তর্বর্তী প্রতিবেদনে একটি জাতিগোষ্ঠীকে তাদের নিজ ভূমি থেকে বলপ্রয়োগ বা দমন-পীড়নের মাধ্যমে উচ্ছেদ করাকে ‘জাতিগত নির্মূল’ হিসেবে অভিহিত করা হয়েছে। ওই একই কমিশন তাদের চূড়ান্ত প্রতিবেদনে ‘জাতিগত নির্মূল’ হিসেবে নীলনকশা অনুযায়ী একটি নির্দিষ্ট ভৌগোলিক এলাকা থেকে একটি বেসামরিক নৃগোষ্ঠী বা ধর্মীয় গোষ্ঠীকে  সহিংসতা ও সন্ত্রাসী উপায়ে বিতাড়িত করতে আরেকটি নৃগোষ্ঠী বা ধর্মীয় গোষ্ঠীর তৎপরতার কথা বলা হয়েছে। 

বিশেষজ্ঞদের সেই কমিশন ‘জাতিগত নির্মূল’-এর আওতায় বেসামরিক জনগোষ্ঠীকে জোরপূর্বক বাস্তুচ্যুত করতে সম্ভাব্য উপায়গুলোও চিহ্নিত করেছে। এগুলোর মধ্যে হত্যা, নির্যাতন, নির্বিচারে আটক ও গ্রেপ্তার, বিচারবহির্ভূত হত্যা, ধর্ষণ ও যৌন নিপীড়ন, বেসামরিক ব্যক্তিদের বড় ধরনের শারীরিক ক্ষতি সৃষ্টি, বেসামরিক লোকদের একটি নির্দিষ্ট এলাকায় আটকে রাখা, বেসামরিক ব্যক্তি ও বেসামরিক এলাকায় ইচ্ছাকৃত সামরিক হামলা বা হামলার হুমকি, বেসামরিক লোকদের মানববর্ম হিসেবে ব্যবহার, সম্পদ ধ্বংস, ব্যক্তিগত সম্পদ ডাকাতি এবং হাসপাতাল, চিকিৎসাকর্মী ও রেড ক্রস/রেড ক্রিসেন্টের প্রতীকসংবলিত এলাকাগুলোতে হামলা উল্লেখযোগ্য।

কূটনৈতিক সূত্রগুলো বলছে, চলতি মাসে জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদ ও মানবাধিকার পরিষদে এ বিষয়গুলো গুরুত্বের সঙ্গে উঠবে।



মন্তব্য