kalerkantho


শ্রমিকদের সুযোগ-সুবিধা বৃদ্ধি অপরাধের সাজা হ্রাস

নিজস্ব প্রতিবেদক   

৪ সেপ্টেম্বর, ২০১৮ ০০:০০



শ্রমিকদের সুযোগ-সুবিধা বৃদ্ধি অপরাধের সাজা হ্রাস

কারখানা-শিল্পপ্রতিষ্ঠানের মালিক ও শ্রমিকদের বিভিন্ন অপরাধের শাস্তি কমিয়ে এবং শ্রমিকদের বিভিন্ন সুযোগ-সুবিধা বাড়িয়ে ‘বাংলাদেশ শ্রম (সংশোধন) আইন, ২০১৮’-এর খসড়া নীতিগত অনুমোদন দিয়েছে মন্ত্রিসভা। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সভাপতিত্বে গতকাল সোমবার সচিবালয়ে অনুষ্ঠিত মন্ত্রিসভা বৈঠকে ‘বাংলাদেশ শ্রম (সংশোধন) আইন, ২০১৮’-এর খসড়ার অনুমোদন দেওয়া হয়।

শ্রম আইনকে শ্রমিকবান্ধব করার জন্য দীর্ঘদিন থেকেই আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থা (আইএলও), ইউরোপীয় ইউনিয়ন, আন্তর্জাতিক ক্রেতা জোট ও বিভিন্ন দেশি-বিদেশি শ্রমিক সংগঠন সরকারকে চাপ দিয়ে আসছে। তাদের চাপের মুখে ২০১৩ সালে শ্রম আইন সংশোধন করা হলেও তা যথেষ্ট হয়নি বলে এসব সংস্থা আবার সংশোধন করে তা শ্রমিকবান্ধব করার জন্য চাপ দেয়। গতকাল এ আইনের নীতিগত অনুমোদন দেওয়া হয়েছে। এই আইন ভেটিং (আইনি মতামত) করে পুনরায় মন্ত্রিসভা বৈঠকে চূড়ান্ত অনুমোদন করিয়ে সংসদে বর্তমান সরকারের মেয়াদে পাস করানোর চেষ্টা করছে শ্রম ও কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়। আগামী ৯ জুন দশম সংসদের শেষ অধিবেশন শুরু হবে। এই অধিবেশনে শ্রম আইন পাস করানোর বিষয়টি গতকালের মন্ত্রিসভা বৈঠকেও আলোচিত হয়েছে। বৈঠকে একজন মন্ত্রী আইনটি ভেটিংসাপেক্ষে চূড়ান্ত অনুমোদন দেওয়ার প্রস্তাব দিলে প্রধানমন্ত্রী তা নাকচ করে দেন।

বৈঠক শেষে একজন মন্ত্রী কালের কণ্ঠকে মন্ত্রিসভা বৈঠকের বিভিন্ন বিষয় জানিয়ে বলেন, দুই-এক সপ্তাহের মধ্যেই শ্রম আইন পুনরায় মন্ত্রিসভা বৈঠকে তোলা হবে। এরপর সেটা সংসদের শেষ অধিবেশনে পাস করানো হবে। আইন মন্ত্রণালয়ের ভেটিং করতে সময় লাগবে না। আন-অফিসিয়াল ভেটিং হয়ে গেছে। এখন কেবল আনুষ্ঠানিক ভেটিং করানো হবে। আইএলওর সঙ্গে বিভিন্ন বিষয় নিয়ে বৈঠক করার আগে সংশ্লিষ্টরা আইন মন্ত্রণালয়ের অলিখিত অনুমোদন নিয়েই তা করেছেন।

মন্ত্রিসভা বৈঠকে তথ্য প্রতিমন্ত্রী তারানা হালিম প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার দৃষ্টি আকর্ষণ করে প্রশ্ন তোলেন, সংবাদিকরা কেন শ্রম আইনের অন্তর্ভুক্ত? সাংবাদিকরা তো শ্রমিক না। প্রধানমন্ত্রী শ্রম প্রতিমন্ত্রী মুজিবুল হককে বিষয়টি ব্যাখ্যা করার জন্য বলেন। এ সময় শ্রম প্রতিমন্ত্রী বৈঠকে জানান, সাংবাদিকরা শ্রম আইনের আওতায় কেন, তা ব্যাখ্যার দাবি রাখে। তবে সাংবাদিকরা এই আইন থেকে বের হওয়ার জন্য কোনো প্রস্তাব দেননি। তাঁরা প্রস্তাব দিলে ভেবে দেখা হবে।’

বৈঠক শেষে একজন মন্ত্রী জানান, প্রস্তাবিত শ্রম আইনের খসড়ায় শিশুশ্রম নিষিদ্ধ করা হয়েছে। কেউ যদি শিশু শ্রমিক নিয়োগ করে, তাকে পাঁচ হাজার টাকা অর্থদণ্ড করা হবে। ১৪ থেকে ১৮ বছর বয়স পর্যন্ত কিশোররা হালকা কাজ করতে পারবে। আগে ১২ বছরের শিশুরা হালকা কাজের এ সুযোগ পেত।

মন্ত্রিসভা বৈঠক শেষে সাংবাদিকদের ব্রিফ করেন মন্ত্রিপরিষদসচিব মোহাম্মদ শফিউল আলম। তিনি জানান, ট্রেড ইউনিয়ন করার জন্য প্রয়োজনীয়সংখ্যক সদস্য পদ কমানো হয়েছে। এত দিন ৩০ শতাংশ শ্রমিকের সমর্থন না পেলে ট্রেড ইউনিয়ন করা যেত না। সংশোধিত আইন অনুযায়ী এখন ২০ শতাংশ শ্রমিকের সমর্থন মিললে ট্রেড ইউনিয়ন গঠন করা যাবে। কোনো ট্রেড ইউনিয়ন নিবন্ধনের আবেদন পাওয়ার ৫৫ দিনের মধ্যে সরকারকে নিবন্ধন দিতে হবে।

আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থার (আইএলও) চাহিদা অনুযায়ী শ্রমবান্ধব নীতি সব জায়গায় কার্যকর করতে শ্রম আইন সংশোধনের প্রস্তাব করা হয়েছে জানিয়ে মন্ত্রিপরিষদসচিব জানান, নারী শ্রমিক প্রসূতি কল্যাণ সুবিধাসহ প্রসবের পরে আট সপ্তাহ পর্যন্ত অনুপস্থিত থাকতে পারবেন।

কোনো কারখানায় ২৫ জনের বেশি শ্রমিক থাকলে তাদের জন্য পানির ব্যবস্থাসহ খাবার ঘর রাখতে হবে, সেখানে বিশ্রামেরও ব্যবস্থা থাকতে হবে। শ্রমিকরা ইচ্ছা করলে সাপ্তাহিক ছুটির দিনে কাজ করে পরে তা উৎসব ছুটির সঙ্গে ভোগ করতে পারবে। উৎসবের ছুটিতে কাজ করালে এক দিনের বিকল্প ছুটিসহ দুই দিনের ক্ষতিপূরণ মজুরি দিতে হবে।

তিনি জানান, ‘অপ্রাপ্তবয়স্ক’ শব্দটি শ্রম আইন থেকে বাদ দিয়ে সেখানে ‘কিশোর’ শব্দটি যোগ করা হয়েছে। আগে ১২ বছর বয়সী শিশুরা কারখানায় হালকা কাজের সুযোগ পেত। সংশোধিত আইন অনুযায়ী ১৪ থেকে ১৮ বছর বয়সী কিশোররা হালকা কাজ করতে পারবে। সংশোধিত শ্রম আইন পাস হলে খাবার ও বিশ্রামের সময় বাদে টানা ১০ ঘণ্টার বেশি কোনো শ্রমিককে দিয়ে কাজ করানো যাবে না।

মন্ত্রিপরিষদসচিব জানান, বল প্রয়োগ, হুমকি প্রদর্শন, কোনো স্থানে আটক রাখা, শারীরিক আঘাত এবং পানি, বিদ্যুৎ বা গ্যাস সংযোগ বিচ্ছিন্ন করে বা অন্য কোনো পন্থায় মালিককে কোনো কিছু মেনে নিতে বাধ্য করলে তা অসদাচরণ হিসেবে বিবেচিত হবে।

শ্রমিকরা বেআইনি ধর্মঘটে গেলে অসদাচরণ হিসেবে গণ্য হবে জানিয়ে মন্ত্রিপরিষদসচিব বলেন, ধর্মঘট করতে আগে দুই-তৃতীয়াংশ শ্রমিকের সমর্থনের প্রয়োজন থাকলেও সংশোধিত আইনে ৫১ শতাংশ শ্রমিকের সমর্থন থাকার কথা বলা হয়েছে। সংশোধিত আইন পাস হলে শ্রম আদালতগুলোকে মামলা দায়েরের তারিখ থেকে ৯০ দিনের মধ্যে রায় দিতে হবে। কোনো কারণে তা সম্ভব না হলে পরবর্তী ৯০ দিনের মধ্যে আবশ্যিকভাবে রায় দিতে হবে। আপিল ট্রাইব্যুনালেও রায় দেওয়ার একই বিধান কার্যকর হবে।

শফিউল আলম জানান, কোনো মালিক নারী শ্রমিককে প্রসূতি কল্যাণ সুবিধা থেকে বঞ্চিত করলে ২৫ হাজার টাকা পর্যন্ত অর্থদণ্ডে দণ্ডিত হবেন। কোনো মালিক বা শ্রমিক অসৎ শ্রম আচরণ করলে এক বছর কারাদণ্ড, ১০ হাজার টাকা অর্থদণ্ড বা উভয় দণ্ডে দণ্ডিত হবেন। আগে দুই বছর সাজার সঙ্গে ১০ হাজার টাকা জরিমানার বিধান ছিল।

বেআইনি ধর্মঘট করলে আগে এক বছর কারাদণ্ড এবং পাঁচ হাজার টাকা অর্থদণ্ড করা হতো। সংশোধিত আইনে এই সাজা কমিয়ে ছয় মাস করার প্রস্তাব করা হয়েছে। সাজা আগের মতো পাঁচ হাজার টাকা রাখা হয়েছে। কোনো ব্যক্তি একই সময়ে একাধিক ট্রেড ইউনিয়নের সদস্য হলে এক মাস কারাদণ্ডে দণ্ডিত হবে। আগে এই অপরাধে ছয় মাস কারাদণ্ড দেওয়া হতো।

সংশোধিত আইন অনুযায়ী, শ্রমিকরা কর্মরত অবস্থায় দুর্ঘটনায় মারা গেলে এক লাখ টাকার বদলে দুই লাখ টাকা এবং স্থায়ীভাবে অক্ষম হলে সোয়া এক লাখ টাকার পরিবর্তে আড়াই লাখ টাকা পাবেন। কোনো ব্যক্তি কোনো শিশু বা কিশোরকে চাকরিতে নিযুক্ত করলে পাঁচ হাজার টাকা পর্যন্ত অর্থদণ্ডে দণ্ডিত হবেন। নতুন আইনে প্রধান পরিদর্শকের পদকে হালনাগাদ করে মহাপরিদর্শক এবং উপপ্রধান পরিদর্শকের পদকে অতিরিক্ত প্রধান পরিদর্শক করা হয়েছে। এ ছাড়া যুগ্ম মহাপরিদর্শক, উপমহাপরিদর্শক এবং সহকারী মহাপরিদর্শক ছাড়াও বেশ কিছু নতুন পদ সৃষ্টি করা হয়েছে।

সংশোধিত শ্রম আইন ইপিজেড এলাকার কারখানার জন্য প্রযোজ্য নয় জানিয়ে মন্ত্রিপরিষদসচিব বলেন, তবে বিদ্যমান আইনগুলো সামঞ্জস্যপূর্ণ করার চেষ্টা হচ্ছে।

 



মন্তব্য