kalerkantho


বাংলাদেশ যাত্রী কল্যাণ সমিতির প্রতিবেদন

ঈদের আগে-পরে ১৩ দিনে সড়কে ২৫৯ জন নিহত

২৩৭টি সড়ক দুর্ঘটনায় ৯৬০ জন আহত হয়েছে

নিজস্ব প্রতিবেদক   

১ সেপ্টেম্বর, ২০১৮ ০০:০০



ঈদের আগে-পরে ১৩ দিনে সড়কে ২৫৯ জন নিহত

এবার ঈদুল আজহার মৌসুমে দেশে ২৩৭টি সড়ক দুর্ঘটনায় ২৫৯ জন নিহত হয়েছে; আহত হয়েছে অন্তত ৯৬০ জন। গতকাল শুক্রবার সকালে রাজধানীর সেগুনবাগিচার ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটি মিলনায়তনে এক সংবাদ সম্মেলনে বাংলাদেশ যাত্রী কল্যাণ সমিতি এ তথ্য তুলে ধরেছে।

সংগঠনের মহাসচিব মো. মোজাম্মেল হক চৌধুরী ঈদুল আজহায় সড়ক দুর্ঘটনা প্রতিবেদন-২০১৮ তুলে ধরে জানান, ঈদ যাত্রার শুরুর দিন ১৬ আগস্ট থেকে ঈদের পর ২৮ আগস্ট পর্যন্ত এসব দুর্ঘটনা ঘটেছে। গত বছরের ঈদুল আজহার সময় ২০৫টি দুর্ঘটনায় ২৭৪ জন নিহত হওয়ার ঘটনা ঘটেছিল। সে হিসাবে এবার নিহতের হার কিছুটা কমেছে।

সংবাদ সম্মেলনে বলা হয়, সংগঠনের সড়ক দুর্ঘটনা মনিটরিং সেলের সদস্যরা বহুল প্রচারিত ও বিশ্বাসযোগ্য জাতীয় দৈনিক, আঞ্চলিক দৈনিক ও অনলাইন দৈনিকে প্রকাশিত সংবাদ মনিটরিং করে এ প্রতিবেদন তৈরি করেছে। প্রতি বছর ঈদকেন্দ্রিক সড়ক দুর্ঘটনা আশঙ্কাজনক হারে বেড়ে যাওয়ায় সংগঠনটি ঈদ যাত্রায় সড়ক দুর্ঘটনা, অতিরিক্ত ভাড়া আদায় ও যাত্রী হয়রানির বিষয়টি চার বছর ধরে অত্যন্ত দক্ষতা ও বিশ্বস্ততার সঙ্গে পর্যবেক্ষণ করে আসছে।

প্রতিবেদনে বলা হয়, পুলিশ, র‌্যাব, বিআরটিএ ও সরকারের বিভিন্ন সংস্থার নানামুখী তৎপরতা ও মনিটরিং ব্যবস্থা জোরদার থাকায় এবারের ঈদ যাত্রায় বিগত ঈদুল ফিতরের তুলনায় দুর্ঘটনা ১৪.৪৪ শতাংশ, প্রাণহানি ২৩.৫৯ শতাংশ এবং আহত ২৪.১১ শতাংশ কমেছে। তবে গত ঈদুল আজহার তুলনায় দুর্ঘটনা ১৩.৫০ শতাংশ ও আহত ১১.৬৭ শতাংশ বেড়েছে। সরকারের সর্বোচ্চ মহল থেকে শুরু করে সবাই সড়ক নিরাপত্তা ও সড়কে শৃঙ্খলা ফেরাতে যখন রাত-দিন গলদঘর্ম তখনও কিছু অসাধু অতি লোভী মালিক ও পরিবহন শ্রমিকের বেপরোয়া মানসিকতায় সড়কে নৈরাজ্য ও সড়ক হত্যা কোনোভাবেই থামানো যাচ্ছে না।

প্রতিবেদনের তথ্য বলছে, ঈদুল আজহার যাত্রা শুরুর দিন ১৬ আগস্ট থেকে ঈদ শেষে বাড়ি থেকে কর্মস্থলে ফেরা পর্যন্ত গত ২৮ আগস্ট পর্যন্ত ১৩ দিনে ২৩৭টি সড়ক দুর্ঘটনায় ২৫৯ জন নিহত এবং ৯৬০ জন আহত হয়েছে। প্রতিবেদন অনুযায়ী, গত ১৬ আগস্ট ১৩ সড়ক দুর্ঘটনায় ১০ জন নিহত হয়, ১৭ আগস্ট ২১ দুর্ঘটনায় ১৫ জন, ১৮ আগস্ট ১৬ দুর্ঘটনায় ১৬ জন, ১৯ আগস্ট ১৬ দুর্ঘটনায় ১২ জন, ২০ আগস্ট ৩০ দুর্ঘটনায় ৪৫ জন, ২১ আগস্ট ১৬ দুর্ঘটনায় ২৩ জন, ২২ আগস্ট ১৭ দুর্ঘটনায় ২৪ জন, ২৩ আগস্ট ১৪ দুর্ঘটনায় ৯ জন, ২৪ আগস্ট ১০ দুর্ঘটনায় ১৪ জন, ২৫ আগস্ট ২৪ দুর্ঘটনায় ৩৫ জন, ২৬ আগস্ট ১৩ দুর্ঘটনায় ১২ জন, ২৭ আগস্ট ২৬ দুর্ঘটনায় ২৩ জন এবং ২৮ আগস্ট ২১ দুর্ঘটনায় ২১ জনের প্রাণহানি ঘটে।

প্রতিবেদন বলছে, হতাহতের মধ্যে ১২ জন আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্য, চারজন চিকিৎসক, দুইজন প্রকৌশলী, দুইজন সাংবাদিক, দুইজন শিক্ষক, ২০ শিক্ষার্থী, ৪২ জন চালক-হেলপার, ৫৯ জন নারী, ৩৪ জন শিশু ও আটজন রাজনৈতিক দলের নেতাকর্মী রয়েছে।

সংঘটিত দুর্ঘটনার যানবাহন পরিসংখ্যানে দেখা যায়, ২৯.১৮ শতাংশ বাস, ২৩.৬ শতাংশ ট্রাক ও কাভার্ড ভ্যান, ৬.৬ শতাংশ নছিমন-করিমন, ৫.৯ শতাংশ ব্যাটারি রিকশা ও ইজিবাইক, ১১.১৫ শতাংশ অটোরিকশা, ৬.৯ শতাংশ কার-মাইক্রো ও ১৬.৭২ শতাংশ মোটরসাইকেল, ৯.১৬ শতাংশ অনান্য যানবাহন দুর্ঘটনায় জড়িত ছিল। মোট দুর্ঘটনার ৩১.৩৮ শতাংশ মুখোমুখি সংঘর্ষে, ৪৪.৩৫ শতাংশ পথচারীকে গাড়িচাপা দেওয়ার ঘটনা, ১৭.৫৭ শতাংশ নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে খাদে পড়ার ঘটনা, ১.১০ শতাংশ চলন্ত গাড়ি থেকে পড়ে, ১.২৬ শতাংশ চাকায় ওড়না পেঁচিয়ে ও ৫.০২ শতাংশ অন্যান্য অজ্ঞাত কারণে দুর্ঘটনা ঘটেছে।

যাত্রী কল্যাণ সমিতির পর্যবেক্ষণ হলো—ফিটনেসবিহীন ও পণ্যবাহী যানবাহনে যাত্রী বহন, বিরতিহীন/বিশ্রামহীনভাবে যানবাহন চালানো, অপ্রাপ্তবয়স্ক ও অদক্ষ চালক-হেলপার দিয়ে যানবাহন চালানো, নিষেধাজ্ঞা অমান্য করে মহাসড়কে অটোরিকশা, ব্যাটারিচালিত রিকশা, নসিমন-করিমন ও মোটরসাইকেল অবাধে চলাচল, বেপরোয়া গতিতে যানবাহন চালানো, সড়ক-মহাসড়কে ফুটপাত না থাকা ও সড়ক-মহাসড়কের বেহাল দশা এসব দুর্ঘটনার জন্য দায়ী।

সমিতি সড়ক পরিবহন মন্ত্রণালয়ে রোড সেফটি ইউনিট গঠন করে এই ইউনিটের মাধ্যমে নিয়মিত সড়ক দুর্ঘটনার কারণ অনুসন্ধান করে প্রতিকারের যথাযথ ব্যবস্থা নেওয়ার সুপারিশ করেছে। এ ছাড়া প্রশিক্ষিত চালক গড়ে তোলা জন্য জাতীয় পর্যায়ে সরকারিভাবে ‘চালক প্রশিক্ষণ কেন্দ্র’ গড়ে তোলা, নিয়মিত রাস্তার রোড সেফটি অডিট করা, ঈদ যাত্রায় অতিরিক্ত ভাড়া আদায়ের নৈরাজ্য বন্ধ করা, ওভারলোড নিয়ন্ত্রণে মানসম্মত পর্যাপ্ত গণপরিবহনের ব্যবস্থা করা, মহাসড়কে ধীরগতির ও দ্রুতগতির যানের জন্য আলাদা লেনের ব্যবস্থা করা, মহাসড়কে নছিমন-করিমন, ব্যাটারি চালিত রিকশা, অটোরিকশা বন্ধে সরকারের গৃহীত সিদ্ধান্ত শতভাগ বাস্তবায়ন করা, ভাঙাচোরা রাস্তাঘাট মেরামত করা, ফিটনেসবিহীন লক্কড়ঝক্কড় ঝুঁকিপূর্ণ যানবাহন চলাচল বন্ধে উদ্যোগ নেওয়া ও জাতীয় ও আঞ্চলিক মহাসড়কে ফুটপাত, আন্ডারপাস, ওভারপাস তৈরি করে পথচারীদের যাতায়াতের ব্যবস্থা করার সুপারিশ করা হয়েছে।

সমিতির প্রতিবেদনের তথ্যানুসারে, এবার ঈদ মৌসুমে একই সময়ে রেলপথে ১৫ জন নিহত হয়। নৌপথে নিহত হয় চারজন।

প্রতিবেদন প্রকাশের অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সাবেক উপদেষ্টা ও সেফ রোড অ্যান্ড ট্রান্সপোর্ট অ্যালায়েন্সের (শ্রোতা)  আহ্বায়ক ড. হোসেন জিল্লুর রহমান, বিআরটিএর সাবেক চেয়ারম্যান আইয়ুবুর রহমান, সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী ব্যারিস্টার জ্যোর্তিময় বড়ুয়া, এফবিসিআইয়ের সাবেক পরিচালক আব্দুল হক, যাত্রী কল্যাণ সমিতির কেন্দ্রীয় নেতা এম মনিরুল হক, মহীউদ্দীন আহমেদ, আজিজুল হক চৌধুরী, জিয়াউল হক চৌধুরী প্রমুখ।

প্রতিবেদন প্রত্যাখ্যান বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন লীগের : যাত্রী কল্যাণ সমিতি উপস্থাপিত প্রতিবেদন প্রত্যাখ্যান করেছে বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন লীগ। গতকাল সংগঠনের বর্ধিত সভায় বক্তারা বলেন, যাত্রী কল্যাণ সমিতি কোনো ট্রেড ইউনিয়ন নয়, কিন্তু বিভিন্ন সময় দেখা যায় জামায়াত-বিএনপির মদদপুষ্ট হয়ে সংবাদ সম্মেলনের মাধ্যমে বিভ্রান্তিমূলক তথ্য প্রকাশ করে জনমনে ভীতি সৃষ্টি করে। যাত্রী কল্যাণ সমিতির এরূপ কার্যকলাপের জন্য তাদের বিরুদ্ধে তদন্তপূর্বক ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের প্রতি সভা থেকে আহ্বান জানানো হয়।

বঙ্গবন্ধু এভিনিউয়ে সংগঠনের সভাপতি মো. রফিকুল ইসলামের সভাপতিত্বে সভায় বক্তব্য দেন সংগঠনের প্রতিষ্ঠাতা সাধারণ সম্পাদক মো. ইনসুর আলী, সহসভাপতি মো. আমির হোসেন, মো. মজিবুর রহমান খান, মো. আনোয়ার হোসেন আনু, যুগ্ম সম্পাদক মোহাম্মদ হানিফ প্রমুখ।



মন্তব্য