kalerkantho


বৃষ্টির অভাবে ফলন নিয়ে শঙ্কা

রংপুর অঞ্চলে আমন আবাদে এখন ‘বলান’ই ভরসা

স্বপন চৌধুরী, রংপুর   

১ সেপ্টেম্বর, ২০১৮ ০০:০০



‘বেছন (সরাসরি ধান বীজ থেকে অংকুরিত চারা) নোয়ায় বাহে, হামার ইগলা (এসব) বলান (এক মাস বয়সী চারা বীজতলা থেকে উত্তোলনের পর ঘন করে অল্প জায়গায় রোপণ করা হয়। আবার মাসখানেক পর সেখান থেকে ওই চারা উত্তোলন করে কুশি ভেঙে জমিতে রোপণ করা হয়)। হামরা অ্যালা বলান গাড়মো। ঝড়ির (বৃষ্টি) জন্যে অপেক্ষায় থাকি দেরি হয়্যা গেইচে। বলান ছাড়া চারা নাগাইলে অ্যালা আর তাতে ধান হবার নয়।’

বীজতলায় অংকুরিত চারা থেকে তৈরি বলান নিয়ে মাঠে রোপণের জন্য যাওয়ার পথে এমন কথা বলেন রংপুরের উত্তম বেলবাড়ী এলাকার কৃষক হাসেম আলী। শুধু তিনিই নন, খরাসহ বিভিন্ন সংকট মোকাবেলায় এই অঞ্চলের কৃষকরা এ বছর আমন মৌসুমের শুরুতে বলান তৈরিতে ঝুঁকে পড়ে। কারণ এতে বীজ কম লাগে, চারার বয়স বেশি হওয়ার সুযোগ থাকে না এবং দেরিতে রোপণ করেও ভালো ফলন পাওয়া যায়।

শস্যভাণ্ডার হিসেবে পরিচিত রংপুর অঞ্চলে এ সময়ে বৃষ্টি না হওয়ায় পানির অভাবে শুকিয়ে যাচ্ছে আমন ধানের ক্ষেত। বৃষ্টিনির্ভর এই আমন চাষে বৃষ্টির অপেক্ষায় থেকে শেষ পর্যন্ত সেচের পানিতে চারা রোপণে বাধ্য হচ্ছে চাষিরা। দাবদাহের মাত্রা এত বেশি যে সম্পূরক সেচের মাধ্যমে ধানক্ষেতের পানির চাহিদা পূরণ করা সম্ভব হচ্ছে না। এই অবস্থায় এবার আমন ধান ফলনে বিপর্যয়ের আশঙ্কা করছে কৃষকরা। তবে কৃষি বিভাগ বলছে, এতে আতঙ্কিত হওয়ার কিছু নেই। বৃষ্টি না হলেও সম্পূরক সেচ দিয়ে আমন ধানের ভালো ফলন সম্ভব। পাট কাটার পর বৃষ্টির জন্য অপেক্ষা করে সময় পেরিয়ে গেছে অনেক। শেষ পর্যন্ত বাধ্য হয়ে রংপুর অঞ্চলের প্রান্তিক ও ক্ষুদ্র কৃষকরা সেচযন্ত্রের পানিতে জমি তৈরি করে চারা রোপণের চেষ্টা করছে।

সরেজমিনে বিভিন্ন এলাকা ঘুরে দেখা যায়, আমনের চারা রোপণ প্রায় শেষ পর্যায়ে। বৃষ্টিনির্ভর আমন চাষে বৃষ্টির অপেক্ষায় পড়ে থাকা জমি কিংবা পাট কাটার পর ওই জমিতে চারা রোপণে ব্যস্ত সময় কাটছে কৃষকদের। জমি পড়ে থাকলেও এবারের বর্ষা (আষাঢ়-শ্রাবণ) মৌসুমে কাঙ্ক্ষিত বৃষ্টিপাত না হওয়ায় সৃষ্ট খরার কারণে আমনের চারা রোপণ করতে পারেনি অনেক কৃষক।

পীরগাছা উপজেলার চৌধুরানী এলাকার কৃষক মফিজার রহমান ও রাসেল মিয়া বলেন, ‘এখন চারা থেকে তৈরি বলান রোপণ করা ছাড়া উপায় নেই। সরাসরি চারা রোপণ করলে ধান পাকতে অনেক সময় লাগবে এবং পরবর্তী ফসল চাষে ব্যাঘাত ঘটবে। এ ছাড়া চারার বয়স বেশি হওয়ায় ফলনও ভালো হবে না।’ কাউনিয়া উপজেলার মীরবাগ এলাকার কৃষক ধনেশ্বর রায় ও লোকমান মিয়া জানান, এক মাস বয়সী চারায় বলান তৈরিতে আরো এক মাস কেটে গেছে। ফলে বলান রোপণে সময়মতো ধান পাওয়া যাবে এবং ফলনও তুলনামূলক বেশি হবে।

গঙ্গাচড়া উপজেলার ভুটকা গ্রামের কৃষক সাজু মিয়া জানান, এক বিঘা জমির বীজতলার চারা দিয়ে যেখানে ১৬ থেকে ২০ বিঘা জমিতে রোপণ সম্ভব, সেখানে ওই চারার বলান করলে দ্বিগুণ, অর্থাৎ ৪০ বিঘা জমিতে রোপণ করা যায়। কারণ হিসেবে তিনি উল্লেখ করেন, চারা এক মাস বলানে থাকায় পর্যাপ্ত কুশি বের হয়। বলান উত্তোলন করে প্রতি গোছার কুশি ভেঙে দুই থেকে তিনটি গোছা করা যায়।

কৃষি বিভাগ সূত্রে জানা যায়, রংপুর কৃষি অঞ্চলের পাঁচ জেলায় চলতি বছর পাঁচ লাখ ৯৪ হাজার ১৮৪ হেক্টর জমিতে রোপা আমন ধান চাষের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে ১৬ লাখ ৩৯ হাজার ১৩২ মেট্রিক টন চাল। জেলাভিত্তিক আবাদের লক্ষ্যমাত্রা হলো রংপুরে এক লাখ ৬৪ হাজার ১৫৯ হেক্টর, গাইবান্ধায় এক লাখ ১৭ হাজার ৫৪৯ হেক্টর, কুড়িগ্রামে এক লাখ ১৫ হাজার ২৭৬ হেক্টর, লালমনিরহাটে ৮৪ হাজার ৮৪৫ হেক্টর এবং নীলফামারীতে এক লাখ ১২ হাজার ৩৫৮ হেক্টর। গতকাল ৩১ আগস্ট পর্যন্ত এসব জেলায় পাঁচ লাখ ৮৩ হাজার হেক্টর জমিতে চারা লাগানো সম্পন্ন হয়েছে, যা লক্ষ্যমাত্রার ৯৮ শতাংশ। বাকি জমিটুুকুও আগামী এক সপ্তাহের মধ্যে রোপণ করা সম্ভব হবে বলেও সূত্র জানায়।

খরার কারণে চারা রোপণে দেরি হওয়ার বিষয়টি নিশ্চিত করে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, আমন ধানের চারা রোপণ মৌসুমে পর্যাপ্ত বৃষ্টিপাত না হওয়ায় এ বছর কিছুটা বিলম্ব হচ্ছে। তবে দেরিতে হলেও বৃষ্টির অপেক্ষায় না থেকে কৃষকরা সেচযন্ত্রের পানিতে চারা রোপণ করায় আমন আবাদের লক্ষ্যমাত্রা ছাড়িয়ে যাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।

কৃষি কর্মকর্তারা বলছেন, বলান তৈরি এ অঞ্চলের কৃষকদের নিজস্ব প্রযুক্তি হলেও এতে সুবিধা রয়েছে অনেক। বলান তৈরি করলে বীজ কম লাগে এবং দীর্ঘমেয়াদি খরাসহ কোনো কারণে জমি তৈরিতে দেরি হলে চারার বয়স বেশি হওয়ার সুযোগ থাকে না। এ ছাড়া দেরিতে রোপণ করেও স্বাভাবিক ফলন পাওয়া যায়।



মন্তব্য