kalerkantho


রাজধানীর বাস টার্মিনালগুলোতে যাত্রীর ঢল

যাত্রা দুঃসহ করে তুলেছে ফেরি সংকট যানজট

নিজস্ব প্রতিবেদক   

২১ আগস্ট, ২০১৮ ০০:০০



যাত্রা দুঃসহ করে তুলেছে ফেরি সংকট যানজট

ঈদ সামনে রেখে মহাসড়কগুলোতে বেড়ে গেছে যানজট। ফলে বাস নির্দিষ্ট সময়ে টার্মিনালে আসতে পারছে না, ছেড়েও যেতে পারছে না। এ অবস্থায় অপেক্ষা ছাড়া গতি নেই যাত্রীদের। গতকাল গাবতলী বাস টার্মিনাল এলাকা থেকে তোলা। ছবি : কালের কণ্ঠ

বিভিন্ন কাউন্টারের সামনে ও রাস্তার ধারে ঘরমুখো মানুষের বাঁধভাঙা ভিড়। কারো হাতে মালপত্র, কারো কোলে শিশু। কেউ একা, কেউ দলবেঁধে। কেউ মালপত্র টেনে নিতে গিয়ে ক্লান্ত। কেউ আগের রাত থেকে বাসের অপেক্ষায় বসে থেকে ত্যক্ত-বিরক্ত। রাজধানীর গাবতলী বাস টার্মিনালে গতকাল সোমবার সকাল সাড়ে ৮টার চিত্র এটি।

আগের দিন দুপুরে পটুয়াখালী থেকে ছেড়ে আসা সাকুরা পরিবহনের বাস পরদিন সকালেও গাবতলী টার্মিনালে আসেনি। শ্যামলী পরিবহন, হানিফ পরিবহন, কান্তি পরিবহন, নাবিল পরিবহনসহ বিভিন্ন কাউন্টারের সামনে নানাভাবে যাত্রীদের বিরক্তি প্রকাশ চলছিল। কখন বাসে উঠব—এই প্রশ্ন ছিল সবার মুখে মুখে।

অপেক্ষমাণ যাত্রীদের একজন নজরুল ইসলাম সকাল ৬টা থেকে তিন ঘণ্টা বসে থেকে হাতে ধরা টিকিট ছুড়ে ফেলে দিলেন। গিয়ে উঠলেন লোকাল বাসের ছাদে। বাসটির সামনে বা পেছনে ডিজিটাল নাম্বার প্লেট নেই। সামনের জানালা ভাঙা। যাবে পাটুরিয়া ঘাট পর্যন্ত। মালপত্র, শিশুসহ তাঁর পথ অনুসরণ করলেন আরো কয়েকজন। কিন্তু ছাদেও ভিড়। বাসের পেছনে লাগানো মই বেয়ে ছাদে উঠতে উঠতেই বাবুল মিয়া জানালেন, আগের রাত ১১টা থেকে বাসের জন্য অপেক্ষা করে ভোর পার করেছেন। তার পরও খুলনা যাওয়ার বাসের দেখা পাননি। টিকিট মিলছে, কিন্তু বাস নেই। তাই ভেঙে ভেঙে বাস ধরে বাড়ি যাবেন। এমন চিত্র দেখা গেল পথের পাশে দাঁড়ানো অন্যান্য বাসের ছাদেও।

খোঁজ নিয়ে জানা গেল, দৌলতদিয়া ফেরিঘাটে গতকাল সকালে এপারে ঢাকার দিকে আসার অপেক্ষায় ছিল সাত শ বাস। পশুবাহী গাড়িকে অগ্রাধিকার দিয়ে বাস ছাড়া হচ্ছে। তার ওপর আছে ফেরির তীব্র সংকট।

বাংলাদেশ বাস-ট্রাক ওনার্স অ্যাসোসিয়েশনের পক্ষ থেকে গাবতলী বাস টার্মিনালে মাইকে যাত্রীদের উদ্দেশে সকাল থেকেই বলা হচ্ছিল—কোনো যাত্রী বা বাস কম্পানি যেন ঝুঁকিপূর্ণ ঈদ যাত্রা না করে। অনুরোধ যাত্রীদের মানতে দেখা যায়নি। বাস কম্পানিও তাতে কান দেয়নি। চাঁপাই ট্রাভেলসের কর্মকর্তা রাজা মিয়া বলেন, বাস ছাড়ার নির্দিষ্ট সময় আগেই পার হয়ে গেছে। যানজটের জন্য বাস বের করা যাচ্ছে না। যাত্রীরা এখন যেভাবে পারছে পাড়ি জমাচ্ছে।

সকাল থেকে রাজধানীর গাবতলী, সায়েদাবাদ ও মহাখালী বাস টার্মিনালে যাত্রীর ঢল নামে। সেই ঢল ধীরে ধীরে মহাসড়ক ধরে ছুটে চলে বিভিন্ন জেলায়। তবে দক্ষিণ ও উত্তরের বিভিন্ন জেলার যাত্রীরা ফিরতি বাসের অপেক্ষায় বেশি বিপদে ছিল। বিশেষ করে কোলে শিশু নিয়ে নারী যাত্রীদের ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষার দৃশ্য ছিল দুঃসহ। বাসের সময়সূচি বিপর্যয়ের পরিপ্রেক্ষিতে ফিটনেসহীন লোকাল বাস ছাড়াও মাইক্রোবাস, প্রাইভেট কার ও অন্যান্য যানবাহনে যাত্রীদের ভিড় করে উঠতে দেখা যায়। সায়েদাবাদ বাস টার্মিনাল ও আশপাশের রাস্তায় যাত্রীর ভিড় থাকলেও বাস ছিল কম। বাস না পেয়ে ফেনী যাওয়ার জন্য মাইক্রোবাস ভাড়ার চেষ্টা করছিলেন সফিউল ইসলামসহ চারজন। জানালেন, পরিবারের সদস্যদের নিয়ে তাঁরা ফেনী যাবেন। কিন্তু কোনো বাসই পাচ্ছেন না।

বাসে ঝুঁকিযাত্রা ছিল মহাখালী বাস টার্মিনালের আশপাশ থেকেও। তেজগাঁও সাতরাস্তা সড়কের পাশে লোকাল বাসে দুপুরে ছাদে যাত্রী তোলা হচ্ছিল। বাসটির চালক মনির হোসেন বললেন, ‘ঢাকা থেকে ময়মনসিংহ যাব। পথে যানজট হওয়ায় অভিজাত বাস কম চলছে।’

বিভিন্ন বাস কম্পানির সংশ্লিষ্টরা জানান, ঢাকা-খুলনা মহাসড়কে ফেরি সংকটের কারণে সৃষ্টি হয়েছে গাড়ির সংকট। পদ্মার এপারে-ওপারে তৈরি হয়েছে গাড়ির জট। যানজট ছিল ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কেও। মেঘনা সেতুর টোল প্লাজা, কাঁচপুর, সোনারগাঁসহ ১০টি পয়েন্টে গাড়ির গতি ছিল ধীর। 

ঢাকা-ময়মনসিংহ মহাসড়কের বাসগুলোকে মহাখালী থেকে গাজীপুর পর্যন্ত ধীরে চলতে হয়েছে।

মহাখালী বাস টার্মিনালে বাস মালিক সমিতির সভাপতি আবুল কালাম কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘মহাসড়কে অতিরিক্ত চাপে গাড়ির গতি ধীর। যানজট রয়েছে ঢাকা-টাঙ্গাইল মহাসড়কে। অধিকাংশ পরিবহনের বাস ঢাকায় আসতে পারছে না। এ কারণে নির্দিষ্ট সময়ের বহু পরে যাত্রীদের নিয়ে বাস ছাড়ছে। পশুবাহী ট্রাক ও যাত্রীবাহী বাস চলাচলে বিশৃঙ্খলার জন্যই বিভিন্ন স্থানে যানজট দেখা দিয়েছে। পোশাক শ্রমিকরা বাড়ি যেতে শুরু করায় পথে পথে বাস থামিয়েও তাদের তুলতে হচ্ছে।’

জানা গেছে, মহাসড়কে অভিযানের ভয়ে বিভিন্ন টার্মিনাল থেকে বাস ছাড়েনি। কারণ সড়ক-মহাসড়কে চলাচল করা বাসগুলোর বড় অংশেরই বৈধ কাগজপত্র নেই। বৈধ চালকেরও সংকট তৈরি হয়েছে। সময়সূচি অনুসারে চালক পাচ্ছেন না বাস মালিকরা।

মহাখালী বাস টার্মিনালে চালক বাবুল মিয়া বলেন, মহাসড়কে বের হয়ে আবার ফিরে আসতে ২৪ ঘণ্টার বেশি সময় লেগে যাচ্ছে। তাহলে বের হয়ে লাভ কী? তার মধ্যে কোনো কারণ দেখিয়ে বাস আটকে রাখলে তো আরো বিপদ।’



মন্তব্য