kalerkantho


জাতীয় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তর

অভিযানের পাশাপাশি বাড়ছে ভোক্তাদের অভিযোগ

রেজাউল করিম   

২৩ জুলাই, ২০১৮ ০০:০০



অভিযানের পাশাপাশি বাড়ছে ভোক্তাদের অভিযোগ

ঢাকা থেকে বরিশালে নদীপথে চলাচলকারী গ্রিনলাইন পরিবহনকে ৫০ হাজার টাকা জরিমানা করেছে জাতীয় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তর। পরিবহনটির বিরুদ্ধে অভিযোগ ছিল একই সিট দুই যাত্রীর কাছে বিক্রি করার। গ্রাহকের কাছ থেকে প্রতি বোতল পানির দাম পাঁচ টাকা করে বেশি রাখায় রাজধানীর ‘চাপ সামলাও’ রেস্টুরেন্টকে ৫০ হাজার টাকা জরিমানা করা হয় গত ১ জুলাই। ২০টি পৃথক অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে এই জরিমানা গুনতে হয় ওই রেস্টুরেন্টকে।

এভাবে সারা দেশে ২০১৭-১৮ অর্থবছরে গ্রাহকদের অভিযোগ নিষ্পত্তি করে তিন হাজার ৭২১টি প্রতিষ্ঠানকে বিভিন্ন অঙ্কের জরিমানা করেছে ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তর। আবার একই বছর চার হাজার ৫৮টি অভিযান পরিচালনা করে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানকে জরিমানা করা হয়েছে। গ্রাহকের অভিযোগ নিষ্পত্তি এবং এসব অভিযান পরিচালনা করে গত অর্থবছরে প্রায় ১৪ কোটি টাকা জরিমানা আদায় করেছে ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তর।

ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ, ভোক্তা অধিকারবিরোধী কাজ প্রতিরোধ ও সংশ্লিষ্ট নানা বিষয়ে ব্যবস্থা নিতে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তর। প্রতিষ্ঠার পর এই অধিদপ্তরের কার্যক্রম ক্রমেই বেড়ে চলেছে। তবে পর্যাপ্ত জনবলের অভাবে অধিদপ্তর প্রত্যাশা অনুযায়ী কার্যক্রম পরিচালনা করতে পারছে না।

ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরের মহাপরিচালক (অতিরিক্ত সচিব) শফিকুল ইসলাম লস্কর কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘ভোক্তা অধিকার নিয়ে জনগণ আগের চেয়ে এখন অনেক বেশি সচেতন। ফলে তারা কোথাও অধিকার থেকে বঞ্চিত হলে তা নিয়ে সোচ্চার হচ্ছে।’ তিনি বলেন, ‘জনগণের মধ্যে সচেতনতা বাড়াতে আমরা কাজ করছি। বিভিন্ন মাধ্যমে প্রচারণা চালাচ্ছি। এতে জনগণ জাতীয় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তর সম্পর্কে আরো বেশি জানতে পারবে। জনগণ সচেতন হলে সেবা প্রদানকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর প্রতারণা করার সুযোগও কমে আসবে।’

জেলা পর্যায়ে অধিদপ্তরের কার্যক্রম জোরদারের উদ্যোগ বিষয়ে শফিকুল ইসলাম বলেন, ‘জনগণ তাদের অভিযোগ নিয়ে আমাদের কাছে আসছে। আইন অনুযায়ী আমরা দোষীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণ করছি। আমাদের গণশুনানি কার্যক্রম বৃদ্ধি করা হয়েছে, বাজার অভিযানও বেড়েছে। জনগণ এর সুফল পাচ্ছে। আমাদের কার্যক্রম সারা দেশেই রয়েছে। প্রতিটি জেলায় একজন করে সহকারী পরিচালক রয়েছেন।’

তবে জনবল সংকট প্রবল বলে জানান শফিকুল ইসলাম লস্কর। তিনি বলেন, ‘প্রতিটি জেলায় আরো কর্মকর্তা ও কর্মচারী দরকার। আমরা বিসিএস নন-ক্যাডার থেকে এসব কর্মকর্তা নিয়োগ চেয়েছি। সরকারও আন্তরিক।’

অধিদপ্তরের দেওয়া পরিসংখ্যানে বলা হয়েছে, দেশের বিভিন্ন জায়গায় গ্রাহকের অধিকার ক্ষুণ্ন করার অভিযোগে অধিদপ্তরে গত অর্থবছরে ৯ হাজার ১৯টি অভিযোগ আসে। এর মধ্যে নিষ্পত্তি করা হয়েছে আট হাজার ৩৫টি। এর মধ্যে তিন হাজার ৭২১ জনের অভিযোগ নিষ্পত্তি করে অভিযুক্ত প্রতিষ্ঠানগুলোকে জরিমানা করা হয়েছে। পরিসংখ্যানে দেখা যায় ২০১৬-১৭ অর্থবছরে অভিযোগ আসে ছয় হাজার ১৪০টি, ২০১৫-১৬ অর্থবছরে ৬৬২টি, ২০১৪-১৫ অর্থবছরে আসে ২৬৪টি।

ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরের ঢাকা বিভাগীয় উপপরিচালক (উপসচিব) মনজুর মুহাম্মদ শাহরিয়ার কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ আইন-২০০৯ বাস্তবায়নে তিনটি বিষয় সামনে রেখে আমরা কাজ করি। প্রথমত প্রতিকারমূলক, দ্বিতীয়ত প্রতিরোধমূলক ও তৃতীয়ত উন্নয়নমূলক। প্রতিকারমূলকের ক্ষেত্রে প্রশাসনিক পদক্ষেপ নেওয়া হয়। যেমন, বিভিন্ন বাজারে অভিযান পরিচালনা ও গ্রাহকের অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে বিভিন্ন আদেশ দেওয়া। প্রতিরোধমূলক কাজ হলো, যখন অধিদপ্তর মনে করবে কোনো প্রতিষ্ঠান ভেজাল দ্রব্য তৈরি করে তা বাজারজাত করার চেষ্টা করছে, সেটির বিরুদ্ধে তাত্ক্ষণিক পদক্ষেপ নেওয়া। ভোক্তা অধিকার আইন সম্পর্কে সাধারণ মানুষকে সচেতন করতে উন্নয়নমূলক নানা কর্মসূচি পালন করা হয়।’

বাজার তদারকির জন্য প্রতিষ্ঠানটি ২০০৯-১০ অর্থবছরে অভিযান পরিচালনা করেছে সাতটি। ওই বছর ৫৪টি বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানকে জরিমানা করা হয়। ২০১০-১১ অর্থবছরে ১৭৪টি অভিযানের মাধ্যমে এক হাজার ৫১২টি প্রতিষ্ঠানকে জরিমানা করা হয়। ২০১১-১২ অর্থবছরে ৩৭১টি অভিযানে দুই হাজার ৬৬৩টি প্রতিষ্ঠানকে, ২০১২-১৩ অর্থবছরে দুই হাজার ৯২৪টি, ২০১৩-১৪ অর্থবছরে ৭২১টি অভিযানের মাধ্যমে দুই হাজার ৮৬১টি, ২০১৪-১৫ অর্থবছরে ৮৪১টি অভিযানের মাধ্যমে তিন হাজার ১৩১টি, ২০১৫-১৬ অর্থবছরে এক হাজার ৩৯৪টি অভিযানের মাধ্যমে পাঁচ হাজার ৫৯টি, ২০১৬-১৭ অর্থবছরে তিন হাজার ৪৩৭টি অভিযানে ১০ হাজার ৭২৯টি এবং ২০১৭-১৮ অর্থবছরে চার হাজার ৫৮টি অভিযানের মাধ্যমে ১৩ হাজার ৬০২টি প্রতিষ্ঠানকে নানা অঙ্কের জরিমানা করা হয়।

তবে সংশ্লিষ্টরা বলছেন, প্রচার না থাকায় অধিদপ্তরে অভিযোগের সংখ্যা সেভাবে বাড়ছে না। বাজারে প্রতারিত হলেও অনেকে এখনো জানেন না কিভাবে, কোথায় প্রতিকার চাইতে হয়। অবশ্য জাতীয় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরের কর্মকর্তারা বলছেন, ধীরে হলেও মানুষজন অধিদপ্তরের কার্যক্রম সম্পর্কে জানছে। ফলে তারা সচেতন হচ্ছে, অভিযোগ নিয়ে আসছে। দিনে দিনে এ সংখ্যা বাড়বে বলে তারা আশাবাদী।

কনজ্যুমার অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) সভাপতি গোলাম রহমান কালের কণ্ঠকে বলেন, ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণে ২০০৯ সালের আইনটি একটি ‘ইউনিক’ আইন। এটি বাস্তবায়ন করা গেলে ভোক্তার অধিকার শতভাগ প্রতিষ্ঠিত হবে।

 



মন্তব্য