kalerkantho


দুই ব্যবসায়ীর খোঁজ মেলেনি

আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর ত্রুটিতে বাড়ছে অপহরণ

রেজোয়ান বিশ্বাস   

১৯ জুলাই, ২০১৮ ০০:০০



আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর ত্রুটিতে বাড়ছে অপহরণ

দুজন দুই পাশে। পেছনে আরো কয়েকজন। মাঝখানে ব্যবসায়ী আনিছুর রহমান। রাজধানীর পল্টন এলাকার সিটি হার্ট মার্কেটের ক্লোজ সার্কিট (সিসি) টিভি ক্যামেরার ফুটেজে এমন চিত্রই ধরা পড়েছে। গত ২৭ জুন ওই মার্কেটের সামনে থেকে এই ব্যবসায়ীকে অপহরণ করা হয়। অপহরণকারীরা নিজেদের আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর পরিচয় দিয়ে তাঁকে তুলে নিয়ে যায়। এরপর আনিছকে তাঁর ফকিরাপুলের বাসায় নিয়ে যাওয়া হয়। সেখান থেকে তাঁর একটি ল্যাপটপ ও ব্যবসার নথিপত্র নিয়ে তাঁকেসহ চলে যায় অপহরণকারীরা। এখন পর্যন্ত তাঁর খোঁজ পাওয়া যায়নি।

একইভাবে গত ১৮ জুন মিরপুর ১১ নম্বর সেকশনের সি-ব্লকের ১১ নম্বর সড়কের বাসার সামনের চায়ের দোকান থেকে আফসার নামের আরেক ব্যবসায়ীকে তুলে নিয়ে যাওয়া হয়। তাঁর পরিবারের কাছে পাঁচ লাখ টাকা মুক্তিপণ চেয়েছে অপহরণকারী। এখনো পর্যন্ত এই ব্যবসায়ীকে উদ্ধার করতে পারেনি পুলিশ।

সম্প্রতি রাজধানীর বিভিন্ন এলাকা থেকে আরো কয়েকজন অপহরণের শিকার হন। এর মধ্যে ভাসানটেকের বাসা থেকে বেরিয়ে টাকা তোলার পর অপহরণের শিকার হন স্থপতি বি এম মাহফুজ নবী। কয়েক দিন পর তাঁকে উদ্ধার করা হয় খুলনার আবু নাসের হাসপাতালের সামনে থেকে। সবুজবাগ এলাকা থেকে অপহরণের আড়াই মাস পর গত সোমবার উদ্ধার করা হয় ব্যবসায়ী শহিদুল ইসলামকে। পুরান ঢাকার বাসিন্দা একটি সিমেন্ট কম্পানির কর্মকর্তা আব্দুল হক রাজও অপহরণের শিকার হন। তিনিও দীর্ঘদিন পর উদ্ধার হয়েছেন। উদ্ধারের পর তাঁরা এখন মানসিক সমস্যায় (ট্রমায়) ভুগছেন বলে পরিবারের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে।

এভাবে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর পরিচয় দিয়ে অন্তত ১০-১২টি চক্র রাজধানীসহ সারা দেশে তৎপর। বাড়ছে অপহরণের ঘটনাও।

পুলিশ ও র‌্যাবের তথ্য মতে, গত এক বছরে সারা দেশে ভুয়া বা নকল পুলিশ ধরা পড়েছে শতাধিক। তাদের কাছ থেকে ওয়াকিটকি, অস্ত্র, হাতকড়া এবং তাদের ব্যবহার করা গাড়িও উদ্ধার হয়েছে। এর পরও তাদের কেন নিয়ন্ত্রণ করা যাচ্ছে না—এমন প্রশ্নের জবাব খুঁজতে গিয়ে পুলিশ, র‌্যাব ও পুলিশের গোয়েন্দা কর্মকর্তাদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, বিভিন্ন কারণে এ ধরনের অপরাধীদের তৎপরতা বাড়ছে। এসব কারণের মধ্যে অন্যতম হলো নজরদারির অভাব। অপরাধীরা আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর পরিচয় দিয়ে মাইক্রোবাস, প্রাইভেট কার নিয়ে ঘুরে বেড়ালেও তাদের ধরা হচ্ছে না। এ ধরনের ঘটনা বিশ্লেষণ করে অপরাধীদের দমনে পদক্ষেপ না নেওয়া এবং সেই সঙ্গে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি না হওয়ায় এ ধরনের অপহরণের ঘটনা বাড়ছে বলে তাঁরা মনে করেন।

পুলিশ, র‌্যাব ও পুলিশের গোয়েন্দা কর্মকর্তারা আরো বলেছেন, এ ক্ষেত্রে আসল পুলিশের গোয়েন্দা শাখারও (ডিবি) ত্রুটি আছে। নিয়ম অনুযায়ী ডিবি সদস্যরা অভিযানে গেলে সাদা পোশাকের ওপর তাঁদের অবশ্যই ডিবি লেখা জ্যাকেট পরতে হবে। অনেক ক্ষেত্রে দেখা গেছে তাঁরা সেটা পরেন না। আবার অভিযানে গিয়ে নিজেদের পরিচয়ও গোপন করেন অনেক সময়।

আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কর্মকর্তারা বলছেন, অপরাধীদের ওপর নজরদারি, অপরাধ দমনে কার্যকর পদক্ষেপ ও দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করা গেলে তাহলেই হয়তো এদের নিয়ন্ত্রণে আনা সম্ভব।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে ঢাকা মহানগর পুলিশের গোয়েন্দা শাখার অতিরিক্ত কমিশনার (ডিবি) দেবদাস ভট্টাচার্য কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘বিভিন্ন সময়ে অপরাধীরাও আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর পরিচয়ে অপহরণ করে মুক্তিপণ আদায় করছে। বিষয়টি সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে তদন্ত করা হয়। অনেক অপরাধীকে আমরা এরই মধ্যে গ্রেপ্তার করেছি। আবার অনেক ভিকটিমকেও আমরা উদ্ধার করেছি। তবে এখনো যারা উদ্ধার হয়নি তাদের উদ্ধারের চেষ্টা চলছে। এই পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আমাদের টিম কাজ করছে।’

উদ্ধার হয়নি দুই ব্যবসায়ী : মিন্টো রোডে ঢাকা মহানগর পুলিশের গোয়েন্দা শাখার কার্যালয়ের সামনে গত মঙ্গলবার কথা হয় ব্যবসায়ী আনিছুর রহমানের ভাই ইকবাল হোসেনের সঙ্গে। তাঁর কাছ থেকে জানা গেল, আনিছ সিটি হার্ট মার্কেটে মোবাইল ফোনের যন্ত্রাংশের ব্যবসা করেন। তাঁদের বাড়ি চাঁদপুরের কচুয়ায়। তাঁর বাবা প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সাবেক শিক্ষক সিদ্দিকুর রহমান। আনিছ দুই সন্তানের জনক। বড় ছেলে আব্দুল্লাহর বয়স সাড়ে তিন বছর এবং ছোট ছেলে আরাফাত ছয় মাস বয়সী। দুই সন্তানকে নিয়ে তাঁর স্ত্রী গ্রামের বাড়িতে থাকেন।

ইকবাল হোসেন কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘আমার ভাই তো কোনো সন্ত্রাসী নয়। কোনো অপরাধীও নয়। তার বিরুদ্ধে থানায় কোনো মামলা নেই।’

ঘটনার পর আনিছুর রহমানের বড় ভাই ইকবাল হোসেন পল্টন থানায় একটি সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করেছেন। জিডির তদন্ত করছেন পল্টন থানার উপপরিদর্শক (এসআই) মনির হোসেন। তিনি বলেন, আনিছের মোবাইল ফোনের কললিস্ট ও মার্কেটের সিসি ক্যামেরার ভিডিও ফুটেজ দেখে তদন্ত চলছে। তবে এখনো তাঁর কোনো সন্ধান মেলেনি।

পুলিশের মতিঝিল বিভাগের উপকমিশনার (ডিসি) আনোয়ার হোসেন বলেন, আনিছুর রহমানকে উদ্ধারের চেষ্টা চলছে। ভিডিও ফুটেজ দেখে অপরাধীদের শনাক্ত করার এবং গ্রেপ্তারের চেষ্টা চলছে।

গত ১৮ জুন মিরপুর ১১ নম্বরের বাসার সামনে থেকে ব্যবসায়ী আফসারকে অস্ত্রের মুখে অপহরণ করে মাইক্রোবাসে তুলে নিয়ে যায় একদল দুর্বৃত্ত। পরে গুড্ডু ও জহিরসহ বিভিন্ন নামে পরিচয় দিয়ে মোবাইল ফোনে পরিবারের লোকজনের কাছে পাঁচ লাখ টাকা মুক্তিপণ দাবি করে।

আফসারের বোন বেবি আক্তার কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘চায়ের দোকান থেকে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর পরিচয়ে ধরে নিয়ে যাওয়া হয় আমার ভাইকে। এখনো তার সন্ধান পাওয়া যায়নি। পরিবারের সবাই এই টেনশনে অসুস্থ হয়ে পড়েছে।’



মন্তব্য