kalerkantho


চট্টগ্রামে ‘ভুল চিকিৎসায়’ শিশুর মৃত্যু, তোলপাড়

অভিযুক্ত তিনজনকে আটকের পর ছেড়ে দিয়েছে পুলিশ, দুটি তদন্ত কমিটি

নিজস্ব প্রতিবেদক, চট্টগ্রাম   

১ জুলাই, ২০১৮ ০০:০০



চট্টগ্রামে ‘ভুল চিকিৎসায়’ রাইফা নামে দুই বছর তিন মাস বয়সী এক শিশুর মৃত্যুর ঘটনা নিয়ে ব্যাপক তোলপাড় সৃষ্টি হয়েছে। গত শুক্রবার রাত ১টার দিকে নগরের অন্যতম প্রধান বেসরকারি ম্যাক্স হাসপাতালে শিশুটি মারা যায়। শিশুটির বাবা সমকাল পত্রিকার চট্টগ্রাম ব্যুরোর জ্যেষ্ঠ প্রতিবেদক রুবেল খান। ঘটনার প্রতিবাদে সাংবাদিক সংগঠনসহ বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষের মধ্যে ক্ষোভ-বিক্ষোভ চলছে।

ওই রাতে ঘটনার প্রায় এক ঘণ্টা পর অভিযুক্ত হাসপাতালের এক চিকিৎসকসহ তিনজনকে পুলিশ আটক করলেও পরে ছেড়ে দেয়। ঘটনা তদন্তে দুটি কমিটি করা হয়েছে। একটির প্রধান চট্টগ্রাম জেলা সিভিল সার্জন ডা. আজিজুর রহমান সিদ্দিকী এবং অপরটির প্রধান ওই হাসপাতালের চেয়ারম্যান অধ্যাপক ডা. শিব শংকর সাহা। প্রথম তদন্ত কমিটিকে পাঁচ দিন এবং অপরটিকে তিন দিনের মধ্যে প্রতিবেদন জমা দিতে বলা হয়েছে। ঘটনায় অভিযুক্ত চিকিৎসক দেবাশীষ সেনগুপ্তকে সাময়িকভাবে দায়িত্ব থেকে সরানো হয়েছে।

এদিকে গত রাতে স্বাস্থ্যমন্ত্রী মোহাম্মদ নাসিম এই শিশুমৃত্যুর ঘটনায় উচ্চপর্যায়ের তদন্তের নির্দেশ দিয়েছেন। তিনি স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক ডা. আবুল কালাম আজাদের নেতৃত্বে একটি দলকে আজ রবিবারই চট্টগ্রামে গিয়ে গুরুত্বের সঙ্গে বিষয়টি তদন্ত করার নির্দেশ দিয়েছেন।

একমাত্র শিশুসন্তানকে হারিয়ে শোকে স্তব্ধ সাংবাদিক রুবেল খান গতকাল বিকেলে বলেন, “রাইফার ঠাণ্ডা লেগে গলা ব্যথা শুরু হয়। এতে সে কিছু খাচ্ছিল না। এ অবস্থায় গত বৃহস্পতিবার বিকেলে তাকে ম্যাক্স হাসপাতালে ভর্তি করি। ওই রাতে চিকিৎসক একটি অ্যান্টিবায়োটিক দেওয়ার পর থেকে রাইফা অস্বস্তি বোধ করে। বিষয়টি হাসপাতাল কর্তৃপক্ষকে জানালে তারা শিশু বিশেষজ্ঞ ডা. বিধান রায় চৌধুরীকে কল দেওয়ার পরামর্শ দেন। হাসপাতালের পরামর্শে ওই শিশু বিশেষজ্ঞকে কল দেওয়া হয়। তিনি যে ওষুধ দেন তার পরই রাইফার খিঁচুনি শুরু হয়। তখন ম্যাক্স হাসপাতালের দায়িত্বরত চিকিৎসক দেবাশীষকে জানালে তিনি ডা. বিধানের সঙ্গে কথা বলে ‘সেডিল’ ইনজেকশন পুশ করেন। এর পরেই আমার মেয়ে রাইফা আর নেই। চিকিৎসকরা ভুল চিকিৎসা ও অবহেলা করে আমার সন্তানকে হত্যা করেছেন। আমি আমার একমাত্র সন্তান রাইফা ‘হত্যার’ বিচার চাই।” 

গত শুক্রবার মধ্যরাতে রাইফা মারা যাওয়ার খবর শুনে হাসপাতালে ছুটে যান চট্টগ্রাম প্রেস ক্লাব, সাংবাদিক ইউনিয়নসহ বিভিন্ন সংগঠনের নেতারা। প্রতিবাদ ও তাঁদের দাবির মুখে রাত ২টার দিকে হাসপাতালে দায়িত্বরত চিকিৎসক দেবাশীষ সেনগুপ্ত, সিনিয়র স্টাফ নার্স (সেবিকা) শিউলি ও সুপারভাইজর মাকসুদুল হক ভুইয়াকে নগরের চকবাজার থানার পুলিশ আটক করে থানায় নিয়ে যায়।

জানা গেছে, রাত সাড়ে ৩টার দিকে বিএমএ চট্টগ্রাম শাখার সাধারণ সম্পাদক ডা. ফয়সল ইকবাল চৌধুরীসহ আরো কয়েকজন চিকিৎসক নেতা এবং হাসপাতালের কর্মকর্তা-চিকিৎসক থানায় যান। এর আগে-পরে অভিযুক্তদের গ্রেপ্তার ও বিচারের দাবিতে কয়েকজন সাংবাদিক নেতাও সেখানে যান। সংবাদ সংগ্রহের জন্যও অনেকে চকবাজার থানায় যান। সেখানে আলাপ-আলোচনার একপর্যায়ে ভোর ৫টার দিকে আটককৃত তিনজনকে ছেড়ে দেওয়া হয়।

পরিবারের অভিযোগ, রাইফার গলার ব্যথাজনিত কারণে একজন বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের পরামর্শে ম্যাক্স হাসপাতালে ভর্তি করানো হয়। হাসপাতালের দায়িত্বরত চিকিৎসক ও নার্সদের ভুল চিকিৎসা ও অবহেলার কারণে শিশু রাইফার মর্মান্তিক মৃত্যু হয়। ভুল চিকিৎসায় সাংবাদিকের কন্যা রাইফার মৃত্যুর অভিযোগ সম্পর্কে ওই হাসপাতালের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ডা. লেয়াকত আলী চৌধুরী গতকাল বিকেলে কালের কণ্ঠকে বলেন, হঠাৎ তীব্র খিঁচুনির পরই রাইফার শারীরিক অবস্থা অবনতি হয়। ওই সময় খিঁচুনি কমাতে তাকে সেডিল ইনজেকশন দেওয়া হয়। কেবিন থেকে এনআইসিইউ, আইসিইউতেও নেওয়া হয় রাইফাকে। একপর্যায়ে রাত ১টা-সোয়া ১টার দিকে সে মারা যায়। খিঁচুনির পর শ্বাসযন্ত্র ক্রিয়া বন্ধ হয়ে রাইফা মারা গেছে। তিনি আরো বলেন, ‘হঠাৎ করে কেন তীব্র খিঁচুনি হলো, তা বুঝতে পারছি না। ঘটনা তদন্তে আমরা হাসপাতাল থেকে পাঁচ সদস্যের একটি কমিটি করেছি। আগামী মঙ্গলবার প্রতিবেদন দেবে কমিটি। আমরা দায়িত্বরত চিকিৎসক দেবাশীষকে প্রতিবেদন না পাওয়া পর্যন্ত দায়িত্ব থেকে সাময়িক অব্যাহতি দিয়েছি। প্রতিবেদনে চিকিৎসায় অবহেলা প্রমাণিত হলে দায়ীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’

বিএমএ চট্টগ্রামের সাধারণ সম্পাদক ডা. ফয়সাল ইকবাল চৌধুরী বলেন, ‘সিভিল সার্জনকে প্রধান করে তিন সদস্যের কমিটিকে আমরা বিএমএ থেকে চমেক শিশু বিভাগের প্রধান অধ্যাপক ডা. প্রণব কুমার চৌধুরীর নাম দিয়েছি। সেখানে সাংবাদিকদের একজন প্রতিনিধিও থাকবেন। তদন্তে যদি চিকিৎসকদের বিরুদ্ধে অভিযোগ প্রমাণিত হয়, অবশ্যই আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হবে। আমরাও চাই সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ তদন্ত হোক।’

চট্টগ্রামের সিভিল সার্জন ডা. আজিজুর রহমান সিদ্দিকী বলেন, ‘আমাকে প্রধান করে তিন সদস্যের একটি তদন্ত কমিটি হয়েছে, তা শুনেছি। কিন্তু এখনো এ ব্যাপারে লিখিত কিছু পাইনি। লিখিত পেলে তদন্তকাজ শুরু করব।’

বিএমএ চট্টগ্রামের সাবেক সাধারণ সম্পাদক ডা. মোহাম্মদ শরীফ বলেন, ‘ঘটনার খবর শুনে আমি হাসপাতালে গিয়েছিলাম। অভিযোগ প্রমাণ ছাড়া তো দায়িত্বরত অবস্থায় কাউকে গ্রেপ্তার করা যায় না। আমরাও জানতে চাই কী কারণে শিশু রাইফা মারা গেছে। আশা করছি, তদন্তে আসল ঘটনা অবশ্যই বেরিয়ে আসবে। চিকিৎসক কিংবা কর্মকর্তা-কর্মচারী যে-ই হোক, শিশু রাইফার চিকিৎসাসেবায় কোনো গাফিলতি ও ভুল চিকিৎসা ছিল কি না, তা তদন্তে প্রমাণিত হবে।

চকবাজার থানার ওসি আবুল কালাম বলেন, ম্যাক্স হাসপাতালের ঘটনায় রাতেই এক চিকিৎসকসহ তিনজনকে থানায় নিয়ে আসা হয়। পরে সাংবাদিক ও চিকিৎসক নেতাদের সঙ্গে আলাপ-আলোচনার মাধ্যমে একটি তদন্ত কমিটি গঠনের সিদ্ধান্ত হয়। দুই পক্ষের মধ্যস্থতার পর আটককৃতদের ছেড়ে দেওয়া হয়। তবে এ ঘটনায় এখন পর্যন্ত থানায় কোনো মামলা দায়ের করা হয়নি।

এদিকে গতকাল বাদ জোহর নগরের গরীব উল্লাহ শাহ (রহ.) মাজার চত্বরে জানাজার পর রাইফাকে দাফন করা হয়। বিকেলে চট্টগ্রাম প্রেস ক্লাবের সামনে এক প্রতিবাদ সমাবেশ হয়েছে। চট্টগ্রাম সাংবাদিক ইউনিয়নের সভাপতি নাজিমুদ্দীন শ্যামলের সভাপতিত্বে সাধারণ সম্পাদক হাসান ফেরদৌসের সঞ্চালনায় সভায় বক্তব্য দেন বাংলাদেশ ফেডারেল সাংবাদিক ইউনিয়নের সাধারণ সম্পাদক ওমর ফারুক, সাবেক সাধারণ সম্পাদক আবদুল জলিল ভুঁইয়া, চট্টগ্রাম প্রেস ক্লাবের সভাপতি কলিম সরোয়ার, ঢাকা সাংবাদিক ইউনিয়নের সভাপতি আবু জাফর সূর্য, সাবেক সভাপতি শাবান মাহমুদ প্রমুখ।



মন্তব্য