kalerkantho


শেষ সময়ের অপেক্ষায় মৌসুমি অপরাধীরা!

এস এম আজাদ   

১৪ জুন, ২০১৮ ০০:০০



শেষ সময়ের অপেক্ষায় মৌসুমি অপরাধীরা!

রাজধানীতে এবার রমজান মাসে ছিনতাইকারী ও অজ্ঞান পার্টির দৌরাত্ম্য আগের বছরের তুলনায় কম। চুরি, চাঁদাবাজি, জাল টাকার কারবার, ভেজাল, ছিনতাই, মাদক কারবারসহ ঈদ মৌসুমের অপরাধও আগের চেয়ে কম দেখা গেছে এখনো। পুলিশ কর্মকর্তাদের ধারণা, চলমান মাদকবিরোধী অভিযানের কারণে এবার অন্য অপরাধীরাও অনেকটা কোণঠাসা। তবে শেষ সময়ে তারা কৌশল পাল্টে সক্রিয় হয়ে উঠতে পারে বলে অনেকের ধারণা।

এবার ঈদের আগে নিরাপত্তাব্যবস্থা নিয়ে নগরবাসীকে আশ্বস্ত করেছেন ঢাকা মহানগর পুলিশ (ডিএমপি) কমিশনার আছাদুজ্জামান মিয়া। গত ৩ জুন নিউ মার্কেটের নিরাপত্তাব্যবস্থা দেখতে গিয়ে তিনি বলেন, ঈদের আগে ব্যাপক নিরাপত্তাব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। এবার ছিনতাইকারী, অজ্ঞান পার্টির তৎপরতা নেই। চুরি, ছিনতাইয়ের একটি ঘটনাও ঘটেনি। তাঁর এ আশ্বাসবাণীর এক সপ্তাহ পর গত শনিবার রাত থেকে রবিবার দুপুরের মধ্যে নগরীতে ছিনতাইকারীর হাতে দুজন খুন হয়েছে। সবুজবাগে শনিবার রাতে ছিনতাইকারীদের প্রতিহত করতে গিয়ে ছুরিকাঘাতে নিহত হন রাহাত মিয়া জুয়েল নামের এক তরুণ। রবিবার দুপুরে ডেমরায় ছিনতাইকারীদের গুলিতে নিহত হন বিকাশ এজেন্ট কর্মী রাশেদুল। এসব ঘটনায় নতুন করে শঙ্কা দেখা দিয়েছে।

গোয়েন্দা সূত্রে জানা যায়, জাল নোট তৈরি ও বাজারজাতকারী চক্রের কিছু সদস্য ধরা পড়লেও অন্যরা গা-ঢাকা দিয়ে আছে। একটি চক্রের পাঁচ কোটি টাকার নোট বাজারে ছাড়ার পরিকল্পনা জানা গেছে। ঈদের ছুটিতে বাড়ি ফেরা যাত্রীদের অজ্ঞান পার্টির কবলে পড়ার শঙ্কা তো আছেই। 

নিরাপদে ঈদের কেনাকাটা করা এবং বাড়ি ফেরার সময় অপরাধীদের হাত থেকে রক্ষা পেতে নগরবাসীকে কিছু পরামর্শ দিয়েছে ডিএমপি। মার্কেটে টাকা জাল বলে মনে হলে তা পরীক্ষা করা, অপরিচিত ব্যক্তিদের দেওয়া খাবার না খাওয়া এবং বেশি পরিমাণ টাকা বহনের সময় পুলিশের সহায়তা নিতে বলছেন কর্মকর্তারা। ঈদের ছুটিতে গ্রামের বাড়ি যাওয়ার সময় ঘরের দরজা-জানালা ভালো করে বন্ধ করাও পরামর্শ দিয়েছেন তাঁরা।

অপরাধের তথ্যানুসন্ধানে দেখা গেছে, রমজান মাসের প্রথম ২৩ দিনে রাজধানীতে ছিনতাইকারীর হাতে খুন হওয়ার ঘটনা ঘটেনি। এ পর্যন্ত ১০-১২টি ছিনতাইয়ের খবর পাওয়া গেছে। এতে সামান্য আহত হওয়া এবং সঙ্গে থাকা মানিব্যাগ খোয়া যাওয়ার অভিযোগ পাওয়া যায়। তবে শনিবার রাত থেকে রবিবার দুপুরের মধ্যেই দুটি খুনের ঘটনায় নড়েচড়ে বসেছে পুলিশ।

ডিএমপির অতিরিক্ত কমিশনার (অপরাধ) কৃষ্ণপদ রায় বলেন, রমজান মাস ও ঈদের বাজারকে কেন্দ্র বিশেষ নিরাপত্তাব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। এবার আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতি খুবই ভালো। শেষ সময় পর্যন্ত এই অবস্থা ধরে রাখার জন্য ডিএমপি কাজ করছে। 

ডিএমপির আরেক পদস্থ কর্মকর্তা পরিচয় প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, ঢাকার বেশির ভাগ ছিনতাই করে মাদকসেবীরা। মাদকবিরোধী অভিযানের কারণে ওরা কোণঠাসা। এ কারণে গত কয়েক দিন ছিনতাই হয়নি। তবে ঈদের আগে অভিযান কিছুটা শিথিল হচ্ছে। তখন পেশাদার ছিনতাইকারীরা সক্রিয় হয়ে উঠতে পারে। এটা মাথায় রেখে কাজ করতে হবে।

গত বৃহস্পতিবার কদমতলীর বউবাজার এলাকার একটি বাড়ি থেকে জাল টাকা তৈরির সরঞ্জাম ও এক কোটি টাকার জাল নোটসহ ১০ জনকে গ্রেপ্তার করে ডিএমপির গোয়েন্দা শাখা (ডিবি)। ডিএমপির অতিরিক্ত কমিশনার (ডিবি) দেবদাস ভট্টাচার্য বলেন, ‘ঈদ লক্ষ্য করে বাজারে পাঁচ কোটি টাকার জাল নোট ছাড়ার পরিকল্পনা ছিল চক্রটির। কিন্তু তারা এতে সফল হতে পারেনি। জাল নোট তৈরির এ ধরনের আরো আট-৯টি চক্র আছে। কয়েকটি গ্রুপ এরই মধ্যে গ্রেপ্তার হয়েছে। বাকিদের বিরুদ্ধেও আমাদের অভিযান অব্যাহত রয়েছে।’

ডিবির কর্মকর্তারা জানান, জাল টাকার বিরুদ্ধে তাঁদের অভিযান চলছে। কারো সন্দেহ হলে মেশিনে টাকা পরীক্ষা করে নেওয়ার ব্যবস্থা আছে। প্রতিটি মার্কেটেই টাকা পরীক্ষা করার মেশিন আছে। গোপনে তথ্য পেলে ডিবি অভিযানে যাবে।

ডিএমপি সূত্রে জানা যায়, ফকিরাপুলে ব্যাংকে ১২ লাখ টাকা জমা দিতে যাওয়ার সময় পলওয়েল সুপারমার্কেটের একটি দোকানের ব্যবস্থাপক নেয়ামুল ছিনতাইকারীর কবলে পড়েন। টিঅ্যান্ডটি কলোনি মসজিদ গেটের কাছে কয়েকজন ছুরি দেখিয়ে তাঁকে বহনকারী রিকশার গতিরোধ করে টাকার ব্যাগ ছিনিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করে। ওই সময় তিনি চিৎকার দিলে লোকজন ছুটে যায়। তাদের সহায়তায় দুই ছিনতাইকারীকে আটক করে পুলিশ।

র‌্যাব সূত্রে জানা যায়, গত ৪ জুন মাতুয়াইলে সাদ্দাম মার্কেট ও ট্রাস্ট ব্যাংকের উত্তর পাশে র‌্যাব-১০-এর একটি টহল মাইক্রোবাস থামায় একদল ছিনতাইকারী। সেখান থেকে চারজনকে আটক করে র‌্যাব। ছিনতাইকারীরা যেন অপতৎপরতা চালাতে না পারে সে জন্য নজরদারি আছে বলে জানান র‌্যাব-১০-এর অধিনায়ক কাইয়ুমুজ্জামান খান।

ডিএমপির উপকমিশনার (গণমাধ্যম) মাসুদুর রহমান বলেন, ‘ঈদ মৌসুমে এবার আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতি অত্যন্ত ভালো। এর পরও নগরবাসীর নিরাপত্তায় সব ধরনের পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। মার্কেটে টাকা জাল সন্দেহ হলে পরীক্ষা করা, অপরিচিত ব্যক্তিদের দেওয়া খাবার না খাওয়া এবং বেশি পরিমাণ টাকা বহনের সময় এস্কটের সহায়তা নিতে আমরা পরামর্শ দিচ্ছি। এ ছাড়া ঈদের ছুটিতে বাইরে যাওয়ার সময় বাসার দরজা-জানালা ভালোভাবে আটকানোসহ নিরাপত্তার প্রাথমিক বিষয়গুলো নিশ্চিত করার অনুরোধ করছি।’ তিনি জানান, যে কেউ ডিএমপির মানি এস্কর্ট সেবা নিতে পারে। শুধু পরিবহনের খরচ দিয়েই এ সেবা পাওয়া যাবে। সংশ্লিষ্ট থানা অথবা পুলিশ কন্ট্রোল রুমে (ফোন : ৯৫৫৯৯৩৩, ৯৫৫১১৮৮, ৯৫১৪৪০০, ০১৭১৩-৩৯৮৩১১) যোগাযোগ করতে হবে।

 


মন্তব্য