kalerkantho


ইথোফেন-কার্বাইডের ক্ষতিকর মাত্রা পাওয়া যায়নি

আমের নমুনা পরীক্ষা

শওকত আলী   

১১ জুন, ২০১৮ ০০:০০



গত মাসে ইথোফেন দিয়ে অপরিপক্ব ফল পাকানোর অভিযোগে কারওয়ান বাজারে প্রায় ৪০০ মণ আম ধ্বংস করা হয়েছিল। পরে আরো কয়েকটি স্থানে ভ্রাম্যমাণ আদালত একই অপরাধে প্রচুর আম ধ্বংস করেন। এ নিয়ে বিতর্কের পাশাপাশি দুটি পক্ষ পরস্পরের বিপরীতে অবস্থান নেয়। সরকার নিয়ন্ত্রক সংস্থা বলছে ইথোফেনে আম পাকালে ক্ষতির কিছু নেই। কিন্তু পরিবেশ নিয়ে কাজ করা বেসরকারি সংস্থাটির দাবি, ইথোফেন নিয়ে ফল পাকানোর পর তা খেলে শরীরে নানা জটিল রোগ সৃষ্টি হয়।

এই বিতর্কের মধ্যেই বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা কাউন্সিল বাজার থেকে আমের নমুনা সংগ্রহ করে ভারতীয় একটি অ্যাক্রেডিটেড ল্যাবে পরীক্ষা করে। ওই পরীক্ষায় আমে ক্ষতিকর মাত্রায় ইথোফেনের উপস্থিতি পাওয়া যায়নি।

রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠানটির সূত্রে জানা যায়, কারওয়ান বাজারের বিভিন্ন আড়ত থেকে আমের নমুনা সংগ্রহ করা হয় পরীক্ষার জন্য। এর মধ্যে অন্যতম লক্ষণভোগ, হিমসাগর ও গুটি। আমগুলোর নমুনা গত ২৫ মে ভারতীয় একটি পরীক্ষাগারে পাঠানো হয়। দুই ভাগে এগুলোর পরীক্ষা করা হয়। আমের খোসা ও আঁশ (যে অংশটি খাওয়া হয়)। ১ জুন এই পরীক্ষার ফলাফল বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা কাউন্সিলের কাছে পাঠানো হয়।

পরীক্ষার ফলাফলে হিমসাগর ও লক্ষণভোগের খোসা ও আঁশে ইথোফেন পাওয়া যায়নি। আর গুটি আমের খোসা ও আঁশে যথাক্রমে ০.০৬৬ মিলিগ্রাম/কেজি ও ০.০৪০ মিলিগ্রাম/কেজি ইথোফেনের উপস্থিতি পাওয়া যায়।

বিশ্ব খাদ্য সংস্থার (এফএও) ও বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (ডাব্লিউএইচও) নির্ধারিত/অনুমোদিত মাত্রা ২ মিলিগ্রাম/কেজি। এ ছাড়া মানবদেহের প্রতি কেজি ওজনের জন্য দৈনিক ০.০৫ পিপিএম পর্যন্ত ইথোফোন গ্রহণ করা নিরাপদ বলে জানা গেছে।

এই আমগুলোর নমুনায় ক্যালসিয়াম কার্বাইডের উপস্থিতি রয়েছে কি না তা-ও পরীক্ষা করা হয়। এতে কোনো ধরনের ক্যালসিয়াম কার্বাইডের উপস্থিতিও পাওয়া যায়নি।

এ বিষয়ে বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা কাউন্সিলের পরিচালক (পুষ্টি) ড. মনিরুল ইসলাম কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘এই পরীক্ষাটা খুবই জরুরি ছিল। কারণ সরকারি প্রতিষ্ঠানটিকে বিজ্ঞানভিত্তিক কথা বলার কারণে নানা প্রশ্নের মুখোমুখি হতে হচ্ছে। এখন এই পরীক্ষার ফলই বলে দিচ্ছে ইথোফেন ব্যবহার মোটেও অনিরাপদ নয়। আর এতে কোনো প্রকার স্বাস্থ্যঝুঁকিও নেই।’

দেখা গেছে, লক্ষণভোগ পরিপক্ব হওয়ার সময় হলো ১৫ জুন থেকে ১৫ জুলাই। আর গোপালভোগ পরিপক্ব হওয়ার সময় ২৫ মে থেকে ১০ জুন পর্যন্ত। অর্থাৎ এই আম দুটির যে নমুনা বাজার থেকে সংগ্রহ করা হয়েছে সেগুলো অপরিপক্ব। এ ছাড়া গুটি আমের পরিপক্বতার সময় ১ মে থেকে ৭ মে। এই আমটির যে নমুনা সংগ্রহ করা হয়েছিল তা ছিল  পরিপক্ব।

ড. মনিরুল ইসলাম আরো বলেন, ‘কাঁচা আম আমরা খাই। এই আম যদি ইথোফেন দিয়ে পাকানো হয় তবে সেটাও খেতে কোনো সমস্যা নেই। এতে পুষ্টির পরিমাণ পাকা আমের চেয়ে কম থাকবে, এটাই স্বাভাবিক। কিন্তু খেলে ক্ষতি নেই। তবে যারা নির্দিষ্ট সময়ের আগে গাছ থেকে অপরিপক্ব আম পেড়ে বাজারজাত করে তাদের শাস্তি হওয়া প্রয়োজন, কিন্তু আম ধ্বংস করা উচিত নয়।’

আম পাকানোর জন্য বিভিন্ন দেশে একটি নির্দিষ্ট মাত্রায় ইথিলিন গ্যাস (উচ্চ পিএইচ ও আর্দ্রতায় ইথোফেন যৌগ ভেঙে গিয়ে ইথিলিন গ্যাস তৈরি করে) ‘একটি চেম্বার’ প্রক্রিয়া ব্যবহার করে পরিপক্ব কাঁচা ফল পাকানো হয়। এর জন্য বিভিন্ন দেশে একটি নির্দিষ্ট মাত্রা নির্ধারণ করে দেওয়া আছে। বাংলাদেশে ব্যবহারের মাত্রা নির্দিষ্ট থাকলেও কিভাবে, কোন প্রক্রিয়ায় তা ব্যবহার করতে হবে সেটা কেউ মানছে না। এই অভিযোগ পরিবেশ বাঁচাও আন্দোলন নামের সংস্থাটির। তাদের দাবি, এটি একটি ক্ষতিকর রাসায়নিক যা শরীরে প্রবেশ করলে নানা ধরনের কঠিন রোগ হতে পারে। তবে শুরু থেকে রাষ্ট্রায়ত্ত নিয়ন্ত্রক সংস্থা বাংলাদেশ নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষ (বিএফএসএ) বিজ্ঞানভিত্তিক ব্যাখ্যা দিয়ে দাবি করে আসছে, ইথোফেন দিয়ে ফল পাকানো সম্পূর্ণ নিরাপদ। এতে কোনো প্রকার স্বাস্থ্যঝুঁকির শঙ্কা নেই। নির্দিষ্ট মাত্রায় ব্যবহার করা সম্পূর্ণ নিরাপদ। সংস্থাটি ফল ধ্বংসের বিপরীতে অবস্থান নেয়।

পবার অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে আরো বেশি করে পর্যবেক্ষণ, পরীক্ষা-নিরীক্ষা করার জন্য খাদ্য মন্ত্রণালয় একটি কমিটি গঠন করেছে। ওই কমিটি যত দ্রুত সম্ভব আমসহ অন্যান্য ফলমূল খাওয়ার বিষয়ে আরো বিস্তারিত তথ্য তুলে ধরবে।

 

 



মন্তব্য