kalerkantho


এসএসসি ও সমমানের পরীক্ষা

বেতনে যায় কাঁড়ি কাঁড়ি টাকা,পাসের হার শূন্য

শরীফুল আলম সুমন   

২১ মে, ২০১৮ ০০:০০



বেতনে যায় কাঁড়ি কাঁড়ি টাকা,পাসের হার শূন্য

এবার এসএসসি ও সমমানের পরীক্ষায় ৯৬ মাদরাসাসহ ১০৯ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান থেকে একজনও পাস করতে পারেনি। দিনাজপুর বোর্ডের পাঁচটি স্কুল, বরিশাল ও ঢাকা বোর্ডের তিনটি করে এবং রাজশাহী ও যশোর বোর্ডের একটি করে স্কুল থেকেও পাস করেনি কোনো শিক্ষার্থী। আর ৩৩৩ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে পাসের হার ২০ শতাংশের নিচে। এ ছাড়া পাসের হার ৫০ শতাংশের নিচে তিন হাজার ৩০১টি প্রতিষ্ঠানে।

শিক্ষা মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা যায়, ২০১৮ সালের এসএসসি ও সমমানের পরীক্ষায় যে ৯৬ মাদরাসার পাসের হার শূন্য সেগুলোর মধ্যে ১৯টি এমপিওভুক্ত। ওই মাদরাসাগুলোর শিক্ষক-কর্মচারীদের শতভাগ বেতন দেয় সরকার। প্রতিটি প্রতিষ্ঠানের শিক্ষক-কর্মচারীদের বেতন বাবদ প্রতি মাসে সরকার ব্যয় করছে দুই থেকে তিন লাখ টাকা। সে হিসাবে ১৯টি মাদরাসার শিক্ষক-কর্মচারীদের পেছনেই গত বছর সরকারের ব্যয় হয়েছে প্রায় ছয় কোটি টাকা।

একইভাবে এমপিওভুক্ত অন্যান্য শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষক-কর্মচারীদের শতভাগ বেতন দেয় সরকার। কিন্তু বছর শেষে কিছু প্রতিষ্ঠান থেকে একজন শিক্ষার্থীও পাস করতে পারছে না। এর পরও বছরের পর বছর ধরে চলছে ওই সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান।

এবার এসএসসি পরীক্ষায় পাঁচটি সাধারণ শিক্ষা বোর্ডের ১৩টি স্কুল থেকে একজনও পাস করতে পারেনি। তবে এসবের মধ্যে একটি স্কুল নিম্ন মাধ্যমিক পর্যায় পর্যন্ত এমপিওভুক্ত বলে জানা গেছে। অন্যগুলো চলছে একাডেমিক স্বীকৃতি ও পাঠদানের অনুমতি নিয়ে।

এসএসসি পরীক্ষার ফল প্রকাশের পর এমপিওভুক্ত কয়েকটি মাদরাসায় গিয়ে নাজুক চিত্র দেখা যায়। স্কুল চলাকালীন বেশির ভাগ শিক্ষককে স্কুলে পাওয়া যায়নি। কিছু শিক্ষার্থী থাকলেও তারা যে যার মতো করে ঘোরাঘুরি করছিল। সুপার, সহকারী সুপাররা শহরে থাকেন। মাসে দু-একবার হাজির হন। ম্যানেজিং কমিটি এসবের খোঁজ রাখে না।

পটুয়াখালীর সদর উপজেলার লোহালিয়া কেএম হক গার্লস দাখিল মাদরাসা এমপিওভুক্ত। এই প্রতিষ্ঠান থেকে দাখিলে চারজন অংশ নিয়ে একজনও পাস করতে পারেনি। গত ৮ মে সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায় ষষ্ঠ থেকে দশম শ্রেণি পর্যন্ত ১৬ জন শিক্ষার্থী উপস্থিত। সাংবাদিক পরিচয় জানার পর আশপাশ থেকে তিনজন শিক্ষক এসে একসঙ্গে শ্রেণিকক্ষে পাঠদান শুরু করেন।

স্থানীয় লোকজন জানায়, সহকারী সুপার মাঝেমধ্যে মাদরাসায় আসেন। তবে সুপার মজিবুল হক মাসে দু-একবার আসেন। তিনি ২০ কিলোমিটার দূরে পটুয়াখালী শহরে থাকেন। 

মাদরাসার সুপার কাজী মজিবুল হক মোবাইল ফোনে বলেন, ‘গত বছর ১৩ শিক্ষার্থী পরীক্ষা দিয়েছিল, ১২ জন পাস করেছে। এ বছর কেউ পাস করেনি।’

মাগুরার মহম্মদপুর উপজেলার রিজিয়া রুবিয়া মহিলা দাখিল মাদরাসা থেকে এবার ৩০ ছাত্রী দাখিল পরীক্ষায় অংশ নিলেও একজনও পাস করতে পারেনি। জানা যায়, ১৯৯৯ সালে মাদরাসাটি প্রতিষ্ঠিত হয় দুই বোন রিজিয়া ও রুবিয়ার নামে। এর মধ্যে রুবিয়া খাতুন আট বছর ধরে মাদরাসার ম্যানেজিং কমিটির সভাপতি। তাঁর ছেলে আব্দুর রউফসহ নিকটাত্মীয়দের নিয়ে ম্যানেজিং কমিটি গঠিত। রুবিয়ার ছেলে আব্দুল ওয়াহাব মিলন, মেয়েজামাই আলমগীর হোসেন এই মাদরাসার শিক্ষক। মোট ১৪ শিক্ষক-কর্মচারীর প্রায় সবাই ম্যানেজিং কমিটির সভাপতির আত্মীয়। ২০০২ সাল থেকে মাদরাসাটি এমপিওভুক্ত। 

মহম্মদপুরের বালিদিয়া বাজারের ব্যবসায়ী আবু সুফিয়ান অভিযোগ করে বলেন, মাদরাসার অনেক শিক্ষকেরই সনদ জাল। একে তো আত্মীয়, আবার মোটা টাকা দিয়ে নিয়োগ পেয়েছেন তাঁরা। তাই ক্লাসের ধার ধারেন না কেউ।

শিক্ষা মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা যায়, উল্লিখিত দুটি মাদরাসা ছাড়া অন্য যেসব এমপিওভুক্ত মাদরাসা থেকে একজনও পাস করেনি সেগুলো হলো গাজীপুরের কাপাসিয়ার বেলাছি মদিনাতুল উলুম মহিলা আলিম মাদরাসা, কিশোরগঞ্জের পাকুন্দিয়ার খামা বালিকা দাখিল মাদরাসা, টাঙ্গাইল ভুয়াপুরের আছাতুন্নেসা দাখিল মাদরাসা, ঘাটাইলের বকশিয়া দাখিল মাদরাসা, গোপালপুরের কুড়িয়াটা দাখিল মাদরাসা ও ছাতিলা শেফালিয়া বালিকা দাখিল মাদরাসা, চাঁপাইনবাবগঞ্জ সদরের শাজাহানপুর ইসলামিয়া গার্লস দাখিল মাদরাসা, নওগাঁর পত্নীতলার ছোট মহারান্দি টেকনিক্যাল দাখিল মাদরাসা ও বারা বিদিরপুর দাখিল মাদরাসা, বগুড়ার ধুনটের বাদেরবাড়ি সিনিয়র আলিম মাদরাসা, শিবগঞ্জের মেদেনিপাড়া মোজাদ্দেদিয়া দাখিল মাদরাসা, যশোরের কেশবপুরের প্রতাপপুর দাখিল মাদরাসা, সাতবাড়িয়া দাখিল মাদরাসা ও ইমননগর এম.বি.জে. দাখিল মাদরাসা, বরিশালের উজিরপুরের মুন্সীর তালুক গার্লস আলিম মাদরাসা, পিরোজপুরের নেছারাবাদের নেছারাবাদ মুজাদ্দেদিয়া ইসলামিয়া দাখিল মাদরাসা এবং পটুয়াখালীর মির্জাগঞ্জের কাপালভেরা দারুস সুন্নাত মহিলা আলিম মাদরাসা।

মাদরাসা শিক্ষা বোর্ডের চেয়ারম্যান অধ্যাপক এ কে এম ছায়েফ উল্যাহ কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘যেসব মাদরাসা থেকে একজনও পাস করেনি তাদের আমরা শোকজ করেছি।’

জানা যায়, যেসব এমপিওভুক্ত মাদরাসা থেকে একজনও পাস করেনি সেগুলো এমপিওভুক্ত হয়েছে তদবির আর অর্থের জোরে। ওই টাকার জোগান দিয়েছেন শিক্ষকরাই।

জানা যায়, শিক্ষার মান দেখার দায়িত্ব মাদরাসা শিক্ষা অধিদপ্তরের। কিন্তু এই অধিদপ্তরের কর্মকর্তারা মান না দেখে মূলত টাকা কামাতে ব্যস্ত। মাদরাসা অধিদপ্তরে একাধিক পরিদর্শক থাকলেও তাঁরা ব্যস্ত থাকেন নিয়োগ নিয়ে।

এবার এসএসসি পরীক্ষায় দিনাজপুর বোর্ডের যে পাঁচটি বিদ্যালয় থেকে একজনও পাস করেনি সেগুলো হলো দিনাজপুরের খানসামা উপজেলার নলবাড়ী গার্লস হাই স্কুল, গাইবান্ধার সুন্দরগঞ্জ উপজেলার সারবানাদা গার্লস হাই স্কুল, পলাশবাড়ী উপজেলার থুটিয়াপুকুর গার্লস হাই স্কুল, লালমনিরহাটের আদিতমারী উপজেলার ভাদাই দক্ষিণপাড়া উচ্চ বিদ্যালয় এবং পঞ্চগড়ের দেবীগঞ্জ উপজেলার লক্ষ্মীরহাট উচ্চ বিদ্যালয়।

জানা যায়, নলবাড়ী গার্লস হাই স্কুলটিতে মাধ্যমিক পর্যন্ত থাকলেও অষ্টম শ্রেণি পর্যন্ত এমপিওভুক্ত। এই স্কুল থেকে এবার দুজন ছাত্রী এসএসসিতে অংশ নিয়ে দুজনই ফেল করেছে।

এ ব্যাপারে দিনাজপুর শিক্ষা বোর্ডের চেয়ারম্যান অধ্যাপক মো. আবু বকর সিদ্দিক কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘আমি নিজে নলবাড়ি গার্লস হাই স্কুলে গিয়েছিলাম। খুবই স্বল্পসংখ্যক শিক্ষার্থী দেখেছি। শূন্য পাস করা স্কুলগুলোর বিস্তারিত তথ্য নিয়ে শিগগির মন্ত্রণালয়ে প্রতিবেদন পাঠাব। এরপর মন্ত্রণালয়ের সিদ্ধান্ত অনুসারে ব্যবস্থা নেব।’

(প্রতিবেদনটি তৈরি করতে তথ্য দিয়ে সহায়তা করেছেন পটুয়াখালী প্রতিনিধি এমরান হাসান সোহেল ও মাগুরা প্রতিনিধি শামীম খান।)



মন্তব্য