kalerkantho


অস্থায়ী বেদিতে বিভিন্ন ব্যক্তি-সংগঠনের শ্রদ্ধা

২৪ এপ্রিল শ্রমিক শহীদ দিবস ঘোষণার দাবি

নিজস্ব প্রতিবেদক, ঢাকা ও সাভার   

২৫ এপ্রিল, ২০১৮ ০০:০০



২৪ এপ্রিল শ্রমিক শহীদ দিবস ঘোষণার দাবি

রানা প্লাজা ধসের দিন ২৪ এপ্রিলকে শ্রমিক শহীদ দিবস হিসেবে ঘোষণাসহ বিভিন্ন দাবি জানানোর মধ্য দিয়ে সাভারে রানা প্লাজা ধসের পাঁচ বছর পূর্তি পালিত হয়েছে গতকাল মঙ্গলবার। ভয়াল ট্র্যাজেডির দিনটিতে উঠে এসেছে আরো বেশ কিছু দাবি। বিভিন্ন শ্রমিক সংগঠন, স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন, অ্যাকটিভিস্ট, নিহতদের স্বজন ও আহত শ্রমিকরা এদিন রানা প্লাজার সামনে নির্মিত অস্থায়ী শহীদ বেদিতে ফুল দিয়ে শ্রদ্ধা নিবেদন করেছে। এ সময় সেখানে কান্নায় ভেঙে পড়ে নিহতদের স্বজনরা।

রানা প্লাজা ট্র্যাজেডির দিনটিতে উঠে আসা দাবিগুলোর মধ্যে রয়েছে—হতাহত ও নিখোঁজ শ্রমিকদের তালিকা প্রকাশ করে উপযুক্ত ক্ষতিপূরণ ও পুনর্বাসন, রানা প্লাজার সামনে স্থায়ী স্মৃতিস্তম্ভ নির্মাণ, ভবন মালিক সোহেল রানাসহ তাঁর সহযোগী সরকারি কর্মকর্তা ও অন্যান্য অপরাধীর সর্বোচ্চ শাস্তি প্রদান, শ্রমিকদের ন্যূনতম মূল মজুরি ১০ হাজার টাকা ও মোট মজুরি ১৬ হাজার টাকা করা ইত্যাদি।

রাজধানী ঢাকাসহ দূর-দূরান্ত থেকে গতকাল হাজার হাজার সাধারণ শ্রমিক, সাধারণ মানুষ, আহত শ্রমিক, নিহত শ্রমিকদের স্বজন ও শতাধিক সংগঠনের নেতাকর্মীরা জড়ো হয় সাভারে। তাদের পুষ্পার্ঘ্যে ভরে যায় অস্থায়ী বেদিটি। পাশাপাশি ছিল ক্ষতিগ্রস্তদের প্রতি সান্ত্বনা আর সমবেদনা জানানোর চেষ্টা।

রানা প্লাজার আশপাশে থাকা নিহত ও নিখোঁজ শ্রমিকদের স্বজন, ধসের ঘটনায় আহত ও বেঁচে যাওয়া শ্রমিক, বিভিন্ন শ্রমিক সংগঠনের কর্মী ও নেতারা গতকাল সূর্যোদয়ের পর অস্থায়ী বেদিতে পুষ্পার্ঘ্য অর্পণ করেন। পাশাপাশি শ্রমিক সংগঠনের নেতারা ২০১৩ সালের ২৪ এপ্রিলে ঘটে যাওয়া ইতিহাসের ভয়াবহতম ওই ঘটনার স্মৃতিচারণা করেন। তুলে ধরেন তাঁদের দাবি-দাওয়া ও পরামর্শ।

শ্রদ্ধা নিবেদন করতে এসে সংবিধান প্রণেতা ড. কামাল হোসেন বেতন-ভাতাসহ শ্রমিকদের নায্য দাবিকে গুরুত্ব দিয়ে মালিক-শ্রমিক ও সরকারকে একসঙ্গে কাজ করার আহ্বান জানান। রানা প্লাজা ধসের স্থানটির পবিত্রতা রক্ষায় সেখানে সেবামূলক প্রতিষ্ঠান ও স্থায়ী স্মৃতিস্তম্ভ নির্মাণে সরকারের দৃষ্টি আকর্ষণ করেন তিনি।

সেদিনের ঘটনায় নিহতদের স্মরণ করে অস্থায়ী বেদিতে পুষ্পার্ঘ্য অর্পণ শেষে মানবাধিকার নেতা ও সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা অ্যাডভোকেট সুলতানা কামাল বলেন, ‘ওই ঘটনায় প্রায় দেড় হাজার শ্রমিক প্রাণ হারিয়েছে। এটাকে আমি দুর্ঘটনা মনে করি না, এটি একটি হত্যাকাণ্ড। দায়িত্বরতদের কর্তব্যে অবহেলার কারণেই এমন ভয়াবহ ঘটনা ঘটতে পেরেছে।’ তিনি বলেন, ‘দুই বছর ধরে মামলা স্থগিত করে রাখা হয়েছে। এ থেকে আমরা এই ধারণা করতে পারি, রাষ্ট্রের যে অবহেলার কারণে এই দুর্ঘটনা ঘটেছে, যাদের দায়-দায়িত্ব রয়েছে তাদের বাঁচানোর জন্যই মামলার সুরাহা হচ্ছে না।’

শ্রমিকদের বিভিন্ন দাবির প্রতি সমর্থন জানিয়ে সুলতানা কামাল বলেন, ‘রানা প্লাজা ধসের জায়গায় একটি স্থাপনা নির্মাণ করা দরকার, যে স্থাপনার মাধ্যমে সবাই ২৪ এপ্রিলের দিনটিকে স্মরণ করবেন। ২৪ এপ্রিলকে শহীদ শ্রমিক দিবস ঘোষণা করার দাবির প্রতি আমি জোর সমর্থন জানাচ্ছি।’

বিশিষ্ট লেখক ও কলামিস্ট সৈয়দ আবুল মকসুদ বলেন, ‘আমাদের সবার অবহেলার কারণে দেড় হাজার মানুষ জীবন দিয়েছেন কর্মক্ষেত্রে এসে। দুই হাজার শ্রমিক আহত হয়েছেন। নাগরিক সমাজের পক্ষ থেকে আমি তাঁদের প্রতি শ্রদ্ধা জানাতে এসেছি। আমার একটা দাবি—এই ২৪ এপ্রিল শহীদ শ্রমিক দিবস হিসেবে যেন রাষ্ট্রীয়ভাবে উদ্যাপিত হয়।’

গার্মেন্ট শ্রমিক ঐক্য ফোরামের সভাপতি শ্রমিক নেতা মোশরেফা মিশুও রানা প্লাজা ধসের ঘটনাটিকে হত্যাকাণ্ড বলে উল্লেখ করেন। তিনি বলেন, ‘এই ভবন ধসের পেছনে সোহেল রানা প্রধান অপরাধী। আর সোহেল রানার মাকে ছয় বছরের কারাদণ্ড দেওয়ার উদ্দেশ্য হলো প্রকৃত অপরাধী সোহেল রানাকে আড়াল করার চেষ্টা। টাকা খেয়ে যেসব সরকারি কর্মকর্তা ওই ভবনের অনুমোদন দিয়েছিলেন তাঁদেরও শাস্তির দাবি জানাচ্ছি।’

কাফন মিছিল : এদিকে সকাল ১০টায় গার্মেন্ট শ্রমিক সংহতির উদ্যোগে সাভারে ঢাকা-আরিচা মহাসড়কে কাফন মিছিল অনুষ্ঠিত হয় এবং মিছিল শেষে রানা প্লাজার অস্থায়ী স্মৃতিস্তম্ভে পুষ্পস্তবক অর্পণ করে সংগঠনটির নেতা-কর্মী ও শ্রমিকরা। সংগঠনটির সভাপ্রধান তাসলিমা আখ্তার ও সাধারণ সম্পাদক জুলহাসনাইন বাবুর নেতৃত্বে অনুষ্ঠিত কাফন মিছিলে অংশগ্রহণ করেন রানা প্লাজায় নিহত শ্রমিক পরিবারের সদস্যরা, আহত শ্রমিকরাসহ সংগঠনের স্থানীয় ও কেন্দ্রীয় নেতারা।

জুরাইন কবরস্থানে শ্রদ্ধা জ্ঞাপন : রানা প্লাজা ট্র্যাজেডির পাঁচ বছর পূর্তির দিনে গতকাল রাজধানীর জুরাইন কবরস্থানে ফুল দিয়ে শ্রদ্ধা জানানো এবং কবর জিয়ারতের মাধম্যে স্মরণ করা হয় নিহত শ্রমিকদের। এ সময় ওই দুর্ঘটনার জন্য দায়ীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি, নিহতদের পরিবার ও আহত শ্রমিকদের ক্ষতিপূরণ প্রদান এবং পুনর্বাসনের দাবি জানানো হয়।

দেশের বিভিন্ন স্থান থেকে জুরাইন কবরস্থানে গতকাল ফুল দিতে আসে নানা সংগঠন। এর মধ্যে রয়েছে গার্মেন্ট শ্রমিক ঐক্য পরিষদ, গার্মেন্ট শ্রমিক ফ্রন্ট, শ্রমিক নিরাপত্তা ফোরাম, গার্মেন্ট শ্রমিক ট্রেড ইউনিয়ন কেন্দ্র, তৈরি পোশাক খাতের সংগঠন বিজিএমইএ ও নিহতদের স্বজনরা।

শ্রমিক সংগঠনের নেতারা এ সময় বলেন, পরিত্যক্ত ভবনে জোর করে শ্রমিকদের কাজ করিয়ে মারা হলেও এখনো ওই ভবন মালিক রানার শাস্তি হয়নি। আহত শ্রমিক ও নিহতদের পরিবারকে পুনর্বাসন করা হয়নি। এ জন্য তাঁরা ক্ষোভ প্রকাশ করেন।


মন্তব্য