kalerkantho


জাতিসংঘের বিশেষ উপদেষ্টার মত

আন্তর্জাতিক অপরাধ হয়েছে মিয়ানমারে

রোহিঙ্গা নিয়ে ব্যর্থ হওয়া চলবে না

কূটনৈতিক প্রতিবেদক   

১৪ মার্চ, ২০১৮ ০০:০০



রোহিঙ্গাদের ওপর মিয়ানমারের নিপীড়নে ‘গণহত্যা’র জোরালো আলামত থাকার ইঙ্গিত দিয়েছেন জাতিসংঘের গণহত্যা প্রতিরোধবিষয়ক বিশেষ উপদেষ্টা আদামা দিয়েং। সাত দিনের বাংলাদেশ সফর শেষে গতকাল মঙ্গলবার বিকেলে ঢাকার আগারগাঁওয়ে মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘরে এক সংবাদ সম্মেলনে তিনি বলেন, এটি স্পষ্ট যে মিয়ানমারে আন্তর্জাতিক অপরাধ সংঘটিত হয়েছে। রোহিঙ্গা মুসলমানদের হত্যা, নির্যাতন, ধর্ষণ, জীবন্ত পুড়িয়ে মারা ও অপদস্থ করা হয়েছে। এর মূল কারণ, তারা রোহিঙ্গা।

আদামা দিয়েং বলেন, ‘আমি যেসব তথ্য পেয়েছি তা থেকে ইঙ্গিত মেলে, অপরাধ সংঘটনকারীদের উদ্দেশ্য ছিল উত্তর রাখাইন রাজ্য থেকে রোহিঙ্গাদের তাড়ানো এবং খুব সম্ভবত, রোহিঙ্গাদের ধ্বংস করা। এটি প্রমাণিত হলে তা গণহত্যা হিসেবে গণ্য হতে পারে।’ তিনি আরো বলেন, ‘গণহত্যা বা মানবতাবিরোধী অপরাধ হিসেবে আমরা গণ্য করি না করি, আমাদের ভূমিকা রাখার অঙ্গীকার বাস্তবায়নে দেরি করা উচিত নয়।’

জাতিসংঘের এই বিশেষ উপদেষ্টা বলেন, ‘রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীকে নিয়ে আমাদের আর ব্যর্থ হওয়া চলবে না। সমস্যা ও সমাধান—দুটোই মিয়ানমারে। নৃশংস অপরাধ থেকে এই জনগোষ্ঠীকে সুরক্ষার দায়িত্ব আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়েরও আছে। তবে বর্তমান অবস্থা অব্যাহত থাকলে রোহিঙ্গাদের ওপর হামলাকারীদেরই জয় হবে। আমরা তা চাই না।’

মিয়ানমারে নিপীড়নের শিকার হয়ে এ দেশে আশ্রয় নেওয়া রোহিঙ্গাদের পরিস্থিতি দেখতে গত ৭ মার্চ বাংলাদেশ সফর শুরু করেন আদামা দিয়েং। তিনি বলেন, রোহিঙ্গাদের ওপর যে নিপীড়ন হয়েছে তার পুনরাবৃত্তি ঠেকানোর উপায় নিয়ে কাজের অংশ হিসেবে বাংলাদেশ সরকারের আমন্ত্রণে তিনি এ দেশ সফর করেছেন। বছরের পর বছর ধরে মিয়ানমারকে অনুরোধ করা সত্ত্বেও দেশটি তাঁকে সেখানে সফরের সুযোগ দেয়নি। তিনি আশা করেন, মিয়ানমার একদিন সৎসাহস নিয়ে তাঁকে রাখাইন সফরের সুযোগ দেবে। আর সেই সুযোগে তিনি সেখানকার পরিস্থিতি জানার চেষ্টা করবেন।

আদামা দিয়েং বলেন, তিনি তাঁর পর্যবেক্ষণ ও সুপারিশ জাতিসংঘ মহাসচিবের কাছে উপস্থাপন করবেন। তিনি বলেন, সংকট সমাধানে মিয়ানমারের ন্যূনতম সদিচ্ছাও তিনি দেখতে পাননি। সংবাদ সম্মেলনে তিনি তিনটি করণীয়র ওপর জোর দেন। এর প্রথমটিই হলো রোহিঙ্গা সংকটের মূল কারণের সমাধান। এ ক্ষেত্রে তিনি রোহিঙ্গাদের নাগরিকত্ব সমস্যার সমাধানকে অগ্রাধিকার হিসেবে চিহ্নিত করেন। দ্বিতীয় করণীয় হিসেবে তিনি রাখাইন রাজ্যে সংঘটিত অপরাধগুলোর জবাবদিহি নিশ্চিত করার বিষয়ে জোর দেন। তিনি বলেন, ‘গুরুতর বিভিন্ন অপরাধ সংঘটিত হওয়ার পর মিয়ানমার যেভাবে তা অস্বীকার করেছে তাতে আমি নিজেই হতবাক হয়েছি। আমি আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়, বিশেষ করে জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদকে জবাবদিহির বিভিন্ন উপায় কাজে লাগানোর বিষয়টি বিবেচনার আহ্বান জানাব। বিশ্বকে দেখানো প্রয়োজন যে এমন বর্বর ঘটনা আমরা সহ্য করতে প্রস্তুত নই।’ তৃতীয় করণীয় হিসেবে আদামা দিয়েং বাংলাদেশে অবস্থানরত রোহিঙ্গাদের সুরক্ষা ও সহযোগিতা পাওয়ার বিষয়টি নিশ্চিত করার তাগিদ দিয়েছেন।

আন্তর্জাতিক ফৌজদারি আদালতের (আইসিসি) সদস্য না হওয়ায় মিয়ানমারের বিচার কিভাবে সম্ভব জানতে চাইলে জাতিসংঘের বিশেষ উপদেষ্টা বলেন, রুয়ান্ডা, যুগোশ্লাভিয়া আইসিসির সদস্য রাষ্ট্র ছিল না। এরপর জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদের সিদ্ধান্তে সেখানে তাদের বিচার হয়েছে। তিনি বলেন, আঞ্চলিক জোট বা দেশগুলো সিদ্ধান্ত নিলেও মিয়ানমারের বিচার সম্ভব।

সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে আদামা দিয়েং রোহিঙ্গা নিপীড়নের বিচারের জন্য জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদ, বিশেষ করে ‘ভেটো’ ক্ষমতাধর পাঁচ পরাশক্তির ভূমিকা প্রত্যাশা করেন। এ ছাড়া তিনি চীন ও ভারতের মতো এ অঞ্চলের প্রভাবশালী দেশগুলোকেও ‘নৈতিক নেতৃত্ব’ দেখানোর আহ্বান জানান।

আদামা দিয়েং বলেন, রোহিঙ্গা নিপীড়নের বিষয়ে তথ্য-প্রমাণ, সাক্ষ্য সংগ্রহের জন্য কোনো কমিটি গঠিত হলে মিয়ানমার কর্তৃপক্ষ হয়তো তাদের ওই দেশে ঢুকতে দেবে না। কিন্তু ওই কমিটি বাংলাদেশে এসে রোহিঙ্গাদের কাছ থেকে তথ্য-উপাত্ত, সাক্ষ্য গ্রহণ করতে পারে। এটি এমনভাবে করা উচিত যাতে বিচারিক আদালতে স্বচ্ছতা ও দক্ষতার সঙ্গে উপস্থাপন করা যায়।

আদামা দিয়েং বলেন, রোহিঙ্গাদের ইচ্ছার বিরুদ্ধে মিয়ানমারে পাঠানো হবে না বলে বাংলাদেশ কর্তৃপক্ষ তাঁকে আশ্বাস দিয়েছেন। এতে তিনি উৎসাহ বোধ করছেন। তিনি বলেন, রাখাইনে সহিংসতার মাত্রা কমলেও তা বন্ধ হয়নি। রাখাইন থেকে রোহিঙ্গারা এখনো আসছে।

 



মন্তব্য