kalerkantho


শ্রদ্ধা ও ভালোবাসায় বিদায় প্রিয়ভাষিণী

নিজস্ব প্রতিবেদক   

৯ মার্চ, ২০১৮ ০০:০০



শ্রদ্ধা ও ভালোবাসায় বিদায় প্রিয়ভাষিণী

গতকাল কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে মুক্তিযোদ্ধা ও ভাস্কর ফেরদৌসী প্রিয়ভাষিণীর কফিনে ফুল দিয়ে শুভেচ্ছা জানায় সর্বস্তরের মানুষ। ছবি : কালের কণ্ঠ

অসংখ্য মানুষের শ্রদ্ধা ও ভালোবাসায় রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় বিদায় নিলেন মুক্তিযোদ্ধা ও ভাস্কর ফেরদৌসী প্রিয়ভাষিণী। গতকাল বৃহস্পতিবার কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে ফুলেল শ্রদ্ধা ও ভালোবাসায় সিক্ত হয়ে একাত্তরের এই যোদ্ধা চিরশয়ানে শায়িত হন রাজধানীর মিরপুরের বুদ্ধিজীবী কবরস্থানে। সেখানে শহীদ জননী জাহানারা ইমামের কবরের পাশে তাঁকে সমাহিত করা হয়।

কিডনি ও হৃদরোগের জটিলতা নিয়ে ঢাকার একটি হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় গত মঙ্গলবার মৃত্যু হয় ফেরদৌসী প্রিয়ভাষিণীর। বাংলাদেশের সর্বোচ্চ বেসামরিক সম্মান স্বাধীনতা পুরস্কারে ভূষিত এই মুক্তিযোদ্ধার বয়স হয়েছিল ৭১ বছর। প্রিয়ভাষিণীর মরদেহ গত মঙ্গল ও বুধবার রাখা হয় বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয় হিমঘরে। তাঁর ছোট ছেলে কাজী মহম্মদ শাকের তূর্য অস্ট্রেলিয়া থেকে ফিরলে গতকাল বৃহস্পতিবার সকালে শুরু হয় শেষযাত্রার আনুষ্ঠানিকতা।

সকাল ১১টায় ফেরদৌসী প্রিয়ভাষিণীর কফিন নিয়ে আসা হয় কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে। এ সময় তাঁর কফিনের সঙ্গে ছিলেন মেয়ে রত্নেশ্বরী প্রিয়দর্শিনী, ফুলেশ্বরী প্রিয়নন্দিনী, ছেলে কারু তিতাস ও কাজী শাকের তূর্য। সেখানে সম্মিলিত সাংস্কৃতিক জোটের ব্যবস্থাপনায় অনুষ্ঠিত শ্রদ্ধাঞ্জলির শুরুতেই তাঁকে ঢাকা জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে রাষ্ট্রীয় সম্মান গার্ড অব অনার প্রদান করা হয়। এর পর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় জামে মসজিদে জানাজা শেষে তাঁর লাশ বিকেল সাড়ে ৩টায় মিরপুর শহীদ বুদ্ধিজীবী কবরস্থানে শহীদ জননী জাহানারা ইমামের কবরের পাশে সমাহিত করা হয়।

শহীদ মিনারে জাতীয় সংসদের পক্ষে স্পিকার ড. শিরীন শারমিন চৌধুরী ফেরদৌসী প্রিয়ভাষিণীর প্রতি শ্রদ্ধা জানান। আওয়ামী লীগের পক্ষে সাধারণ সম্পাদক এবং সড়ক পরিবহন ও সেতু মন্ত্রী ওবায়দুল কাদের, তথ্য মন্ত্রণালয়ের পক্ষে তথ্যমন্ত্রী হাসানুল হক ইনু শ্রদ্ধা জানান। সাংগঠনিকভাবে আরো শ্রদ্ধা জানায় সম্মিলিত সাংস্কৃতিক জোট, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, ওয়ার্কার্স পার্টি, মহিলা পরিষদ, কর্মজীবী নারী, বেঙ্গল ফাউন্ডেশন, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়, ছাত্র ইউনিয়ন, সম্মিলিত সামাজিক আন্দোলন, সংস্কৃতিবিষয়ক মন্ত্রণালয়, নৌ, পুলিশ, ছাত্রমৈত্রী, গণজাগরণ মঞ্চ, স্বাস্থ্য অধিদপ্তর, ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ, ল্যাবএইড, গণসংগীতশিল্পী সমন্বয় পরিষদ, ঋষিজ, মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘর, সেক্টর কমান্ডারস ফোরাম, উদীচী, জাতীয় কবিতা পরিষদ, সংগীত সংগঠন সমন্বয় পরিষদ, ঢাকা ও জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা অনুষদ, প্রজন্ম ’৭১, ছায়ানট, একাত্তরের ঘাতক দালাল নির্মূল কমিটি, আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালসহ বিভিন্ন সামাজিক-রাজনৈতিক-সাংস্কৃতিক সংগঠন।

ব্যক্তিগতভাবে ফেরদৌসী প্রিয়ভাষিণীর প্রতি শ্রদ্ধা জানাতে আসেন ইমেরিটাস অধ্যাপক আনিসুজ্জামান, সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব কামাল লোহানী, রামেন্দু মজুমদার, শিল্পী আবুল বারক্্ আলভী, ডা. সারওয়ার আলী, প্রাবন্ধিক মফিদুল হক, জনপ্রশাসন প্রতিমন্ত্রী ইসমত আরা সাদেক, অধ্যাপক মুনতাসীর মামুন, শিল্পী মনিরুল ইসলাম, কথাসাহিত্যিক আনোয়ারা সৈয়দ হক, ব্যারিস্টার তুরিন আফরোজ, শিল্পী ফকির আলমগীর, শুভ্রদেব, ডা. জাফরউল্লাহ. কবি কামাল চৌধুরী, নাট্যজন ম হামিদ প্রমুখ।

শ্রদ্ধাঞ্জলি শেষে পরিবারের পক্ষে ফেরদৌসী প্রিয়ভাষিণীর মেয়ে ফুলেশ্বরী প্রিয়নন্দিনী বলেন, গত চার মাস মা ঘরের বাইরে যেতে পারেননি। তিনি ফাল্গুন দেখেননি, আজ আপনারা এত ফুলে মাকে শ্রদ্ধা জানিয়ে, তাঁকে এক ফাল্গুন উপহার দিলেন। মা তাঁর শেষ ঠিকানা পেয়েছেন, মা ঘুমাবেন শহীদ জননী জাহানারা ইমামের পাশে। এর জন্য আমরা আজ গর্বিত।

শিরীন শারমিন চৌধুরী বলেন, নারী আন্দোলনের সকল পর্যায়ে তিনি সামনের সারিতে থেকে নেতৃত্ব দিয়েছেন। নারীর অধিকার প্রতিষ্ঠায় সোচ্চার এ কণ্ঠস্বর কখনো পিছপা হননি।

ওবায়দুল কাদের বলেন, নির্যাতিত মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে তাঁর যে ত্যাগ-তিতিক্ষা, তা নতুন প্রজন্মের কাছে উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত হয়ে থাকবে। তার ভাস্কর্য শিল্পচর্চায় নতুন মাত্রা যোগ করেছে, শিল্প পেয়েছে এক নতুন মাত্রা।

তথ্যমন্ত্রী হাসানুল হক ইনু বলেন, সাহস থাকলে যে সব বাধা অতিক্রম করা যায়, তার উদাহরণ ফেরদৌসী প্রিয়ভাষিণী। তাঁর ওপর বারবার আঘাত এসেছে, কিন্তু তিনি বারবার ঘুরে দাঁড়িয়েছেন।

ইমেরিটাস অধ্যাপক আনিসুজ্জামান বলেন, ফেরদৌসী প্রিয়ভাষিণী একই সঙ্গে সাহস ও সম্ভ্রমের প্রতীক। মুক্তিযুদ্ধের মূল্যবোধ ছড়িয়ে দেওয়ার জন্য তাঁর অবদান অনুকরণীয় দৃষ্টান্ত।

কামাল লোহানী বলেন, তিনি ছিলেন সাহসী নারীর প্রতীক। মুক্তিযুদ্ধে নির্যাতনের কথা লুকিয়ে না রেখে লোকসমাজে তা প্রকাশ করেছেন।

রামেন্দু মজুমদার বলেন, তিনি শিল্পী হিসেবে অনেক বড়, তবে তাঁর সামাজিক গুরুত্ব আরো বেশি।

মফিদুল হক বলেন, তাঁর কপালের বড় টিপ আমার কাছে ‘জয়ন্তিকা’। তিনি আজীবন সংগ্রাম করেছেন।

শ্রদ্ধা জানাতে সিরাজগঞ্জ ও পটুয়াখালী থেকে আসেন সাত বীরাঙ্গনা। সিরাজগঞ্জ থেকে আসা বীরাঙ্গনা রাহেলা বেওয়া বলেন, ‘কোনো বিপদে কারে কমু, যামু কৈই।’ এতটুকু বলেই কান্নায় ভেঙে পড়েন রাহেলা বেওয়া।

নাগরিক স্মরণসভা : সম্মিলিত সাংস্কৃতিক জোটের সভাপতি গোলাম কুদ্দুছ জানিয়েছেন, আগামী ১৩ মার্চ বিকেল সাড়ে ৪টায় কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে ফেরদৌসী প্রিয়ভাষিণীর নাগরিক স্মরণসভা অনুষ্ঠিত হবে।



মন্তব্য