kalerkantho


ফাগুয়া উৎসবে রঙিন হবিগঞ্জের চা বাগান

শাহ ফখরুজ্জামান, হবিগঞ্জ   

৩ মার্চ, ২০১৮ ০০:০০



ফাগুয়া উৎসবে রঙিন হবিগঞ্জের চা বাগান

চা বাগানগুলোতে শুরু হয়েছে তিন দিনের ফাগুয়া উৎসব। ছবি : কালের কণ্ঠ

চা বাগানের গাছগুলো শীতে যে রুক্ষতা ধারণ করেছিল তা ধীরে ধীরে কেটে যাচ্ছে। শীত শেষে বসন্তের আগমনে চা গাছে সবুজ কুড়ি অঙ্কুরিত হওয়ার পর আনুষ্ঠানিকভাবে তা আহরণও শুরু হয়েছে। সঙ্গে বসন্তের রং-রূপ যেন ঠিকরে পড়েছে চা বাগানের শান্ত প্রকৃতিতে। সেই চিরচেনা দৃশ্য। গাছে গাছে দুটি পাতা একটি কুঁড়ি। মাঝখানে কয়েক দিন আগের একপশলা বৃষ্টি এখানকার প্রকৃতিকে আরো সতেজ করে দিয়ে গেছে। তার মধ্যেই শুরু চা উত্তোলনের মৌসুম। আর এই কাজের মহাসমারোহের মধ্যে চা বাগানগুলোতে শুরু হয়েছে তিন দিনের ফাগুয়া উৎসব। মার্চের প্রথম দিন থেকে এই উৎসবে বসন্তের রঙে রঙিন হয়ে উঠেছে হবিগঞ্জের চুনারুঘাটের বিভিন্ন চা বাগান।

সরেজমিনে চুনারুঘাটের চা বাগান এলাকায় গিয়ে দেখা গেছে, সারি সারি টিলার কোলে লাখ লাখ চা গাছ। তাতে কচি পাতা গজাচ্ছে। বিবর্ণ ভাব এখনো পুরোটা কাটেনি। তবে চা শিল্পাঞ্চলের মানুষের মনে ভর করেছে রংধনুর সাত রং। তারা মেতে উঠেছে রঙের উৎসব ফাগুয়ায়। বেগুনি, নীল, আকাশি, সবুজ, হলুদ, কমলা, লাল রঙের আবিরে চারদিক সয়লাব। যেদিকে চোখ যায় সেদিকেই রঙের ছড়াছড়ি। নারী-পুরুষ, তরুণ-তরুণী, কিশোর-কিশোরীসহ সব বয়সীরা মেতে উঠেছে ফাগুয়া উৎসবে। মনের আনন্দে একে অন্যের দিকে ছুড়ে মারছে আবির। নাচে-গানে মুখরিত করে তুলেছে এখানকার পরিবেশ। প্রাণের উচ্ছ্বাসে ভুলে গেছে বয়সের ভেদাভেদ।

চুনারুঘাট উপজেলার চান্দপুর, চণ্ডিছড়া, নালুয়া, আমু, লস্করপুর, চাকলাপুঞ্জি, পারকুল, রেমা, শ্রীবাড়ী, দেউন্দিসহ বিভিন্ন চা বাগান ঘুরে দেখা গেছে এই অপূর্ব দৃশ্য। একে অন্যকে আবির ছড়িয়ে রাঙিয়ে দিচ্ছে। এমনকি চা বাগান এলাকায় বাইরের কেউ গেলে তাকেও আনন্দের ভাগিদার করতে রাঙিয়ে দেওয়া হচ্ছে। উপজেলার ছোট-বড় ২৪টি চা বাগানে চলছে এই উৎসব।

চা শ্রমিক ইউনিয়নের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক নিপেন পাল জানান, বছরে নানা উৎসবের মধ্যে অন্যতম প্রধান দুটি উৎসবে চা জনগোষ্ঠীর মানুষ আনন্দ করার সুযোগ পায়। এর মধ্যে রয়েছে সনাতন হিন্দু ধর্মের দুর্গোৎসব এবং রঙের উৎসব ফাগুয়া। প্রতিবছর ফাল্গুন মাসের শেষ দিক থেকে চৈত্র মাসের প্রথম সপ্তাহে পূর্ণিমা তিথিতে এ উৎসব চলে। ফাগুয়া উৎসব উপলক্ষে চা বাগানে ১, ২ ও ৩ মার্চ ছুটি দেওয়া হয়। উৎসব শুরুর আগে রাতের বেলায় চা বাগান থেকে লাকড়ি সংগ্রহ করা হয়। মূলত হোলি উৎসবের আরেক রূপ হলো ফাগুয়া উৎসব। চা শ্রমিকরা এ উৎসবকে রংপূজাও বলে থাকে।

চা শ্রমিকদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, ছন্দ, তাল, লয়হীন চা শ্রমিকদের জীবনে ফাগুয়া উৎসব এনে দেয় মহানন্দের জোয়ার। এই আনন্দ ছড়িয়ে পড়েছে প্রতিটি চা বাগানে। চারদিকে রঙের ছড়াছড়ি। ছোপ ছোপ রঙের দাগ লেগে আছে চা বাগানের অলিগলিতে, শ্রমিক লাইন, বাড়িঘরের আঙিনায়। গতকাল শুক্রবার দুপুরে উপজেলার সাতছড়ি চা বাগানে গিয়ে দেখা যায়,  তরুণ-তরুণীরা রঙিন জামাকাপড় পরে নাচের দল নিয়ে বেরিয়ে পড়েছে। একপর্যায়ে তারা হাজির হয় সাতছড়ি ত্রিপুরাপল্লী ও উদ্যান এলাকায়। সেখানেই তারা পরিবেশন করে চা বাগানের ঐতিহ্যবাহী কাঠিনৃত্য। এই উৎসবে মিলেমিশে একাকার হয়ে যায় জাতীয় উদ্যানে বেড়াতে আসা পর্যটকরা।

চান্দপুর চা বাগানে গিয়েও দেখা গেল একই দৃশ্য। শিশু-কিশোর, তরুণ-তরুণী, সবাই নেচেগেয়ে আনন্দ প্রকাশ করছে। শত অভাব-অনটনের মধ্যেও উৎসবের এই তিন দিন তারা পরিবার-পরিজন নিয়ে আনন্দে কাটানোর চেষ্টা করে। এ আনন্দ ভাগাভাগি করে নেওয়ার চেষ্টা করে প্রতিবেশীদের সঙ্গে। দূর-দূরান্ত থেকে চা বাগানের মেয়েরা নাইওর এসেছে জামাইসহ। চা শ্রমিক বাবারা তাদের সামর্থ্য অনুযায়ী উৎসব উপলক্ষে পরিবারে ভালো খাবারের ব্যবস্থা করেন। নতুন জামাকাপড় উপহার দেন মেয়ে, মেয়ের জামাই, নাতি-নাতনিকে। জামাইরাও শ্বশুর-শাশুড়িকে নতুন জামাকাপড় উপহার দেন।

চা বাগানের বাজারগুলোতে দোকানিরা বসেছে মিঠাই-মণ্ডা সাজিয়ে। উৎসবের এই কয়েকটা দিন তাদের ভালোই বিকিকিনি হয়।

এদিকে হবিগঞ্জের বাহুবল উপজেলার পূর্ব জয়ুর গ্রামে শচী অঙ্গনে আয়োজন করা হয়েছে দোলযাত্রা ও শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভুর জন্মোৎসব। গত বৃহস্পতিবার রাতে সেখানে বিশেষ পূজা, ভোগরাগ ও কীর্তন অনুষ্ঠিত হয়।



মন্তব্য