kalerkantho


রঙিন জাগরণে বসন্তবরণ

তৌফিক মারুফ   

১৪ ফেব্রুয়ারি, ২০১৮ ০০:০০



রঙিন জাগরণে বসন্তবরণ

গতকাল ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় চারুকলার বকুল তলায় বসন্ত বরণ করে জাতীয় বসন্ত উদ্যাপন পরিষদ। ছবি : কালের কণ্ঠ

রবীন্দ্রনাথ যেমন ‘আহা আজি এ বসন্তে কত ফুল ফোটে, কত পাখি গায়’ গানের মধ্য দিয়ে মানুষের হৃদয়ে জাগিয়ে তুলেছেন প্রকৃতির বাসন্তী দোলা, নজরুল সেই বসন্তকে ‘এলো বনান্তে পাগল বসন্ত। বনে বনে মনে মনে রঙ সে ছড়ায় রে, চঞ্চল তরুণ দুরন্ত’ বলে তারুণ্যকে জাগিয়েছেন। কালের চাকায় সময় বদলে গেলেও সেই একই রং-রূপ-আবহ নিয়ে অকৃত্রিম বসন্ত যেন বারবার ফিরে আসে। তার রূপে-আবেশে উছলে ওঠে বাঙালির প্রাণ। প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে বসন্তের মহিমা একটুও ম্লান হয় না।

গতকাল মঙ্গলবার ছিল বসন্ত ঋতুর প্রথম দিন পহেলা ফাল্গুন। ফাগুনের জাগরণে মেতে উঠেছিল সব বয়সের মানুষ। ঘরে-বাইরে সবখানে বাসন্তী রঙে মিলেমিশে একাকার। উত্তরের হিমেল হাওয়া এরই মধ্যে বিদায় নিয়ে বইছে দক্ষিণের মৃদুমন্দ বাতাস। এরই মধ্যে ফাগুনের প্রথম প্রহরে বসন্তকে বরণ করে নিতে বাসন্তীরাঙা বসন আর ফুলের শোভায় সজ্জিত হয়ে মানুষ ঘর থেকে বেরিয়ে ছুটেছে উৎসবের আঙিনায়। তবে আনুষ্ঠানিকতা আর উৎসব ছাপিয়ে রাজধানীর পথে-প্রান্তরে ছড়িয়ে পড়েছিল বসন্তের এই জোয়ার। মাথায় ফুল, গলায় ফুল, কারো বা হাতে ফুলের বৈচিত্র্যময় সাজ। পোশাকজুড়েও ছিল বাসন্তী রঙের ব্যবহার।

গতকাল ভোর থেকে সন্ধ্যা পেরিয়ে রাত পর্যন্তও শেষ হচ্ছিল না যেন বাংলা ঋতুরাজ বসন্তকে বরণ করে নেওয়ার এই পালা। সড়কে যানজট, পার্কে-উদ্যানে যেদিকে চোখ গেছে, ভেসে উঠেছে রঙের বাহার। বিশেষ করে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, একুশের বইমেলা প্রাঙ্গণ, সোহরাওয়ার্দী উদ্যান, রমনা পার্ক, ধানমণ্ডি লেক, জাতীয় সংসদ ভবনের চারপাশসহ নগরীর অন্যান্য এলাকায়ও লাখো মানুষের ভিড় জমে বাসন্তী সাজে।

রাজধানীর নীলক্ষেত এলাকায় গতকাল দুপুরে রোদের মধ্যে নিউ মার্কেট থেকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের দিকে যেতে যেতে এক তরুণী শাহরিয়া আয়ান বাসন্তী রঙের শাড়ি আর মাথায় ফুলের সাজ নিয়ে বলেন, ‘বছরের বেশির ভাগ সময়ই তো পড়াশোনায় কাটে। তাই এই সময়টায় নিজেকে প্রাণভরে রঙিন করে সাজিয়ে তুলতে ইচ্ছে করে। দেখুন না, চারদিক আজ কী অপূর্ব সাজে রঙিন হয়ে উঠেছে।’

বিকেলে ধানমণ্ডি লেকের পারে রবীন্দ্রসরোবরে বসন্ত উৎসবে অংশ নিতে আসা মধ্যবয়সী মোতাহার হোসেন বলেন, ‘এখন আর বয়সে তরুণ নই, কিন্তু তারুণ্য তো শেষ হওয়ার নয়। এই দিনটিতে সত্যিই চিরায়ত এক তারুণ্যের জয়ধ্বনি শুনতে পাই। তাই স্ত্রী-সন্তানদের নিয়ে এমন রঙিন সাজে ঘর থেকে বেরিয়ে এসেছি।’

এদিকে গতকাল ঢাকায় বরাবরের মতোই বসন্তের সর্বজনীন মূল আয়োজন ছিল ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা অনুষদের বকুলতলায়। ‘এসো মিলি প্রাণের উৎসবে’ শিরোনামে জাতীয় বসন্ত উদ্যাপন পরিষদ এ আয়োজন করে। সকাল ৭টায় সুরের মূর্ছনায় শুরু হয় বসন্তবরণের আনুষ্ঠানিকতা। পরে একে একে চলে আরো বৈচিত্র্যময় অনেক পরিবেশনা। আগের চেয়ে গতকাল এ উৎসবে ভিড় ছিল অনেক বেশি। শিল্পীদের নাচ-গানে মুগ্ধ হয় দর্শক-শ্রোতা। সেই সঙ্গে সংস্কৃতিজন সৈয়দ হাসান ইমাম ও ভাস্বর বন্দ্যোপাধ্যায়ের কবিতা, নার্গিস চৌধুরী ও লাইসা আহমেদ লিসা, মিতা হক, প্রিয়াংকা গোপ, বুলবুল ইসলামসহ অন্যদের গানগুলো আরো উচ্ছ্বসিত করে তোলে সমবেতদের।

সৈয়দ হাসান ইমাম বলেন, অন্য যেকোনো উৎসবের চেয়ে অনেক বেশি রঙিন এই বসন্ত উৎসব। এ আয়োজনের মধ্য দিয়ে মানুষ আর প্রকৃতি যেন এক হয়ে মিশে যায়। ফলে প্রতিবছর এখানে ছুটে আসি।

শিল্পকলা একাডেমিতে তিন দিনের বসন্ত উৎসব : গতকাল সকাল ১০টায় একাডেমি প্রাঙ্গণে উন্মুক্ত মঞ্চে ‘ওরে ভাই ফাগুন লেগেছে বনে বনে’ গানের কথায় সমবেত সংগীতের মাধ্যমে উদ্বোধন হয় তিন দিনের বসন্ত উৎসব। সংগীত, নৃত্য, আবৃত্তি দিয়ে সাজানো এই আয়োজনে দেশের বিশিষ্ট শিল্পীরা অংশ নেন। আজ ও কাল সন্ধ্যায় থাকবে সাংস্কৃতিক পরিবেশনা।

জাতীয় সংসদেও বসন্তের আবহ : ঋতুরাজ বসন্তের প্রথম দিনে গতকাল জাতীয় সংসদেও ছড়িয়ে পড়ে বসন্তের আবেশ। বসন্ত উৎসবের চেতনা ধারণ করে সংসদ সদস্যদের অনেকে বাসন্তী রঙের পোশাক পরে অধিবেশনে যোগ দেন। গতকাল বিকেলে অধিবেশনের শুরুতে স্পিকার ড. শিরীন শারমিন চৌধুরীকে বাসন্তী রঙের শাড়ি পরে অধিবেশন পরিচালনা করতে দেখা যায়। আর রাষ্ট্রপতির ভাষণের ওপর আলোচনায় অংশ নিয়ে অনেকে বাসন্তী শুভেচ্ছা জানিয়েছেন।

 



মন্তব্য