kalerkantho


অরক্ষিত হাতিরঝিল

মাদকসেবীদের বিরোধে অহরহ খুন খারাবি

রেজোয়ান বিশ্বাস   

১০ ফেব্রুয়ারি, ২০১৮ ০০:০০



মাদকসেবীদের বিরোধে অহরহ খুন খারাবি

গভীর রাত। হাতিরঝিল প্রকল্পের ভেতর এক দল মাদকসেবী তরুণ হৈ-হুল্লোড় করছে। তাদের কাছে রয়েছে ইয়াবা, ফেনসিডিল, ধারালো ছুরি, আগ্নেয়াস্ত্র ও চাপাতি। একসময় ইয়াবা বিক্রির টাকার ভাগবাটোয়ারা নিয়ে সংঘর্ষে জড়িয়ে পড়ে তারা। হাতাহাতি থেকে ঘটনাটি রক্তপাতে গড়ায়। সিরাজুল ইসলাম নামের এক যুবককে ছুরিকাঘাতে হত্যা করে তারা। হত্যার এই ঘটনাটি সম্প্রতি ঘটেছে। মাদক নিয়ে সেখানে এমন ঘটনা অহরহ ঘটছে। গত এক বছরে হাতিরঝিলের পানি থেকে উদ্ধার করা হয়েছে ১৫টি লাশ।

এর বাইরেও দৃষ্টিনন্দন হাতিরঝিলে আতঙ্কের যেন শেষ নেই। বেড়াতে আসা বিনোদন পিপাসুদের অস্ত্রের মুখে জিম্মি করে সর্বস্ব লুটে নিচ্ছে ছিনতাইকারীরা। কিছুদিন পর পর বেপরোয়া গাড়ির চাকায় প্রাণ হারাচ্ছে পথচারীরা। মালবোঝাই ট্রাকসহ অন্যান্য যানবাহন বাধা ছাড়াই রাতে উল্টোপথে চলছে। আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সঙ্গে ‘বন্দুকযুদ্ধে’র মতো স্পর্শকাতর ঘটনাও ঘটেছে হাতিরঝিলে। সরেজমিনে খোঁজ নিয়ে এসব তথ্যের সত্যতা মিলেছে।

আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতির এই অবনতির কারণে হাতিরঝিল প্রকল্প মূলত অরক্ষিত। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী একাধিক বৈঠক করেও সফল হতে পারেনি। আবার এখানকার আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতির পেছনে সীমানা নিয়ে থানা পুলিশের দ্বন্দ্বও একটি অন্যতম কারণ। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক পুলিশের একজন কর্মকর্তা জানান, হাতিরঝিল প্রকল্পে গুলশান, বাড্ডা, তেজগাঁও শিল্পাঞ্চল, রমনা ও রামপুরা থানার সীমানা রয়েছে। ফলে এলাকাসংক্রান্ত ঝামেলায় থানাগুলোর মধ্যে প্রায়ই বিভ্রান্তি সৃষ্টি হয়। কোনো ঘটনা ঘটলে থানাগুলো দায়িত্ব এড়িয়ে যায়। এই পরিস্থিতিতে হাতিরঝিলকে সুরক্ষিত করতে নতুন থানার কার্যক্রম শুরু হয়েছে। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় থেকে গত বছর ২৭ ডিসেম্বর একটি চিঠি পাঠানো হয়েছে প্রধান হিসাবরক্ষণ কর্মকর্তার কাছে।  নতুন থানার জন্য জায়গা খোঁজা হচ্ছে বলে জানিয়েছেন হাতিরঝিল ফাঁড়ির দায়িত্বপ্রাপ্ত এসআই মিজানুর রহমান।

সরেজমিনে গিয়ে জানা যায়, নিহত সিরাজুল ইসলাম ব্র্যাক ব্যাংকের ক্লিনার ছিলেন। তিনি মাদক ব্যবসায়ীচক্রের সঙ্গে জড়িয়ে পড়েছিলেন। ঘটনার প্রত্যক্ষদর্শী সাইফুল ইসলাম নামের এক পথচারী কালের কণ্ঠকে জানান, মেরুল বাড্ডা থেকে হাতিরঝিল প্রবেশ পথের অদূরে সিরাজুল ইসলামকে ছুরিকাঘাত করে স্থানীয় মাদক সন্ত্রাসীরা। তাঁকে উদ্ধার করে ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে নেওয়ার পর তিনি মারা যান।

বাড্ডা থানার ওসি কাজী ওয়াজেদ মিয়া বলেন, সিরাজুল ইসলাম হত্যাকাণ্ডে জড়িত থাকার অভিযোগে ডেভিড নামে এক সন্ত্রাসীকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। জিজ্ঞাসাবাদে সে সিরাজুল হত্যাকাণ্ডে জড়িত থাকার কথা স্বীকার করেছে। সেই সঙ্গে এ ঘটনায় জড়িত অন্যদের সম্পর্কেও গুরুত্বপূর্ণ তথ্য দিয়েছে সে। তার দেওয়া তথ্য থেকে জানা গেছে, হাতিরঝিলকেন্দ্রিক একাধিক বখাটে গ্রুপ রয়েছে। সেই সঙ্গে পাওয়া গেছে তার ২০ সহযোগীর নানা তথ্য। এই তরুণরা হাতিরঝিলে নিয়মিত ইয়াবাসহ বিভিন্ন ধরনের মাদক সেবন করে। সেখানে বেড়াতে যাওয়া তরুণীদের উত্ত্যক্ত করে। প্রতিবাদ করলে পড়তে হয় বিপদে। প্রায়ই সন্ধ্যার পর তাদের হাতিরঝিলে জড়ো হতে দেখা যায়।

রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (রাজউক) অধীনে সেনাবাহিনীর  স্পেশাল ওয়ার্ক অরগানাইজেশন প্রকল্পটি বাস্তবায়নের দায়িত্বে রয়েছে। জানতে চাইলে দায়িত্বপ্রাপ্ত মেজর এ এস এম সাদিক শাহারিয়ার বলেন, ‘হাতিরঝিল মহানগরবাসীর জন্য একটা স্বপ্নকল্প। প্রতিদিন এখানে বিভিন্ন এলাকার অসংখ্য মানুষ ঘুরতে আসে। যেকোনো অনিয়ম ঘটলেই তাত্ক্ষণিক ব্যবস্থা নেওয়া হয়। আমরা হাতিরঝিলের সৌন্দর্য ধরে রাখার চেষ্টা করে যাচ্ছি।’



মন্তব্য