kalerkantho


প্রভাবশালীর হুমকি, বিপাকে জেলেরা

রফিকুল ইসলাম, রাজশাহী   

২১ জানুয়ারি, ২০১৮ ০০:০০



প্রভাবশালীর হুমকি, বিপাকে জেলেরা

রাজশাহীর গোদাগাড়ীতে জেলেদের প্রতিবাদের মুখে একটি সরকারি খালের লিজ বাতিল করা হলেও সেখানে মাছ শিকার করতে পারছে না সাধারণ জেলেরা। ইজারাদারের লোকজন খাল পাহারা দিয়ে জেলেদের বিভিন্ন হুমকি ও বাধা দিচ্ছে। ফলে প্রতিবছর খালটিতে মাছ ধরে জীবিকা নির্বাহ করে আসা সহস্রাধিক পরিবার অসহায় হয়ে পড়েছে।

গোড়াগাড়ীর রিশিকুল ইউনিয়নের প্রসাদপাড়া থেকে সাত কিলোমিটার খালটি এসবিডি অ্যাগ্রো লিমিটেড নামের একটি প্রতিষ্ঠানকে ইজারা দেয় বরেন্দ্র বহুমুখী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (বিএমডিএ)। খালটিতে প্রায় কোটি টাকার মাছ রয়েছে। কিন্তু অনিয়ম করে মাত্র এক লাখ ২৬ হাজার টাকায় তিন বছরের জন্য লিজ দেওয়া হয়। পরে স্থানীয় জেলেদের প্রতিবাদের মুখে লিজটি বাতিল করে বিএমডিএ। এসংক্রান্ত চিঠি ইজারাদারের কাছেও পাঠানো হয়েছে।

তবে এসবিডি অ্যাগ্রো লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক জিয়াউল ইসলাম জানান, তাঁরা ইজারা বাতিলসংক্রান্ত কোনো চিঠি পাননি।

স্থানীয় বাসিন্দা ও জেলেদের অভিযোগ, এই খালে বর্তমান ইজারাদার কোনো মাছ চাষ করেননি। তবে খালপাড়ে আটজন পাহারাদার নিয়োগ দিয়েছেন। এর মধ্যে দুজন নিয়মিত টহল দিচ্ছেন। খালে প্রাকৃতিকভাবে বিপুল পরিমাণ মাছ রয়েছে। বন্যার সময় আশপাশের মাছের খামার থেকে ভেসে প্রচুর মাছ এসেছে এই খালে। সব মিলিয়ে এসব মাছের দাম প্রায় কোটি টাকা। স্থানীয় জেলেরা প্রতিবছর এ সময় মাছ ধরে শিকার করে সংসার চালালেও এবার খালে নামতে পারেনি।

কালের কণ্ঠ’র অনুসন্ধানে জানা যায়, খালটি ইজারা পেয়েছিলেন ঢাকার মিরপুরের এসবিডি অ্যাগ্রো লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক জিয়াউল ইসলাম। তিনি খালের পারের আলোকছত্র গ্রামের বাসিন্দা। আধুনিক পদ্ধতিতে মাছ চাষের উদ্দেশ্যে খাল ইজারা নেন তিনি। তাঁকে লিখিতভাবে সুপারিশ করে ইজারা পাইয়ে দেন তাঁরই বন্ধু ও গোদাগাড়ী উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা জাহিদ নেওয়াজ। এ ছাড়া খালটি ইজারা প্রদানের সুপারিশ করেন রিশিকুল ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান শহিদুল ইসলাম টুলুও।

স্থানীয়দের ভাষ্য, খালটি দুধাই নদ নামেই পরিচিত। চাঁপাইনবাবগঞ্জের আমনুরা থেকে শুরু এ খাল গিয়ে পড়েছে রাজশাহী পবার বাগধানির শিব নদে। মাঝে রয়েছে দুধাই ও বিলভর্তি বিল। সারা বছর খালের সাত কিলোমিটারজুড়ে পানি থাকে। খালের দুপারে বিল্লি, প্রসাদপাড়া, দিয়াড় প্রসাদপাড়া, আলোকছত্র, খড়িয়াকান্দি, বিলদুবইল, কসিয়া, বারোপুঠিয়া ও বেলপুকুরিয়া গ্রাম। যুগ যুগ ধরে এ খালে মাছ ধরে জীবিকা নির্বাহ করে আসছে গ্রামের অন্তত আড়াই শ পরিবার। আর সব মিলিয়ে উপকারভোগী প্রায় ১০ হাজারের ওপরে।

খড়িয়াকান্দি এলাকার বাসিন্দা জামাল হোসেন অভিযোগ করে বলেন, ‘খালটি এত দিন উন্মুক্ত ছিল। খালের পানি গৃহস্থালিসহ নানা কাজে ব্যবহার করে আসছিল স্থানীয়রা। কিন্তু হঠাৎ করে দেড় মাস আগে খালের বিভিন্ন পয়েন্টে ইজারাদার সাইনবোর্ড বসিয়ে দেন। সেই সাইনবোর্ড দেখে দরিদ্র কৃষক ও জেলেরা দিশাহারা হয়ে পড়েন। এরপর খাল ইজারার তীব্র বিরোধিতা করে আসছে স্থানীয়রা। ক্ষোভে তারা বেশ কয়েকটি পয়েন্টের সাইনবোর্ড সরিয়ে ফেলেছে। কিন্তু শুরু থেকেই হুমকি দিয়ে আসছেন ইজারাদার ও তাঁর লোকজন। ফলে ভয়ে কেউ খালের পানিতে নামতে পারছে না।’

এ বিষয়ে গোদাগাড়ী জোন-২ এর সহকারী প্রকৌশলী মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, ‘খাল ইজারায় উপকারভোগী কৃষক ও মৎসজীবীরা তীব্র প্রতিক্রিয়া দেখায়। তারা ইজারা বাতিলের জন্য ৩১ ডিসেম্বর লিখিত আবেদন দেয়। এর পরিপ্রেক্ষিতে ওই দিনই ইজারা বাতিল করা হয়েছে। ই-মেইলে ইজারাদারকে তখনই জানিয়ে দেওয়া হয়েছে বিষয়টি। এ ছাড়া পরদিন রেজিস্ট্রি ডাকযোগে চিঠিও পাঠানো হয়েছে।’ ইজারা বাতিলের পরও খাল দখল থাকার বিষয়ে জানতে চাইলে মোস্তাফিজুর রহমান আরো বলেন, ‘এমনটি হওয়ার সুযোগ নেই। বিষয়টি খতিয়ে দেখে যথাযথ ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’

তবে ইজারা বাতিলসংক্রান্ত কোনো চিঠি পাননি বলে দাবি করেছেন এসবিডি অ্যাগ্রো লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক জিয়াউল ইসলাম। তিনি বলেন, ‘খাল লিজ নিতে কোনো অনিয়মের আশ্রয় নেওয়া হয়নি।’ যদিও বন্ধু ইউএনওকে দিয়ে লিখিত সুপারিশের কথা স্বীকার করেন তিনি।

বিএমডিএর বৃষ্টির পানি সংরক্ষণ এবং সেচ প্রকল্পের (দ্বিতীয় পর্যায়) পরিচালক শিবির আহমেদ বলেন, ‘আমরা চেয়েছিলাম সেচে ও গৃহস্থালিতে ব্যবহার ছাড়াও খালে মাছ চাষ করতে। প্রস্তাবনা পেয়ে পরীক্ষামূলকভাবে ইজারা দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু পরে ওই চুক্তি বাতিল হয়েছে। ফলে খালে এলাকাবাসীর নামতে আর বাধা নেই।’

এদিকে খাল ইজারা প্রদানে বন্ধুকে লিখিতভাবে সুপারিশের কথা অস্বীকার করেন গোদাগাড়ী উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা জাহিদ নেওয়াজ। তিনি বলেন, ‘এই ধরনের সুপারিশের বিষয়টি আমার জানা নেই।’



মন্তব্য