kalerkantho


পাড়াকেন্দ্রে পাহাড় আলো

ফজলে এলাহী, রাঙামাটি   

২১ জানুয়ারি, ২০১৮ ০০:০০



পাড়াকেন্দ্রে পাহাড় আলো

রাঙামাটি সদর উপজেলার মৌষমারা পাড়াকেন্দ্রে চলছে লেখাপড়া। ছবি : কালের কণ্ঠ

পার্বত্য চট্টগ্রামের দুর্গম এলাকায় সেবাকেন্দ্র (সার্ভিস সেন্টার) হিসেবে বহুল পরিচিত ‘পাড়াকেন্দ্র’। এই পাড়াকেন্দ্রের মাধ্যমে পার্বত্য চট্টগ্রাম অঞ্চলের বিভিন্ন সম্প্রদায়ের শিশু, কিশোরী ও নারীদের সেবা দেওয়া হয়। পার্বত্য চট্টগ্রাম উন্নয়ন বোর্ডের নিয়ন্ত্রণাধীন সমন্বিত সমাজ উন্নয়ন প্রকল্পের (আইসিডিপি) মাধ্যমে এটি পরিচালিত। আজ রবিবার সকাল ১০টায় ঢাকার প্যান প্যাসিফিক সোনারগাঁও হোটেলের গ্র্যান্ড বলরুম থেকে ভিডিও কনফারেন্সের মাধ্যমে প্রকল্পটির ৪০০০তম পাড়াকেন্দ্র আনুষ্ঠানিকভাবে উদ্বোধন করবেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। নবনির্মিত পাড়াকেন্দ্রটি রাঙামাটির কাপ্তাই উপজেলার মিতিঙ্গ্যাছড়িতে। পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক মন্ত্রণালয়, পার্বত্য চট্টগ্রাম উন্নয়ন বোর্ড ও ইউনিসেফ অনুষ্ঠানটির আয়োজক।

১৯৮৩-৮৪ সালে অ্যাকশন রিচার্জ হিসেবে শুরু হওয়া ‘সমন্বিত সমাজ উন্নয়ন প্রকল্প’টি ১৯৮৫-১৯৯৫ মেয়াদে প্রথম পর্যায়, ১৯৯৬-২০১১ মেয়াদে দ্বিতীয় পর্যায় এবং ২০১২-২০১৮ মেয়াদে তৃতীয় পর্যায় বাস্তবায়ন করা হচ্ছে। এ বছরেরই মার্চে তৃতীয় পর্যায়ের মেয়াদ শেষে প্রকল্পটি এসডিজির সঙ্গে সমন্বয় রেখে টেকসই সামাজিক সেবা নামে নতুন আঙ্গিকে কার্যক্রম শুরুর প্রক্রিয়া চলছে। পার্বত্য জনপদের সবচেয়ে বড়, দীর্ঘমেয়াদি ও সফল প্রকল্প হিসেবে এটি দেশে-বিদেশে ব্যাপক প্রশংসিত।

পাড়াকেন্দ্রের বিশেষ বৈশিষ্ট্য : সাধারণত একই ধর্ম ও সম্প্রদায়ের এবং একই ভাষাভাষী ৪০-৫০টি পরিবারকে সেবা দেওয়ার জন্য পরিচালিত একটি কেন্দ্র বা স্থান। তবে ক্ষেত্রবিশেষে একাধিক সম্প্রদায় বা কমসংখ্যক পরিবারের জন্যও একটি পাড়াকেন্দ্র থাকতে পারে। পাড়াকেন্দ্রের মাধ্যমে তিন থেকে ছয় বছর বয়সী শিশুদের জন্য প্রাক-শৈশব যত্ন ও প্রাক-প্রাথমিক শিক্ষাদান, গর্ভবতী, প্রসূতি ও নবজাতকের স্বাস্থ্যসেবা ও পরামর্শ দেওয়া, প্রত্যক্ষ পুষ্টি কার্যক্রম পরিচালনা, স্বল্পব্যয়ী ও যথোপযুক্ত জীবন নির্বাহী কৌশল ও পদ্ধতির প্রদর্শন ও প্রশিক্ষণ দেওয়া, শিশু সুরক্ষা, শিশু অধিকার ও নারীর অধিকারবিষয়ক ধারণা দেওয়া ও কমিউনিটি সদস্যদের এসব বিষয়ে আচরণগত পরিবর্তন সাধন, কমিউনিটির হালনাগাদ তথ্য সংরক্ষণ, কমিউনিটি সভা করা, প্রশিক্ষণ ও অন্যান্য সামাজিক কাজে ব্যবহার করা হয় এই পাড়াকেন্দ্র। স্থানীয় একজন প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত নারী কর্মী কেন্দ্রটি পরিচালনা করেন। আইসিডিপি সংশ্লিষ্টরা জানান, পার্বত্য চট্টগ্রামের বেশির ভাগ মানুষ দুর্গম এলাকায় বসবাস করে। সেখানে মৌলিক সেবাগুলো জনগণের দোরগোড়ায় পৌঁছানো দুরূহ ও কষ্টসাধ্য এবং এ এলাকার বেশির ভাগ মানুষ দরিদ্র। তাই এখানে মাথাপিছু আয় ও ক্যালরি গ্রহণের হার জাতীয় হারের চেয়ে নিচে। স্বাস্থ্যসেবার প্রাপ্যতা, বিদ্যালয়ে ভর্তির হার, নারীশিক্ষা ও স্বাস্থ্যসম্মত পয়ঃসুবিধা বিবেচনায় তিন পার্বত্য জেলার অবস্থান নিচের সারিতে। এর পরিপ্রেক্ষিতে পার্বত্য চট্টগ্রামের আর্থ-সামাজিক সূচকগুলোর উন্নয়ন, বিশেষ করে মা ও শিশুর সার্বিক উন্নয়নের লক্ষ্যে বিশেষ ধরনের এ প্রকল্পটি বাংলাদেশ সরকার ও ইউনিসেফ যৌথভাবে বাস্তবায়ন করছে।

প্রকল্প ব্যবস্থাপক মো. জান-ই আলম জানান, পার্বত্য চট্টগ্রামের চার হাজার ৭৩৪টি পাড়ার মধ্যে তিন হাজার ৫১৯টিতে এক লাখ ৬৫ হাজার ৩৪৩ পরিবারের আট লাখ ৫৯ হাজার ৭৮৪ জনকে প্রকল্পের আওতায় বিভিন্ন সেবা দেওয়া হচ্ছে। প্রকল্পের কার্যক্রমের ফলে পার্বত্যবাসীর জীবনমানের উল্লেখযোগ্য উন্নয়ন হয়েছে। এ অঞ্চলে প্রাক-প্রাথমিকে ভর্তি হার জাতীয় হারের তুলনায় ১৩.৩৩ শতাংশ বেশি। পার্বত্যাঞ্চলে ১৪০টি কমিউনিটি ক্লিনিকের মাধ্যমে গ্রামীণ জনগোষ্ঠীর এক-তৃতীয়াংশের আয়রন সাপ্লিমেন্টেশন করা হচ্ছে। বাকি দুই-তৃতীয়াংশ পাড়াকেন্দ্রের মাধ্যমে বাস্তবায়ন করা হচ্ছে। চার হাজার ৪০০ জনের একটি প্রশিক্ষিত কর্মী বাহিনী তৈরি করা হয়েছে, যারা সামাজিক পরিবর্তনের ভূমিকা পালনে সমর্থ। এদের ৯৫ শতাংশ নারী। সমন্বিত সমাজ উন্নয়ন প্রকল্প পার্বত্যবাসীদের জীবনমান উন্নয়নে বড় অবদান রাখছে। জন্ম নিবন্ধন, স্বাস্থ্য ও পুষ্টি পরিস্থিতির উন্নয়ন, পানি ও পয়ঃব্যবস্থার উন্নয়ন ও শিক্ষা ক্ষেত্রে পার্বত্যাঞ্চলে দৃশ্যমান অগ্রগতি সাধিত হয়েছে। পাড়াকর্মীর জ্ঞান ও দক্ষতা, প্রকল্প বাস্তবায়নে কমিউনিটির অংশগ্রহণ এবং সেবায় বিভিন্ন সংস্থার সম্পৃক্ততা পাড়াকেন্দ্রকে তৃণমূল পর্যায়ে সেবা বিতরণের কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত করেছে। সহযোগী সংস্থাগুলোর অংশগ্রহণে পাড়াকেন্দ্রের মাধ্যমে স্বাস্থ্য, শিশুশিক্ষা, পুষ্টি, পানি ও পয়ঃব্যবস্থা ও হাইজিন অভ্যাস গড়ে ওঠার ক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য সাফল্য অর্জিত হয়েছে।

প্রকল্প পরিচালক মো. ইয়াছিন বলেন, ‘তিন পার্বত্য জেলার ২৬টি উপজেলায় চার হাজার পাড়াকেন্দ্র স্থাপন করা হয়েছে। সর্বশেষ ৪০০০তম পাড়াকেন্দ্রটি রবিবার প্রধানমন্ত্রী উদ্বোধন করবেন। এ উপলক্ষে তিন পার্বত্য জেলায় উৎসবের আমেজ দেখা দিয়েছে। পার্বত্যবাসী প্রত্যাশা করছে, প্রধানমন্ত্রীর উদ্বোধনের মাধ্যমে এই এলাকার মানুষের সেবাপ্রাপ্তির এই প্রকল্প দীর্ঘায়িত হবে।’ প্রকল্পটির বাস্তবায়নকারী সংস্থা পার্বত্য চট্টগ্রাম উন্নয়ন বোর্ডের চেয়ারম্যান ও পার্বত্য সচিব নববিক্রম কিশোর ত্রিপুরা বলেন, ‘পার্বত্য জনপদের শান্তি, স্থিতি ও উন্নয়নের পথে এই প্রকল্প একটি মাইলফলক হিসেবে বিশাল অবদান রাখছে। এর মাধ্যমে দূর, প্রত্যন্ত এলাকাতেও সরকারের সেবা ও কর্মসূচি পৌঁছে দেওয়া সম্ভব হয়েছে। ৪০০০তম পাড়াকেন্দ্র স্থাপনের মাধ্যমে আইসিডিপি প্রমাণ করেছে তারা কাঙ্ক্ষিত ও প্রত্যাশিত পথেই আছে।’

ঢাকায় ৪০০০তম পাড়াকেন্দ্র উদ্বোধন অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রীর আন্তর্জাতিক বিষয়ক উপদেষ্টা ড. গওহর রিজভী, পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের সংসদীয় স্থায়ী কমিটির সভাপতি র আ ম উবায়দুল মোকতাদির চৌধুরী, ইউনিসেফ বাংলাদেশের কান্ট্রি রিপ্রেজেন্টেটিভ এডওয়ার্ড বেগবেডার, পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী বীর বাহাদুর উ শৈ সিং, নববিক্রম কিশোর ত্রিপুরাসহ সরকারের বিভিন্ন পর্যায়ের কর্মকর্তা ও প্রকল্পের মাঠপর্যায়ের কর্মীদের উপস্থিত থাকার কথা রয়েছে। একই সময়ে রাঙামাটির মিতিঙ্গ্যাছড়ি পাড়াকেন্দ্রে উপস্থিত থাকবেন সংসদ সদস্য জে এফ আনোয়ার চিনু ও উষাতন তালুকদার এবং সাবেক সংসদ সদস্য দীপংকর তালুকদার।



মন্তব্য