kalerkantho


৭০ অনুচ্ছেদ নিয়ে বিভক্ত আদেশ হাইকোর্টের

জ্যেষ্ঠ বিচারপতির রুল জারি রিট খারিজ কনিষ্ঠ বিচারপতির

নিজস্ব প্রতিবেদক   

১৬ জানুয়ারি, ২০১৮ ০০:০০



সংবিধানের ৭০ অনুচ্ছেদের বৈধতা নিয়ে দ্বিধাবিভক্ত আদেশ দিয়েছেন হাইকোর্ট। জাতীয় সংসদে নিজ দলের বিপক্ষে ভোটদানের কারণে আসন শূন্য হওয়াসংক্রান্ত ওই অনুচ্ছেদের বৈধতা চ্যালেঞ্জ করে দাখিল করা রিট আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে এমন আদেশ এসেছে। ৭০ অনুচ্ছেদ কেন বাতিল ও সংবিধানবিরোধী ঘোষণা করা হবে না তা জানতে চেয়ে রুল জারি করেছেন সংশ্লিষ্ট হাইকোর্ট বেঞ্চের জ্যেষ্ঠ বিচারপতি। আর কনিষ্ঠ বিচারপতি রিট আবেদনটি সরাসরি খারিজ করে দিয়েছেন।

বিচারপতি মইনুল ইসলাম চৌধুরী ও বিচারপতি মো. আশরাফুল কামালের সমন্বয়ে গঠিত হাইকোর্ট বেঞ্চ গতকাল সোমবার ওই আদেশ দেন।

দ্বিধাবিভক্ত আদেশের কারণে এ বিষয়ে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিতে নথি পাঠানো হবে প্রধান বিচারপতির কাছে। নিয়ম অনুযায়ী প্রধান বিচারপতি বিষয়টি নিষ্পত্তির জন্য অন্য কোনো বেঞ্চে পাঠাবেন।

গতকাল আদালতে রিট আবেদনের পক্ষে শুনানি করেন রিট আবেদনকারী আইনজীবী ড. ইউনুছ আলী আকন্দ। রাষ্ট্রপক্ষে ছিলেন ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল মোতাহার হোসেন সাজু।

জ্যেষ্ঠ বিচারপতি মইনুল ইসলাম চৌধুরী আদেশে বলেন, সংবিধানের ৭ নম্বর অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে যে জনগণই সব ক্ষমতার মালিক। কিন্তু সংবিধানে ৭০ নম্বর অনুচ্ছেদ থাকায় জনগণের প্রতিনিধি হিসেবে সংসদ সদস্যরা সঠিকভাবে দায়িত্ব পালন করতে পারেন না। দলীয় সিদ্ধান্তের বাইরে স্বাধীনভাবে মতামত দেওয়ার সুযোগ নেই। দলীয় প্রধানের সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে ভোট দেওয়ার সুযোগ নেই। ৭০ নম্বর অনুচ্ছেদ থাকার কারণে সংসদ সদস্যরা স্বাধীন নন। তাঁরা নিজ দলের কাছে পরাধীন। দল যা বলবে তাই করতে হবে। ৭০ অনুচ্ছেদের কারণে সব ক্ষমতার অধিকারী রাজনৈতিক দল, জনগণ নয়। ষোড়শ সংশোধনী মামলার রায়ের কথা উল্লেখ করে আদেশে বলা হয়, ‘ওই মামলায় শুনানিকালে অ্যাটর্নি জেনারেল মাহবুবে আলম ও অতিরিক্ত অ্যাটর্নি জেনারেল মুরাদ রেজা ইউকেসহ বিভিন্ন দেশের উদাহরণ দিয়ে বলেছেন যে ওই সব দেশে আইন প্রণেতারা স্বাধীনভাবে মতামত দিয়ে থাকেন। এ ক্ষেত্রে আমার অভিমত হলো, ওই সব দেশে ৭০ অনুচ্ছেদের মতো কোনো অনুচ্ছেদ নেই। ওই সব দেশের আইন প্রণেতাদের সঙ্গে আমাদের সংসদ সদস্যদের মৌলিক পার্থক্য নেই। আমাদের দেশে দলীয় হাইকমান্ডের বিরুদ্ধে যাওয়ার সুযোগ নেই।’

জ্যেষ্ঠ বিচারপতি আরো বলেন, ‘সংবিধানের ষোড়শ সংশোধনী মামলায় এই আদালত (হাইকোর্ট) ৭০ অনুচ্ছেদ নিয়ে যে অভিমত দিয়েছিলেন আপিল বিভাগ তা গ্রহণ করেছেন। মনে রাখতে হবে, আপিল বিভাগের দেওয়া রায় আমাদের (হাইকোর্ট) জন্য মানা বাধ্যতামূলক। এ রিট আবেদনে রুল জারির মতো প্রাথমিক উপাদান রয়েছে। এ কারণে রুল জারি করা হলো।’

কনিষ্ঠ বিচারপতি মো. আশরাফুল কামাল রিট আবেদনটি খারিজ করে আদেশে বলেন, ‘ষোড়শ সংশোধনী মামলায় ৭০ অনুচ্ছেদ নিয়ে হাইকোর্ট যে অভিমত দিয়েছেন তা আপিল বিভাগ গ্রহণ করেছেন ঠিক। তবে ষোড়শ সংশোধনী মামলা ছিল বিচার বিভাগসংক্রান্ত। সেখানে বিচারক অপসারণে সুপ্রিম জুডিশিয়াল কাউন্সিল প্রসঙ্গ ছিল। সেখানে ৭০ অনুচ্ছেদ বিচার্য ছিল না।’ তিনি আরো বলেন, ‘১৯৭২ সালে বাংলাদেশের সংবিধান প্রণীত হয়। সে সময় যেভাবে ৭০ অনুচ্ছেদ সংবিধানে সন্নিবেশিত হয়েছে, আজ পর্যন্ত সেভাবেই রয়েছে। এ অনুচ্ছেদের যৌক্তিকতা নিয়ে অতীতে কোনো সরকার বা সংসদে প্রশ্ন ওঠেনি। জনগণও প্রশ্ন তোলেনি। ৭০ অনুচ্ছেদের অপব্যবহার হয়েছে, এমন নজিরও আমাদের সামনে নেই।’

কনিষ্ঠ বিচারপতির আদেশে বলা হয়, বিশ্বব্যাপী স্বীকৃত যে আদালত সংবিধান বা আইন প্রণয়ন করেন না। শুধুই বলতে পারেন সংসদে প্রণীত আইন সংবিধান পরিপন্থী কি না। এ কারণেই তো সুপ্রিম কোর্ট পঞ্চম ও ত্রয়োদশ সংশোধনী বাতিল বলে রায় দিয়েছেন।

আদেশে বলা হয়, রিট আবেদনকারী তাঁর আবেদনে বলেননি যে ৭০ অনুচ্ছেদ সংবিধানের আর কোন কোন অনুচ্ছেদের সঙ্গে সাংঘর্ষিক। এও বলেননি যে আইন প্রণেতা কর্তৃক প্রণীত আইন বাতিল করার ক্ষমতা আদালতের রয়েছে। কিন্তু মনে রাখতে হবে, জনগণ সব ক্ষমতার অধিকারী। আর সংসদ সদস্যরা জনগণের প্রতিনিধি। তাই জনগণের ভোটে নির্বাচিত প্রতিনিধিদের আইন প্রণয়নে আদালত বাধ্য করতে পারেন না। আদালত কখনো জাতীয় সংসদকে নির্দেশ দেওয়ার ক্ষমতা রাখেন না। কার্যত সংসদ কর্তৃক প্রণীত আইন যথাযথভাবে বাস্তবায়িত হচ্ছে কি না তা দেখার জন্যই আদালতের সৃষ্টি। আদালতের দায়িত্ব সেটাই। বিচার বিভাগকে তার নিজস্ব সীমা সম্পর্কে সজাগ থাকতে হবে। সীমা অতিক্রম করতে পারে না। আইন প্রণেতারা কী উদ্দেশ্যে আইন করছেন তা নিয়ে আদালত প্রশ্ন তুলতে পারেন না।

আদেশে আরো বলা হয়, ‘৭০(খ) অনুচ্ছেদে এটা স্পষ্ট যে দলের বিপক্ষে ভোটদান করলেই কেবল আসন শূন্য হবে। ভোটটা দলের বিপক্ষে গেলে সরকারের পতন হবে, কেবল সে ক্ষেত্রেই দলের বিপক্ষে ভোট দেওয়া হয়েছে বলে বিবেচিত হবে বলে মনে করি। এই অনুচ্ছেদে যে ভোটে ক্ষমতাসীন সরকারকে পদত্যাগে বাধ্য করে সেই ভোটকেই বোঝানো হয়েছে। এ ছাড়া আইন করার বিষয়ে স্বাধীনভাবে মতামত দিতে বাধা নেই। এই অনুচ্ছেদ সে ক্ষেত্রে কোনো বাধা নয়। এ কারণে রিট আবেদনটি সরাসরি খারিজ করা হলো।’

সংবিধানের ৭০ অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে, ‘কোন নির্বাচনে কোন রাজনৈতিক দলের প্রার্থীরূপে মনোনীত হইয়া কোন ব্যক্তি সংসদ-সদস্য নির্বাচিত হইলে তিনি যদি-(ক) উক্ত দল হইতে পদত্যাগ করেন, অথবা (খ) সংসদে উক্ত দলের বিপক্ষে ভোটদান করেন, তাহা হইলে সংসদে তাঁহার আসন শূন্য হইবে, তবে তিনি সেই কারণে পরবর্তী কোন নির্বাচনে সংসদ-সদস্য হইবার অযোগ্য হইবেন না।’

৭০ অনুচ্ছেদ বাতিল চেয়ে করা রিট আবেদনে বলা হয়, ৭০ অনুচ্ছেদ সংবিধানের মৌলিক কাঠামো এবং ৭(১), ১১, ১৯(১, ৩) ২৬(১, ২), ২৭, ১১৯(১), ১৪২ ও ১৪৯ অনুচ্ছেদ পরিপন্থী। সংবিধানের ৭০ অনুচ্ছেদের কারণে অনিচ্ছা সত্ত্বেও দলের পক্ষে ভোট দিতে বাধ্য হন দলীয় প্রতীকে নির্বাচিত সংসদ সদস্যরা।


মন্তব্য