kalerkantho


মাদক নিয়ে উদ্বিগ্ন ভোটার ও সম্ভাব্য প্রার্থী উভয়ই

আরিফুজ্জামান তুহিন ও তোফাজ্জল হোসেন রুবেল   

১৫ জানুয়ারি, ২০১৮ ০০:০০



মাদক নিয়ে উদ্বিগ্ন ভোটার ও সম্ভাব্য প্রার্থী উভয়ই

ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনে (ডিএসসিসি) নতুন যুক্ত হওয়া ৫৮ ও ৫৯ নম্বর ওয়ার্ডের শ্যামপুর ও কদমতলী এলাকার অনেকেই জানে না যে এই দুই ওয়ার্ডে আগামী ২৬ ফেব্রুয়ারি নির্বাচন হবে। তবে কাউন্সিলর হওয়ার আগ্রহ প্রকাশ করে ব্যানার-পোস্টারের মাধ্যমে নির্বাচনের জানান দিচ্ছেন সম্ভাব্য প্রার্থীরা।

রাজধানীর এক প্রান্তে থাকা এ দুই ওয়ার্ডের সব শ্রেণি-পেশার মানুষের মাথায় আগামী নির্বাচন না থাকলেও মাদক নিয়ে দুশ্চিন্তা ও উদ্বেগ আছে। কেননা সেখানে প্রকাশ্যেই বিক্রি হচ্ছে গাঁজা, ইয়াবা, হেরোইন, চোলাই মদ ও ফেনসিডিলির মতো সব মাদক। স্থানীয়দের অভিযোগ, মাদক বিক্রেতাদের সঙ্গে প্রভাবশালীদের যোগসাজশ থাকায় প্রশাসনও এর বিরুদ্ধে তেমন কোনো উদ্যোগ নেয় না।

নাগরিক সুবিধাবঞ্চিত ডিএসসিসির এ দুই ওয়ার্ডের রাস্তাঘাট, ড্রেনেজ-স্যুয়ারেজ ও সড়ক বাতি নেই বললেই চলে। তবু সিটি করপোরেশনে অন্তর্ভুক্ত হওয়ায় নতুন করে আশার সঞ্চার হয়েছে নাগরিকদের মনে।

সম্প্রতি ডিএসসিসির ৫৮ নম্বর ওয়ার্ড ঘুরে দেখা গেছে, নির্বাচনী আচরণবিধির বাধ্যবাধকতার কারণে সাধারণ কাউন্সিলর ও সংরক্ষিত মহিলা আসনের সম্ভাব্য প্রার্থীরা এখনো মাঠে না নামলেও দেয়ালে শুভেচ্ছা বার্তা দিয়ে তাঁদের পোস্টার শোভা পাচ্ছে।

এ ওয়ার্ডে আওয়ামী লীগের চার প্রার্থী নির্বাচনের প্রস্তুতি নিচ্ছেন বলে জানা গেছে। তাঁরা হলেন শ্যামপুর ইউনিয়নের বর্তমান চেয়ারম্যান শফিকুর রহমান সাইজুল, আওয়ামী লীগ নেতা তাজুল ইসলাম তাজু, শ্রমিক লীগ নেতা মিজানুর রহমান ও শ্যামপুর থানা ছাত্রলীগের সাবেক সভাপতি আজিজ আহমেদ ও মো. আলমগীর।

অন্যদিকে এ ওয়ার্ডে বিএনপির কাউন্সিলর প্রার্থী হিসেবে নাম শোনা যাচ্ছে মহানগর দক্ষিণ বিএনপির যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক এস এম শাহীন লাল, মো. সেলিম রেজা ও শফিকুল ইসলামের।

আর জাতীয় পার্টি থেকে কাউন্সিলর প্রার্থী হিসেবে জানান দিচ্ছেন শেখ মাসুক রহমান। সংরক্ষিত মহিলা কাউন্সিলর হিসেবে সম্ভাব্য প্রার্থী আছেন সুলতানা আহমেদ লিপি আক্তার, বিউটি আক্তার ও সায়েলা রহমান।

তাজুল ইসলাম তাজু বলেন, ‘আমার বাবা ও চাচা মিলে প্রায় ১৮ বছর চেয়ারম্যান ছিলেন। আমি তাঁদের দেখানো পথে চলব। নির্বাচিত হতে পারলে মাদক আর রাস্তাঘাটের সমস্যা সমাধানে কাজ করব।’

তাজুল ইসলাম তাজু আরো বলেন, ‘এই ওয়ার্ডে সবচেয়ে বড় সমস্যা হলো মাদক। হাত বাড়ালেই মাদক পাওয়া যায়। এটি নির্মূল করাই হবে নির্বাচিত কাউন্সিলরের বড় চ্যালেঞ্জ।’

আরেক সম্ভাব্য প্রার্থী সেলিম রেজা বলেন, ‘আমি বর্তমানে ৪ নম্বর ওয়ার্ডের মেম্বার হিসেবে দায়িত্বে আছি। আমার কাছে ওয়ার্ডের সব সমস্যা পরিষ্কার। নির্বাচিত হতে পারলে সাধ্যমতো চেষ্টা করে তা সমাধান করব।’

৫৮ নম্বর ওয়ার্ডে কাউন্সিলর পদে আওয়ামী লীগের মনোনয়নপ্রত্যাশী আজিজ আহমেদ বলেন, ‘এ এলাকায় বেশ কিছু সমস্যা আছে। তবে প্রধান সমস্যা মাদক। যদি আমি দল থেকে মনোনয়ন পাই, তাহলে মাদকের স্পটগুলো উচ্ছেদে কাজ করব।’

খোঁজ নিয়ে জানা যায়, ৫৮ নম্বর ওয়ার্ডে প্রকাশ্যে মাদক বিক্রি হয় কয়েকটি স্থানে। এসব মাদক বেচাকেনার নেটওয়ার্কে প্রভাবশালীরা যুক্ত থাকায় পুলিশও তেমন একটা গা করে না। এর মধ্যে একাধিক খুনের আসামি পাতলা রিপন হাই স্কুল রোড এলাকার মাদকের স্পট নিয়ন্ত্রণ করে। ক্ষমতাসীনদের সঙ্গে ওঠাবসা থাকা সালেহ নিয়ন্ত্রণ করে গ্যাস পাইপলাইন এলাকার স্পট। ডাকাত কুদ্দস নিয়ন্ত্রণ করে নামা শ্যামপুরের স্পট। এ স্পটটি ডাকাত কুদ্দসের হয়ে তার লোকজন পরিচালনা করে।

এলাকাবাসী আরো জানায়, ৫৯ নম্বর ওয়ার্ডের ঢাকা ম্যাচ ফ্যাক্টরি কলোনি সংলগ্ন রেললাইনের দুই পাশে বিশাল বস্তি গড়ে উঠেছে শাহজাহানের নামেই। এ জন্য ঘরপ্রতি বিদ্যুৎ বাবদ প্রতি মাসে ৪০০ টাকা চাঁদা নেওয়া হয়। কোনো ঘরে ফ্রিজ থাকলে দিতে হয়ে আরো ৫০০ টাকা। ওই এলাকায় ওয়াসার পানি সরবরাহ না থাকলেও তিনি অবৈধভাবে কয়েকটি নলকূপ বসিয়েছেন। ঘরপ্রতি মাসে ৩০০ টাকা নিয়ে পানি সরবরাহ করা হয়। ওই এলাকায় বাসা ভাড়া প্রতি মাসে এক হাজার থেকে দুই হাজার টাকা।

অন্যদিকে বিএনপিতে অভ্যন্তরীণ কোন্দল অপেক্ষকৃত কম। এ দুই ওয়ার্ডে বিএনপি নেতা সালাহউদ্দিন আহমেদের বেশ প্রভাব রয়েছে। আর সেখানে তাঁর আস্থাভাজন হিসেবে সফিকুল ইসলাম নির্বাচনে লড়বেন বলে জানা গেছে। সে কারণে বিএনপির কাউন্সিলর হওয়ার সম্ভাব্য প্রার্থীও কম।

উল্লেখ্য, ৫৮ নম্বর ওয়ার্ডে ভোটার প্রায় ৩৬ হাজার।

৫৯ নম্বর ওয়ার্ড : স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, প্রায় ২৫ হাজার ভোটারের এ ওয়ার্ডের সম্ভাব্য প্রার্থী হিসেবে আওয়ামী লীগ নেতা শফিকুল ইসলাম খান, আমিনুল ইসলাম, শহীদ উল্লাহ মেম্বার এবং বিএনপি নেতা আসলাম মোল্লা ও তাওলাদ হোসেনের নাম শোনা যাচ্ছে।

সরেজমিন দেখা গেছে, এ ওয়ার্ডে রাস্তার অবস্থা একেবারেই নাজুক। ড্রেনেজ, স্যুয়ারেজ ও সড়ক বাতি নেই বলেলেই চলে। ডোবা-নালা শিল্প-কলকারখানার বর্জ্যে দূষিত। দুই শতাধিক শিল্পপ্রতিষ্ঠানের এ ওয়ার্ডে বাসাবাড়ির ময়লা-আবর্জনা পর্যন্ত সংগ্রহ করা হয় না। ফলে যে যার মতো ময়লা-আর্বজনা ফেলে রাস্তাঘাট নোংরা করছে। সম্ভাব্য প্রার্থীদের পক্ষে এসব সমস্যা দূর করা অনেকটাই কঠিন হবে বলে মনে করে স্থানীয় বাসিন্দারা।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, ৫৯ নম্বর ওয়ার্ডের ঢাকা ম্যাচ কলোনি বস্তির মাদক স্পটটি রাজধানীর অন্যতম মাদক স্পট। রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (রাজউক) ১৬ বিঘা ১১ শতাংশ জায়গার ওপর গড়ে উঠেছে এই বস্তি। এই বস্তিতে দীর্ঘ সময় ধরে চলছে মাদকের কারবার। গত সোমবার সরেজমিনে এই বস্তিতে গিয়ে বিভিন্ন ঘরে ইয়াবার আসর দেখা গেছে।



মন্তব্য