kalerkantho


বাগেরহাট মডেল থানা

রাতে বাড়ে ব্যস্ততা ও ভিড় সালিস বৈঠক থানা চত্বরে

বিষ্ণু প্রসাদ চক্রবর্ত্তী, বাগেরহাট   

১৪ জানুয়ারি, ২০১৮ ০০:০০



সন্ধ্যার পরই বাড়ছিল মানুষের আনাগোনা ও ব্যস্ততা। কেউ আসছে মামলা দিতে, কেউ আটক-সন্তান ছাড়িয়ে নিতে, কেউ বা ধান কাটতে সহযোগিতা চাইতে। পুলিশ কর্মকর্তারা ঘটনা শুনে ব্যবস্থা নিচ্ছেন। এমনকি দাম্পত্য কলহ মীমাংসায় থানা চত্বরেই বসানো হচ্ছে সালিস বৈঠক। তাতে সমঝোতা না হলে শুরু মামলার প্রক্রিয়া। গত শুক্রবার রাতভর বাগেরহাট মডেল থানায় অবস্থান করে এবং সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের সঙ্গে আলাপ করে মিলেছে এ চিত্র।

ঘড়ির কাঁটায় তখন সন্ধ্যা ৭টা ১০ মিনিট। গায়ে কালো রঙের চাদর জড়ানো মধ্যবয়সী এক নারী দ্রুত ঢুকলেন থানায়। উপস্থিত কনস্টেবলের কাছে থেকে কিছু তথ্য জানার চেষ্টা করলেন। এরপর চিন্তিত হয়ে দাঁড়িয়ে থাকলেন। কাছে গিয়ে আলাপকালে জানা গেল, লিলি বেগম নামের এই নারী এসেছেন আটক সন্তানকে ছাড়িয়ে নিতে। ছেলে শরিফুল ইসলাম রাসেলকে পুলিশ সন্ধ্যার আগে আটক করেছে। রাত ৯টার দিকে ডিউটি অফিসারের কক্ষে দুই কিশোরকে বসিয়ে রাখতে দেখা যায়। সন্দেহজনক ঘোরাঘুরির কারণে তাদেরকে একজন এএসআই আটক করেছেন। জিজ্ঞাসাবাদ শেষে পরে তাদের অভিভাবকদের কাছে বুঝিয়ে দেওয়া হয়। রাত ১০টা পর্যন্ত লিলি বেগমকে দেখা যায় থানার প্রধান ফটকের বাইরে সন্তানের জন্য অপেক্ষা করতে। তিনি বলেন, ‘ছেলে ছাড়া পাবে। সে নির্দোষ। শহরতলির হরিণখানা এলাকায় বাড়ির পাশে দাঁড়িয়ে বন্ধুর সঙ্গে কথা বলছিল। এ সময় মোটরসাইকেলযোগে দুই পুলিশ উপস্থিত হলে বন্ধু দৌড় দেয়। তখন পুলিশ সন্দেহবশত ছেলেকে ধরে নিয়ে আসে।’ কিভাবে ছেলেকে ছাড়ালেন? এমন প্রশ্নের জবাব দিলেন না তিনি।

রাত ৮টার পর থানায় মানুষের আনাগোনা বেড়ে গেল। কেউ আসছে জমির ধান কাটার অভিযোগ দিতে, কেউ পাওনা টাকা আদায়ে সহযোগিতা চাইতে, কেউ বা আটক স্বজনকে ছাড়িয়ে নিতে। আত্মীয়-স্বজনের পাশাপাশি এলাকার ইউপি চেয়ারম্যান, মেম্বারকে সঙ্গে এনেছে অনেকে। থানার ভেতরে ও বাইরে তারা পৃথকভাবে আলাপ করছে। থানার ভেতরে তখন ওসি মো. মাহাতাব উদ্দিন নিজ কক্ষে অবস্থান করছিলেন। থানার পশ্চিম পাশের গেটে নির্মাণকাজ চলায় পূর্ব পাশের গেট দিয়েই যাতায়াত করছিল সবাই। পুলিশ কর্মকর্তারা মোটরসাইকেল ও পিকআপ নিয়ে কিছুক্ষণ পরপরই আসা-যাওয়া করছিলেন। তীব্র শীতের মধ্যে থানার পূর্ব পাশে অপেক্ষা করছিলেন দুজন রাইটার। এজাহারসহ মামলাসংক্রান্ত কাজে লেখালেখিতে সহযোগিতা করেন তাঁরা।

এদিকে সন্ধ্যার পর থেকে থানা চত্বরে গোলঘরের সামনে চলছিল একটি সালিস বৈঠক। স্ত্রী শাহিনা বেগমকে নির্যাতনের অভিযোগে আটক মানিক ফকির (৩৫) তখন হাজতখানায় বন্দি। তাঁর বিরুদ্ধে মামলা না করে মীমাংসার জন্য স্ত্রীর স্বজনদের বোঝানো হচ্ছিল। দুই পক্ষের আত্মীয়, প্রতিবেশী, একজন ইউপি মেম্বারসহ ১৮ জন বৈঠকে উপস্থিত। মাঝখানে একটি চেয়ারে বসা এসআই লুত্ফর রহমান। এ দম্পতির সপ্তম শ্রেণিতে পড়া ছেলে আব্দুল্লাহ ও দ্বিতীয় শ্রেণিতে পড়া মেয়ে অনিকা আক্তারকেও বসে থাকতে দেখা যায়।

রাত ৮টা ২০ মিনিটে রিকশাযোগে থানায় ঢোকেন নির্যাতিত গৃহবধূ শাহিনা বেগম (৩০)। মা ফাতেমা বেগমের কাঁধে ভর দিয়ে ওসির কক্ষে ঢোকেন তিনি। হাসপাতাল থেকে এসেছেন তিনি। ওসি গৃহবধূর কাছে জানতে চান তিনি ঘটনার মীমাংসা, নাকি মামলার পক্ষে। শাহিনা নির্যাতনকারী স্বামীর বিচার দাবি করলে ওসি মামলা গ্রহণের নির্দেশ দেন। গোলঘরের বৈঠকে মীমাংসা সম্ভব হয় না।

এসআই লুত্ফর রহমান জানান, গৃহবধূ শাহিনা বেগমকে নির্যাতন ঘটনায় লিখিত অভিযোগ পেয়ে শুক্রবার বিকেলে মানিক ফকিরকে আটক করেন। এরপর দুই পক্ষের স্বজন এবং প্রতিবেশীদের কথায় মীমাংসার উদ্যোগ নেওয়া হয়। কিন্তু শাহিদা মীমাংসা করতে রাজি না হওয়ায় মামলা রেকর্ড হয়েছে। এখন এ মামলার তদন্তের দায়িত্ব তাঁকে দেওয়া হয়েছে। মামলায় আসামি করা হয়েছে শাহিনার স্বামী মানিক ফকির, শাশুড়ি ফাতেমা বেগম ও শ্বশুর ইসমাইল ফকিরকে।

শাহিনা বেগম প্রতিবেদকের পরিচয় জেনে বলেন, মীমাংসা করতে কে না চায়? আমার তো ছেলে-মেয়ে আছে। কিন্তু আজ মীমাংসা করলে, দুই দিন পর আবারও মারবে। মারতে মারতে মেরে ফেলবে। স্বামীর ওপর আমার আর ভরসা নেই।’

জমির ধান কেটে নিয়ে গেছে—এমন অভিযোগ নিয়ে রাত ৮টা ৪০ মিনিটে ওসির কক্ষে ঢোকেন স্কুলশিক্ষক ডেমা গ্রামের শেখ আব্দুল লতিব। অভিযোগ পেয়েই ওসি তদন্ত করে ব্যবস্থা গ্রহণের নির্দেশ দেন এসআই শফিকুল ইসলামকে। শনিবার ঘটনাস্থলে গিয়ে ব্যবস্থা নেবেন বলে জানান তিনি।

রাতে থানার ভেতরে বকুলতলায় দেখা গেল চার-পাঁচজন কথা বলছে। সেখানে ডেমা ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান মো. মনি মল্লিক আছেন। তিনি জানান, মির্জাপুর গ্রামের রুমিচা বেগম পাশের গ্রামের মোজাফফর নকিবের কাছে টাকা পাবেন। থানা থেকে মীমাংসার জন্য বলায় তিনি এসেছেন।

রাত ১০টা ৩০ মিনিটে ওসি থানা থেকে বের হয়ে যান; কিন্তু আধাঘণ্টা পরই ফিরে আসেন। এরপর দাপ্তরিক কিছু কাজ শেষে রাত সাড়ে ১২টায় বের হন। এরপর থানার কলাপসিবল গেট তালাবদ্ধ করে রাখা হয়।

রাত ১টা ২০ মিনিটে রাস্তায় একটি মহেন্দ্র গাড়ি রেখে চারজন ঢোকে থানা চত্বরে। রেজাউল শেখ নামের এক মধ্যবয়সী পরিচয় দিয়ে জানান, তাঁদের বাড়ি বাগেরহাট জেলার চিতলমারী উপজেলার রহমতপুর গ্রামে। পুলিশ তাঁর ছেলে লিমনকে ধরে এনেছে। খবর পেয়ে ছেলেকে ছাড়ানোর জন্য এসেছেন। এরপর থানা থেকে খবর পেয়ে টিএসআই ইউনুছ আলী পৌঁছান। তিনিই শহরের ফলপট্টি এলাকা থেকে লিমনসহ তিনজনকে আটক করেছিলেন। রাত ২টার দিকে মুচলেকা নিয়ে লিমনকে ছেড়ে দেওয়া হয়।

বাগেরহাট মডেল থানার ওসি মাহাতাব উদ্দিন জানান, শুক্রবার রাতে শুধু গৃহবধূ শাহিনার মামলাটি নথিভুক্ত করা হয়েছে। এর আগে সংসার টিকিয়ে রাখতে মীমাংসার চেষ্টা হয়। আর রাতে শহরে সন্দেহজনক ঘোরাঘুরির জন্য তিনজনকে আটক করা হয়েছিল। জিজ্ঞাসাবাদ করার পর তারা ছাত্র বলে নিশ্চিত হওয়ায় অভিভাবকদের ডেকে মুচলেকায় ছেড়ে দেওয়া হয়েছে। সন্দেহজনক আটকদের ছেড়ে দেওয়া হয়। থানায় মামলা বা জিডি করতে টাকা নেওয়া হয় না বলে ওসি দাবি করেন। তিনি বলেন, শহরের নিরাপত্তায় প্রতি রাতের জন্য ১০টি টিম হটল দিচ্ছে। দুটি টিম সার্বক্ষণিক প্রস্তুত থাকে। কোনো গাফিলতি অথবা অনিয়মের অভিযোগ পেলে তাত্ক্ষণিক ব্যবস্থা নেওয়া হয়।



মন্তব্য