kalerkantho


সাক্ষাৎকার : অপর্ণা সেন

ঢাকাও নিশ্চয়ই আমার শহর

মেহেদী হাসান   

১৪ জানুয়ারি, ২০১৮ ০০:০০



ঢাকাও নিশ্চয়ই আমার শহর

কলকাতায় জন্ম ও বেড়ে উঠলেও ঢাকাকেও নিজের শহর বলে মনে করেন ভারতীয় প্রখ্যাত অভিনেত্রী ও চলচ্চিত্র নির্মাতা অপর্ণা সেন। ষোড়শ ঢাকা আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসব উপলক্ষে বাংলাদেশ সফররত অপর্ণা সেন গতকাল শনিবার সন্ধ্যায় ঢাকা ক্লাবে ভারতীয় হাইকমিশন আয়োজিত নৈশভোজের ফাঁকে কালের কণ্ঠসহ বিভিন্ন গণমাধ্যমের সাংবাদিকদের দেওয়া সাক্ষাৎকারে এসব কথা বলেন। তিনি বলেন, তিনি নারীবাদী নন, মানবতাবাদী। প্রতিটি পুরুষ লেখক বা নির্মাতার মধ্যে যেমন একজন নারীর সত্তা থাকে, তেমনি তাঁর মধ্যেও একজন পুরুষ আছে।

জন্ম যশোরে কি না জানতে চাইলে অপর্ণা সেন সাংবাদিকদের বলেন, ‘উইকিপিডিয়ায় যশোর-টশোর অনেক কিছু বলে। কিন্তু আমার জন্ম ও বড় হয়ে ওঠা কলকাতায়। কলকাতা আমার শহর। ঢাকাও নিশ্চয়ই আমার শহর। আর ঢাকার সঙ্গে আমাদের এতটা সাদৃশ্য রয়েছে, আমাদের কবিরা রবীন্দ্রনাথ, নজরুল, জীবনানন্দ—এঁরা সবাই ঢাকারও কবি, বাংলাদেশেরও কবি, আমাদেরও কবি। সুতরাং যে ভাষা আমরা সবাই ভাগাভাগি করি, যে ভাষার জন্য বাংলাদেশ, সে ভাষাটাই অভিন্ন। সুতরাং এটি আমার খুব প্রিয় জায়গা।’

এ দেশে অনেক ভক্ত থাকা সত্ত্বেও না আসার কারণ জানতে চাইলে অপর্ণা সেন বলেন, “আমি যখন ‘গয়নার বাক্স’ করেছিলাম তখন চেয়েছিলাম ‘কোলাবরেশন’ (দুই দেশের যৌথ উদ্যোগ) হোক। কিন্তু বিভিন্ন কারণে ‘কোলাবরেশন’ হয়ে উঠল না। কিন্তু আমার খুব ইচ্ছে ছিল। এখানে পুরনো রাজবাড়ি, পদ্মা নদীর ওপর রাজবাড়ি আমি খুঁজতে চেয়েছিলাম। এখানের অভিনেতাদের কিছু নিয়ে আমি সত্যিই করতেই চেয়েছিলাম ‘গয়নার বাক্স’। কিন্তু বিভিন্ন কারণে...সেগুলো আর এখন বলে কী হবে?”

আগামী দিনে যৌথ উদ্যোগে চলচ্চিত্র নির্মাণের পরিকল্পনা আছে কি না—এমন প্রশ্নের উত্তরে অপর্ণা সেন বলেন, ‘ঠিক এক্ষুনি যৌথ উদ্যোগের পরিকল্পনা নেই। তবে সামনে আছে। রবীন্দ্রনাথের ‘ঘরে বাইরে’ আমি রিমেক করছি মডার্ন টাইমস, এখনকার সময়ে।’

বাঙালি নারীর অন্তর্জগৎ কেমন দেখেন এবং তাঁর ছবিতে নারীরা কেন মুখ্য চরিত্রের হয়—জানতে চাইলে অপর্ণা সেন বলেন, ‘একটা কথা বলি...নারী কিন্তু বহু পুরুষ পরিচালকের ছবিতেও মুখ্য চরিত্রের। আমি অনেক পুরুষ পরিচালকের নাম বলতে পারি যাঁরা দারুণ দারুণ অনেক নারী চরিত্র সৃষ্টি করেছেন। সত্যজিৎ রায়, ঋতুপর্ণ ঘোষ, মৃণাল সেন, ঋত্বিক ঘটক...আরো অনেকে।’

অপর্ণা সেন বলেন, “আমাকে নারীবাদী বানিয়ে দেবার একটা চেষ্টা আছে। আমি কিন্তু নারীবাদী নই, আমি মানবতাবাদী। নারীরাও মানবসমাজের একটি অংশ এবং আমি নিজে নারী হিসেবে নারীর অন্তর্জগত্টা কিছু বুঝতে পারি—কিভাবে বেশির ভাগ মেয়েরা ভাবে। তবু আমি বলব, যেকোনো শিল্পীর মধ্যে একটা অর্ধ নারী সত্তা থাকে। আমার মধ্যে একজন পুরুষও আছে। যেমনভাবে সত্যজিৎ রায়, ঋতুপর্ণ ঘোষ বা রবীন্দ্রনাথের মধ্যে নিশ্চয়ই নারী ছিল, তেমনি আমার মধ্যেও পুরুষ আছে। যে কারণে ‘যুগান্ত’র মতো ছবি যখন আমি করি ‘দীপক’ একটি গুরুত্বপূর্ণ চরিত্র হয়ে ওঠে, যা বিবেকের কাজ করে।”

অপর্ণা সেন বলেন, ‘সুতরাং শুধুই নারীবাদ নয়, বিভিন্ন সমস্যা বা নারীর অন্তর্জগতের বিভিন্ন আলোড়ন—এগুলো আমাদের তুলে ধরতে ভালো লাগে।’

অপর্ণা বলেন, “মিস্টার অ্যান্ড মিসেস আয়ারের কথা যদি বলেন তাহলে আমার কাছে যেটি মনে হয়, আমি একটি ‘লাভ স্টোরি’ করতে চেয়েছিলাম একটি যাত্রার মধ্য দিয়ে। বাইরের যাত্রা যেটি ভিতরকার যাত্রার প্রতীক হয়ে ওঠে। একজন মানুষ যখন যাত্রা করে তখন সে শুধু ভৌগোলিক পট অতিক্রম করে তা নয়।”

অপর্ণা বলেন, ‘আমাদের দাঙ্গা হয়েছে। সেই দাঙ্গার মধ্যেও কিন্তু মানুষের মানবতার বোধটা হারিয়ে যায়নি। আমি গভীরভাবে বিশ্বাস করি, এই মানবতাবোধটা প্রত্যেক মানুষের মধ্যে রয়েছে। কখনো কখনো যখন তা জেগে ওঠে তখন তা মানুষকে অনেকটা পথ অতিক্রম করাতে পারে।’

অপর্ণা সেন তাঁর এবারের ঢাকা সফর সম্পর্কে বলেন, ‘শেষবার এসেছিলাম ২০০০ সালে। দীর্ঘ ১৮ বছর পর আবার ঢাকায় এসেছি। আমি অভিনয় কমই করেছি। আমি ৩৭ বছর ধরে ছবি পরিচালনা করছি। বাংলাদেশে আসা আমার জন্য নস্টালজিয়া। আমার বাবা-মা দুজনই এ দেশের। আমাদের পূর্বপুরুষ সবাই বাংলাদেশের। তাই এখানে আসা আমার জন্য অত্যন্ত আনন্দের। প্রতিবারই যখন এ দেশে আসি ততবারই আমি কক্সবাজারের চেয়ে চট্টগ্রাম যেতে চাই। আমার দাদা চট্টগ্রামের বাসিন্দা ছিলেন। তাই এটি আমার জন্য নস্টালজিক সফর।’ এর আগে ঢাকায় ভারতীয় হাইকমিশনার হর্ষ বর্ধন শ্রিংলা বলেন, ‘বাংলাদেশের সঙ্গে আমাদের চার হাজার কিলোমিটার দীর্ঘ সীমান্ত আছে। আমাদের মধ্যে টেকসই যোগাযোগ যদি হাজার বছরের না হয় তবে অন্তত কয়েক শ বছরের হবে। আমাদের মধ্যে শুধু সাংস্কৃতিকই নয়, সভ্যতাগত যোগসূত্রও আছে।’



মন্তব্য