kalerkantho


সিলেটে আতঙ্কের নাম ছাত্রলীগ টিলাগড় গ্রুপ

সিলেট অফিস   

৯ জানুয়ারি, ২০১৮ ০০:০০



সিলেটে আতঙ্কের নাম ছাত্রলীগ টিলাগড় গ্রুপ

সিলেটে অভ্যন্তরীণ কোন্দলের জের ধরে প্রতিপক্ষের হামলায় তানিম খান নামে ছাত্রলীগের এক কর্মী নিহত হয়েছেন। গত রবিবার রাত ৯টার দিকে নগরের টিলাগড় এলাকায় এ ঘটনা ঘটে। রাতেই ঘটনার সঙ্গে জড়িত চারজনকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ।

গত ৪ জানুয়ারি ছাত্রলীগের প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীতে টিলাগড় গ্রুপের সঙ্গে সংঘর্ষের জের ধরে এ হত্যাকাণ্ড ঘটেছে। আর এর জের ধরে ছাত্রলীগের রণজিত অনুসারী গ্রুপের ডাকা অনির্দিষ্টকালের ধর্মঘটে গতকাল সোমবার এমসি কলেজ ও সিলেট সরকারি কলেজে কোনো ক্লাস ও পরীক্ষা হয়নি। দিনভর এই গ্রুপ এমসি কলেজের সামনে বিক্ষোভ করেছে।

এ ঘটনায় টিলাগড় এলাকায় থমথমে অবস্থা বিরাজ করছে। যেকোনো সময় দুই গ্রুপের মধ্যে সংঘর্ষের আশঙ্কা রয়েছে। সিলেটে বহুধাবিভক্ত ছাত্রলীগের টিলাগড় গ্রুপ এখন এক আতঙ্কের নাম। অন্তত পাঁচটি গ্রুপ-উপগ্রুপে বিভক্ত টিলাগড়বলয়ের ছাত্রলীগের নেতাকর্মীদের বেপরোয়া কর্মকাণ্ড এবং সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডে পুরো এলাকায় এক ভীতিকর পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে। গত চার মাসের ব্যবধানে ছাত্রলীগের টিলাগড় গ্রুপের নিজেদের মধ্যে সংঘর্ষে নিজ দলের তিন কর্মী খুন হয়েছে। সর্বশেষ খুন হলেন তানিম।

নিহত তানিম সিলেট সরকারি কলেজের বিএ পাস কোর্সের শেষ বর্ষের ছাত্র এবং সিলেটের ওসমানীনগর উপজেলার বুরুঙ্গা ইউনিয়নের নিজ বুরুঙ্গা গ্রামের ইসরাইল খানের ছেলে। তিনি শহরতলির ইসলামপুর এলাকায় একটি মেসে থাকতেন বলে তাঁর সহপাঠীরা জানিয়েছে।

তানিম জেলা ছাত্রলীগের সাবেক সভাপতি হিরণ মাহমুদ নিপু গ্রুপের কর্মী ছিলেন। অন্যদিকে তাঁর ওপর হামলাকারীরা জেলা ছাত্রলীগের সাবেক সাধারণ সম্পাদক এম রায়হান চৌধুরীর অনুসারী বলে জানা গেছে।

প্রত্যক্ষদর্শীরা জানায়, গত রবিবার রাত ৯টার দিকে তানিম কয়েকজন বন্ধু নিয়ে টিলাগড় পয়েন্টের আজমেরী রেস্টুরেন্টে চা খেয়ে বেরোনোর সময় ১০-১৫ জনের একটি দল তাদের ওপর হামলা চালায়। এ সময় অন্যরা দৌড়ে পালিয়ে গেলেও তানিম ফোনে কথা বলতে থাকায় পালাতে পারেননি। একপর্যায়ে সন্ত্রাসীরা তাঁকে উপর্যুপরি ছুরিকাঘাত করে পালিয়ে যায়। গুরুতর আহত অবস্থায় তানিমকে রাত ১০টায় ওসমানী হাসপাতালে নেওয়া হলে চিকিৎসকরা তাঁকে মৃত ঘোষণা করেন।

জেলা আওয়ামী লীগের যুব ও ক্রীড়া সম্পাদক অ্যাডভোকেট রণজিত সরকারের অনুসারী জেলা ছাত্রলীগের সাবেক সভাপতি হিরণ মাহমুদ নিপু সাংবাদিকদের বলেন, ছাত্রলীগের ৭০তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীর দিনে গত বৃহস্পতিবার ক্যাম্পাসের বাইরে থাকা আজাদ সমর্থক গ্রুপের নেতাকর্মীরা মিছিল নিয়ে কলেজ ক্যাম্পাসে প্রবেশের চেষ্টা করে ব্যর্থ হয়। এর পর থেকে তারা হামলার প্রস্তুতি নিচ্ছিল। এর জেরেই ছাত্রলীগকর্মী তানিমকে হত্যা করা হয়। তিনি অভিযোগ করেন, রায়হান ও তাদের সহযোগীরা বহিরাগতদের দিয়ে হামলা চালিয়ে তানিমকে হত্যা করেছে।

হিরণ মাহমুদ নিপু আরো অভিযোগ করেন, গত বছরের সেপ্টেম্বরে তাঁর অনুসারী কর্মী জাকারিয়া মাছুম, নভেম্বরে সিয়াম ও সর্বশেষ রবিবার তানিম খুন হন আজাদ অনুসারী রায়হান গ্রুপের হাতে।

নিহত তানিমের খালু গিয়াস উদ্দিন জানান, পাঁচ ভাই ও তিন বোনের মধ্যে তিনি ছিলেন চতুর্থ। পারিবারিকভাবে তাঁরা আওয়ামী লীগের রাজনীতির সঙ্গে সংশ্লিষ্ট। তানিমের বাবা ইসরাঈল খান বুরুঙ্গা ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের সাবেক সভাপতি। বড় ভাই নুরুল ইসলাম বাবলু বুরুঙ্গা ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক। তিনি বলেন, নিজের সংগঠনের ক্যাডারদের হাতে তানিম খুন হবেন তাঁরা ভাবতেই পারছেন না।

বড় ভাই বাবলু হাসপাতালে চিৎকার করে কাঁদছিলেন আর বলছিলেন, গ্রুপিং রাজনীতিতে জড়িয়ে পড়ায় বারবারই আশঙ্কা হতো; সেই আশঙ্কাই সত্যি হলো। তিনি তানিমের খুনিদের গ্রেপ্তারের দাবি জানান। একই সঙ্গে আর যেন কারো ভাইকে এভাবে চলে যেতে না হয় সে ব্যবস্থা গ্রহণের দাবি জানান তিনি। সিলেট মহানগর পুলিশের শাহপরান থানার ওসি আখতার হোসেন বলেন, গতকাল সন্ধ্যা পর্যন্ত থানায় কোনো মামলা হয়নি।

৪ ছাত্রলীগ নেতাকর্মী গ্রেপ্তার : ছাত্রলীগকর্মী তানিম খুনের ঘটনায় ছাত্রলীগ নেতা জয়নাল আবেদীন ডায়মন্ডসহ  চারজনকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। অন্যরা হলেন আওয়ামী লীগ নেতা ও সিটি করপোরেশনের কাউন্সিলর আজাদুর রহমান আজাদের অনুসারী সিলেট জেলা ছাত্রলীগের সাবেক সাধারণ সম্পাদক রায়হান চৌধুরী গ্রুপের কর্মী  রুহেল আহমদ, জাকির আহমদ ও সৈয়দ আবিদ আহমদ। ওসি আখতার হোসেন এ তথ্য নিশ্চিত করে কালের কণ্ঠকে বলেন, গতকাল ভোরে নগরের রায়নগর এলাকার একটি বাসা থেকে ডায়মন্ডকে গ্রেপ্তার করা হয়। বাকি তিনজনকে রবিবার রাতে নগরের বিভিন্ন স্থান থেকে আটক করা হয়।

ধর্মঘটে অচল দুই কলেজ : ছাত্রলীগকর্মী তানিম খান হত্যার ঘটনায় এমসি কলেজ ও সিলেট সরকারি কলেজে থমথমে অবস্থা বিরাজ করছে। ছাত্রলীগের একটি গ্রুপের ডাকা অনির্দিষ্টকালের ধর্মঘটে অচল ছিল দুটি কলেজই। ধর্মঘটের কারণে ডিগ্রি ইনকোর্স পরীক্ষা ও বিভিন্ন বিভাগের পরীক্ষা অনিবার্য কারণ দেখিয়ে সকাল ১০টায় স্থগিত করেছে কলেজ কর্তৃপক্ষ।

গতকাল সকালে এমসি কলেজ ও সরকারি কলেজের প্রধান ফটকে তালা দিয়ে এই দুই কলেজে অনির্দিষ্টকালের ছাত্রধর্মঘটের ডাক দেয় আওয়ামী লীগ নেতা রণজিত সরকার অনুসারী ছাত্রলীগ নেতাকর্মীরা। সকাল সাড়ে ১০টায় এমসি কলেজের প্রধান ফটকে বেঞ্চ বসিয়ে ছাত্রলীগ নেতাকর্মীরা অবস্থান ধর্মঘট শুরু করলে ক্যাম্পাসে ঢুকতে পারেনি শিক্ষার্থীরা। এ সময় সিলেট-তামাবিল সড়ক অবরোধ ও এমসি কলেজ মাঠে কাউন্সিলর আজাদ কাপ ক্রিকেট ভেন্যু ভাঙচুর করা হয়।

আতঙ্কের নাম টিলাগড় গ্রুপ : সিলেট নগর ছাত্রলীগের এই গ্রুপের অব্যাহত সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডের কারণে গত বছর অক্টোবরে জেলা ছাত্রলীগের কমিটি বিলুপ্ত করা হলেও খুনাখুনি বন্ধ হচ্ছে না। 

আওয়ামী লীগের রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত এমন একাধিক সূত্রে জানা গেছে, সিলেটে ছাত্রলীগের গ্রুপিং রাজনীতিতে অন্যতম আলোচিত এই গ্রুপ শুরু থেকেই মূলত দুটি ভাগে বিভক্ত। দুটি গ্রুপ মিলেই টিলাগড় গ্রুপ। এক গ্রুপের নেতৃত্বে মহানগর আওয়ামী লীগের শিক্ষাবিষয়ক সম্পাদক ও সিটি কাউন্সিলর আজাদুর রহমান আজাদ। অন্য গ্রুপের নেতা জেলা আওয়ামী লীগের যুব ও ক্রীড়া সম্পাদক অ্যাডভোকেট রণজিত সরকার।

আজাদুর রহমান আজাদের গ্রুপে বর্তমানে বিলুপ্ত হওয়া জেলা ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক এম রায়হান চৌধুরীকেন্দ্রিক একটি বলয় থাকলেও রণজিত গ্রুপে দুটি বলয় রয়েছে। এর মধ্যে জেলা ছাত্রলীগের সাবেক সভাপতি হিরন মাহমুদ নিপুকে কেন্দ্র করে একটি বলয় এবং জেলা ছাত্রলীগের সাবেক সাংগঠনিক সম্পাদক জাহাঙ্গীর আলমকে ঘিরে অন্য বলয়। দুটি বলয়ের মধ্যে নিপু বলয়ের ছাত্রলীগকর্মীরা নগরের বালুচর এলাকায় এবং জাহাঙ্গীরকেন্দ্রিক বলয় খাদিমপাড়া ও মেজর টিলা এলাকার ওয়ান ব্যাংকের সামনে অবস্থান করে থাকে।

এবার ওসমানীনগরে দুই পক্ষের সংঘর্ষে আহত ২০ : এবার ওসমানীনগর উপজেলায় ছাত্রলীগের বিবদমান দুই পক্ষের নেতাকর্মীদের মধ্যে দফায় দফায় সংঘর্ষে উভয় পক্ষের অন্তত ২০ জন আহত হয়েছে। গতকাল দুপুর ২টার দিকে উপজেলার সিলেট-ঢাকা মহাসড়কের তাজপুর বাজারে এ সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে। এ সময় প্রায় এক ঘণ্টা সিলেট-ঢাকা মহাসড়কে যান চলাচল বন্ধ ছিল।



মন্তব্য