kalerkantho


স্থবির ৩ প্রকল্পে ১৭ শ কোটি টাকা বাতিল করছে আইডিবি

পরিচ্ছন্নতা ও পোশাককর্মীদের স্বপ্নে ধাক্কা

আরিফুর রহমান   

৭ জানুয়ারি, ২০১৮ ০০:০০



তিন বছর আগে ইসলামী উন্নয়ন ব্যাংকের (আইডিবি) চার সদস্যের একটি প্রতিনিধিদল বাংলাদেশ সফরে এসে ফরিদপুর, ময়মনসিংহ ও গাজীপুর জেলায় যান। এই তিন জেলার কয়েক শ পরিচ্ছন্নতাকর্মী ও পোশাকশিল্প খাতে কর্মরত হাজারো শ্রমিকের দুঃখ-দুর্দশা দেখে তাঁরা আবেগপ্রবণ হয়ে পড়েন। প্রতিনিধিদলের সঙ্গে থাকা বাংলাদেশের এক সদস্য ২০১৫ সালের ওই ঘটনার স্মৃতিচারণা করে বলেন, এরপর এই তিন জেলার পরিচ্ছন্নতাকর্মী ও পোশাকশিল্প খাতে কর্মরত শ্রমিকদের আবাসনব্যবস্থা নিশ্চিত করতে দুই কোটি ডলার ঋণ দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দেয় আইডিবি। বাংলাদেশি মুদ্রায় যার পরিমাণ ১৬০ কোটি টাকা। এর পরের বছর অর্থাৎ ২০১৬ সালে সরকারের সঙ্গে আইডিবির চুক্তিও সই হয়।

চুক্তি সইয়ের পর প্রায় দুই বছর পার হতে চললেও ভবন নির্মাণের কাজ শুরু তো দূরের কথা, এখন পর্যন্ত এ সংক্রান্ত ‘সাসটেইনেবল হাউজিং ফর লো ইনকাম আরবান কমিউনিটিজ’ শিরোনামের প্রকল্পটি একনেক সভায় অনুমোদনই পায়নি। প্রকল্পটি থেকে অবশেষে প্রতিশ্রুত ঋণ বাতিলের সিদ্ধান্ত নিয়েছে আইডিবি। সংস্থাটির নতুন প্রেসিডেন্ট বান্দার এম এইচ হাজ্জার ঘোষণা দিয়েছেন, আইডিবির ৫৭টি সদস্য দেশে যতগুলো প্রকল্প স্থবির হয়ে আছে, সব প্রকল্প থেকে অর্থায়ন বাতিল করা হবে। বাংলাদেশ সরকারকেও ঘোষণাটি জানিয়ে দেওয়া হয়েছে।

আইডিবির এমন সিদ্ধান্তে বিপাকে পড়েছে বাস্তবায়নকারী সংস্থা অর্থ মন্ত্রণালয়ের ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগের আওতায় থাকা বাংলাদেশ মিউনিসিপ্যাল ডেভেলপমেন্ট ফান্ড (বিএমডিএফ)। একই সঙ্গে পরিচ্ছন্নতাকর্মী ও পোশাকশিল্প শ্রমিকদের স্বপ্নের আবাসনও ঝুলে গেল। এখন প্রতিদিন যেমন তাদের মানবেতর জীবন কাটাতে হচ্ছে, শিগগিরই এর কোনো পরিবর্তন আসছে না। অথচ এত দিন তারা স্বপ্নে  বিভোর ছিল।

শুধু পরিচ্ছন্নতাকর্মী ও পোশাক শ্রমিকদের আবাসন প্রকল্পই নয়, রংপুর বিভাগের জেলাগুলোতে নিম্নবিত্ত কৃষকদের সেচ উন্নয়ন, হাটবাজার উন্নয়ন, গ্রামীণ অবকাঠামো উন্নয়নে তিন কোটি ৪০ লাখ ডলার ঋণ দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল আইডিবি। বাংলাদেশি মুদ্রায় যার পরিমাণ ২৭২ কোটি টাকা। তিন বছর পেরিয়ে গেলেও প্রকল্পটি স্থবির। তাই এই প্রকল্প থেকেও প্রতিশ্রুত ঋণ বাতিলের সিদ্ধান্ত নিয়েছে আইডিবি।

বিদ্যুতের সিস্টেম লস কমানোর পাশাপাশি গ্রাহকদের হয়রানি দূর করতে প্রি-পেমেন্ট মিটারিংয়ের জন্য ২০১৫ সালে সাড়ে ১৫ কোটি ডলার ঋণ দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল আইডিবি। কিন্তু গত তিন বছরে এই প্রকল্পেও কোনো অগ্রগতি নেই। ফলে প্রকল্প থেকেও প্রতিশ্রুত এক হাজার ২৪০ কোটি টাকা বাতিলের কথা জানিয়ে দিয়েছে আইডিবি। তিনটি প্রকল্পই এখন পর্যন্ত একনেক সভায় অনুমোদন পায়নি। সব মিলিয়ে তিন প্রকল্পে ২১ কোটি ডলার বা এক হাজার ৬৭২ কোটি টাকা বাতিল করতে যাচ্ছে আইডিবি।

সংস্থাটি বলেছে, শুধু বাংলাদেশের বেলায় এমন সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়নি; আইডিবির ৫৭টি সদস্যের জন্য এমন ক্ষেত্রে এ ধরনের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। চুক্তি বাতিলের পেছনে যুক্তি তুলে ধরে আইডিবি বলেছে, বাজার থেকে টাকা তুলে তারা তিনটি প্রকল্পের জন্য আলাদা করে অর্থ বরাদ্দ দিয়ে রেখেছে। এই অর্থ তিন বছর ধরে অব্যবহৃত অবস্থায় পড়ে আছে। অর্থ খরচ না হওয়ায় তাদের ক্ষতি হচ্ছে। তাই এমন সিদ্ধান্ত। সংস্থাটি জানায়, সিদ্ধান্ত পুনর্বিবেচনার জন্য আইডিবিকে অনুরোধ জানানো হলেও এটা করার কোনো সুযোগ নেই। 

অর্থ মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা বলছেন, তিন প্রকল্পে তিন ধরনের সমস্যা ছিল। তবে সার্বিকভাবে বলা যেতে পারে, মন্ত্রণালয়গুলোর অদক্ষতা ও সক্ষমতার অভাবে এখন নিম্নবিত্তদের জন্য বরাদ্দকৃত এত টাকা বাতিল হচ্ছে।

অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগের (ইআরডি) সচিব কাজী শফিকুল আযম কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘সমস্যা দুই দিকেই আছে। শুধু বাংলাদেশের দোষ নয়; তাদেরও কিছু সমস্যা আছে। তা ছাড়া আইডিবিতে এখন কিছু সংস্কার চলছে। তাদের নতুন প্রেসিডেন্ট এসেছে।’ শফিকুল আযম আরো বলেন, ‘শুধু বাংলাদেশের বেলায় নয়; আইডিবির সদস্য ৫৭টি দেশে স্থবির থাকা প্রকল্প থেকে অর্থায়ন বাতিল করতে যাচ্ছে আইডিবি। এর মধ্যে বাংলাদেশের তিনটি প্রকল্পে ২১ কোটি ডলারের মতো বাতিল হতে চলেছে।’

অর্থ মন্ত্রণালয় সূত্র বলছে, ফরিদপুর, ময়মনসিংহ ও গাজীপুর এই তিন জেলায় ‘সাসটেইনেবল হাউজিং ফর লো ইনকাম আরবান কমিউনিটিজ’ শিরোনামের প্রকল্পটির আওতায় নিম্নবিত্ত ৮৫০টি পরিবারকে আবাসন সুবিধা দেওয়ার কথা। এ ছাড়া কালিয়াকৈরে পাঁচটি ডরমিটরি নির্মাণ করে সেখানে প্রায় দুই হাজার পোশাক শ্রমিকের থাকার সুযোগ করে দেওয়ার কথা এই প্রকল্পের আওতায়। আবাসনব্যবস্থার পাশাপাশি পরিচ্ছন্নতাকর্মী ও পোশাক শ্রমিকদের জন্য বিশুদ্ধ পানি, পয়োনিষ্কাশনব্যবস্থা, নবায়নযোগ্য জ্বালানি, ডে কেয়ার সেন্টার তৈরি করে দেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে। কিন্তু সব পরিকল্পনাই ভেস্তে যেতে চলেছে। অভিযোগ আছে, প্রকল্প বাস্তবায়নকারী সংস্থা বাংলাদেশ মিউনিসিপ্যাল ডেভেলপমেন্ট ফান্ডের (বিএমডিএফ) দক্ষ জনবল নেই। এ ধরনের প্রকল্প বাস্তবায়নের অভিজ্ঞতাও তাদের নেই।

এই প্রকল্পের পরিচালক আহমেদ জামান তারিক কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘আপনি যেমন আইডিবির ঋণ বাতিলের কথা শুনেছেন, আমরাও শুনেছি। তবে সংস্থাটি এভাবে হুট করে চুক্তি বাতিল করতে পারে না। তারা একটি রাষ্ট্রের সঙ্গে চুক্তি করেছে।’ কেন প্রকল্পটি এখনো প্রণয়ন হয়নি—এ প্রশ্নের জবাবে জামান তারিক বলেন, ‘প্রকল্পে ভূমি অধিগ্রহণে অনেক দেরি হয়ে গেছে। সারা দেশে এ ধরনের প্রকল্প আর আছে কি না এমন তথ্য পেতে পেতে এবং আরো কিছু প্রক্রিয়া শেষ করতে করতে কিছু সময় বেশি লেগেছে। সে কারণে প্রকল্পটি এখনো একনেক সভায় পাঠানো যায়নি।’ চলতি মাসের মধ্যে প্রকল্পটি পরিকল্পনা কমিশনে পাঠানো হবে বলে জানান তিনি।

বিদ্যুতের সিস্টেম লসের অভিযোগ বহু পুরনো। তা ছাড়া বিদ্যুৎ বিল দিতে গিয়ে হয়রানির অভিযোগ আছে অহরহ। বিদ্যুতের বিল বেশি আসে এমন অভিযোগও বিস্তর। বিদ্যুতে সিস্টেম লস কমানোর পাশাপাশি গ্রাহকদের হয়রানি কমাতে প্রি-পেমেন্ট মিটারিংয়ের জন্য ২০১৫ সালে সাড়ে ১৫ কোটি ডলার ঋণ দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল আইডিবি। এই প্রকল্পও একনেক সভায় অনুমোদন পায়নি। প্রি-পেমেন্ট মিটারিং কেনা নিয়ে আইডিবির সঙ্গে বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের বনিবনা না হওয়ার কারণে এই প্রকল্পে অগ্রগতি হয়নি বলে জানা গেছে।

রংপুর বিভাগের জেলাগুলোর গ্রামীণ হাটবাজার, সেচব্যবস্থার উন্নয়ন, গ্রামীণ সড়ক উন্নয়নে নেওয়া প্রকল্পটিতে গত বছর মে মাসে আইডিবির সঙ্গে চুক্তি সই হয়েছিল সরকারের। কিন্তু প্রকল্পটি একনেক সভায় এখনো আসেনি। প্রকল্প বাস্তবায়নকারী সংস্থা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর ও এলজিইডির কর্মকর্তাদের মধ্যে অভ্যন্তরীণ স্বার্থ হাসিলের কারণে প্রকল্পটি স্থবির হয়ে পড়ে আছে বলে জানিয়েছেন অর্থ মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা। সব মিলিয়ে স্থবিরতার অভিযোগ তুলে তিন প্রকল্প থেকে এক হাজার ৬৭২ কোটি টাকা বাতিল করতে যাচ্ছে আইডিবি।



মন্তব্য