kalerkantho


রোহিঙ্গা শিশুদের বাংলায় পড়ানোর প্রস্তাবে ‘না’

জটিলতা বাড়ার আশঙ্কায় এই সিদ্ধান্ত

মেহেদী হাসান ও আবুল কাশেম   

৭ জানুয়ারি, ২০১৮ ০০:০০



আশ্রয় নেওয়া রোহিঙ্গা শিশুদের বাংলা ভাষায় পড়ালেখাবিষয়ক একটি প্রস্তাবের বিরোধিতা করেছে বাংলাদেশ। জানা গেছে, জাতিসংঘ আন্তর্জাতিক জরুরি শিশু তহবিল ইউনিসেফ গত অক্টোবর মাসে কক্সবাজারের টেকনাফ ও উখিয়া উপজেলায় বিভিন্ন রোহিঙ্গা শিবিরে চার থেকে ১৪ বছর বয়সী ১৫ হাজার শিশুকে বাংলা ও বার্মিজ ভাষায় উপানুষ্ঠানিক শিক্ষা দেওয়ার আগ্রহ প্রকাশ করে। সরকারের প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয় এ বিষয়ে মতামত জানতে চাইলে কক্সবাজার জেলা প্রশাসন রোহিঙ্গা শিশুদের বাংলা ভাষায় শিক্ষা দেওয়ার বিরোধিতা করে জবাব পাঠায়।

জানা গেছে, কক্সবাজারের জেলা প্রশাসক মো. আলী হোসেন গত ২৮ নভেম্বর প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়কে পাঠানো চিঠিতে লেখেন, বাস্তুচ্যুত রোহিঙ্গারা মিয়ানমারের নাগরিক। তাই তাদের বাংলা ভাষায় নয়, বার্মিজ ভাষায় শিক্ষা দেওয়া যেতে পারে। তিনি কক্সবাজারের টেকনাফ ও উখিয়া উপজেলায় বিভিন্ন রোহিঙ্গা শিবিরে বার্মিজ ভাষায় উপানুষ্ঠানিক শিক্ষা দিতে শিক্ষাকেন্দ্র স্থাপনে ইউনিসেফের প্রস্তাব বিবেচনার পক্ষে মত দেন।

সরকারি অন্য সূত্রগুলোও কক্সবাজার জেলা প্রশাসনের ওই অবস্থানের সঙ্গে একমত পোষণ করেছে বলে জানা গেছে। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক কর্মকর্তা কালের কণ্ঠকে বলেন, মিয়ানমার কর্তৃপক্ষ যেসব কারণে রোহিঙ্গাদের ‘বেঙ্গলি’ অভিহিত করার চেষ্টা চালায় সেগুলোর অন্যতম হলো কক্সবাজার অঞ্চলের স্থানীয় ভাষার সঙ্গে মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যের রোহিঙ্গাদের ভাষাগত সাদৃশ্য। বাংলাদেশ চায়, আশ্রয় নেওয়া রোহিঙ্গারা মিয়ানমারে নিজ বসতভূমিতে ফিরে যাবে। এখন তাদের বাংলা ভাষায় শিক্ষা দেওয়া হলে স্থানীয়দের সঙ্গে মিশে যাওয়ার সম্ভাবনাসহ নতুন করে আরো অনেক জটিলতা সৃষ্টি হতে পারে। তাই এসব জটিলতা এড়াতে তাদের বাংলা ভাষা শেখানো ও বাংলা ভাষায় শিক্ষা কার্যক্রম না চালানোই মঙ্গল।

ওই কর্মকর্তা বলেন, রোহিঙ্গারা যেহেতু মিয়ানমারের বাসিন্দা, তাই তাদের শিক্ষা কার্যক্রম ওই দেশের ভাষায়ই (বার্মিজ) হওয়া উচিত। বর্মী ভাষা শিক্ষা কার্যক্রম চালানো হলে মিয়ানমারে ফিরে গিয়ে ওই দেশটির অন্য জনগণের সঙ্গে তাদের মিশতে সহজ হবে।

কূটনৈতিক সূত্রগুলো জানায়, আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় ও জাতিসংঘের বিভিন্ন সংস্থা রোহিঙ্গাদের জন্য মানবিক বিভিন্ন প্রস্তাব নিয়ে আসছে। তবে সেগুলো গ্রহণ করার আগে সম্ভাব্য প্রভাব যাচাই করা অপরিহার্য। সরকার সতর্কতার সঙ্গে তা করার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে।

উল্লেখ্য, গত ২৫ আগস্ট থেকে মিয়ানমারে বাস্তুচ্যুত হয়ে বাংলাদেশে আশ্রয় নেওয়া ছয় লাখ ৫৫ হাজার রোহিঙ্গার উল্লেখযোগ্য অংশই শিশু। রোহিঙ্গা শিশুদের ভয়াবহ পরিস্থিতি বিবেচনা করে ইউনিসেফ গত অক্টোবর মাসেই ‘চাইল্ড অ্যালার্ট’ জারি করেছে।

জানা গেছে, সাম্প্রতিক মাসগুলোতে আশ্রয় নেওয়া রোহিঙ্গাদের অনেকেরই অভিভাবক তাদের সঙ্গে নেই। মিয়ানমার বাহিনীর বর্বরতায় তারা পরিবার-পরিজনকে হারিয়েছে বা বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে। তাই তাদের পরিচয় যাচাই করে ফেরত পাঠানোর বিষয়টি জটিল হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।

এদিকে পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী মো. শাহিরয়ার আলম বলেছেন, গত ২৩ নভেম্বর মিয়ানমার ও বাংলাদেশের মধ্যে প্রত্যাবাসন চুক্তি সইয়ের দুই মাসের মধ্যেই প্রত্যাবাসন শুরু হওয়ার কথা। বাংলাদেশ ওই সময়সীমার মধ্যে অর্থাৎ ২২ জানুয়ারির মধ্যেই প্রত্যাবাসন শুরুর চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে।

তিনি বলেন, ‘অনেকে বলছে যে পাঁচ থেকে সাত লাখ রোহিঙ্গা এসেছে। তবে আমাদের হিসাবে এ সংখ্যা প্রায় ১০ লাখ। গত ১ জানুয়ারি পর্যন্ত ৯ লাখ ২৩ হাজার রোহিঙ্গার নিবন্ধন সম্পন্ন হয়েছে।’

পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী বলেন, ‘রোহিঙ্গা ইস্যুতে বাংলাদেশ বিদেশিদের কাছ থেকে সুবিধা নিতে চায় না। কেবল মানবিক কারণেই প্রধানমন্ত্রী রোহিঙ্গাদের আশ্রয় দিয়েছেন। এই মানবিক বিষয়টির জন্য বিশ্বের শতভাগ রাষ্ট্র বাংলাদেশের পাশে আছে। কেউ যদি না থাকে তবে আমাদের কিছু আসে যায় না।’



মন্তব্য