kalerkantho


খিলগাঁও মডেল কলেজে ছাত্রলীগের মাদক আসর!

নেশার টাকা জোগায় ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীরা

রেজোয়ান বিশ্বাস   

৭ জানুয়ারি, ২০১৮ ০০:০০



খিলগাঁও মডেল কলেজে ছাত্রলীগের মাদক আসর!

‘খিলগাঁও মডেল কলেজ ক্যাম্পাসে মাদক সেবনের অভিযোগ পাওয়া গেছে। নেশার টাকা জোগাড় করতে গিয়ে চাঁদাবাজি, ছিনতাইয়ের মতো ঘটনাও ঘটাচ্ছে মাদকসেবীরা। শুধু অভিযোগই নয়, কিছুদিন আগে ওই ক্যাম্পাসে অভিযান চালিয়ে মাদক সেবনরত অবস্থায় কয়েকজনকে আটক করা হয়। তাদের মধ্যে কলেজটির ছাত্রও ছিল। কলেজটির বর্তমান ছাত্রনেতাসহ সন্দেহভাজনদের ওপর আমাদের নজরদারি আছে।’ কালের কণ্ঠকে বলছিলেন খিলগাঁও থানার ওসি মো. মশিউর রহমান। তবে প্রতিদিন পুলিশ গিয়ে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ করতে পারবে না জানিয়ে ওসি বলেন, ‘ক্যাম্পাসকে মাদকমুক্ত করতে কলেজ কর্তৃপক্ষের পাশাপাশি অভিভাবক ও শিক্ষকদেরও বিশেষ ভূমিকা রাখতে হবে।’ খোদ ওসি স্বীকার করেন, ‘বর্তমানে সমাজের সবচেয়ে বড় সমস্যা মাদক।’

পুলিশের এমন তথ্যের ভিত্তি জানতে চাইলে খিলগাঁও মডেল কলেজের প্রিন্সিপাল কানাইলাল সরকার কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘এটা (মাদক) একসময় ছিল। এখন আছে কি না আমার নলেজে নেই। ছাত্রদের বিরুদ্ধে এ ধরনের অভিযোগ পেলে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হয়।’

অধ্যক্ষ অজ্ঞতার কথা বললেও কলেজ ক্যাম্পাসসহ আশপাশের এলাকায় খোঁজ নিয়ে কারা ক্যাম্পাসে মাদক সেবন করে সে বিষয়ে নানা তথ্য পাওয়া গেছে। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক কয়েকজন প্রত্যক্ষদর্শী এ ক্ষেত্রে ছাত্রলীগের বর্তমান আহ্বায়ক কমিটির কয়েকজন সদস্য এবং তাঁদের ঘনিষ্ঠ স্থানীয় কিছু বখাটে কিশোরের নামে অভিযোগ করেন। তাদের সঙ্গে অস্ত্রধারী ক্যাডার থাকে বলেও তথ্য পাওয়া যায়। এলাকার মুরব্বি ও অভিভাবকদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, খিলগাঁও মডেল কলেজের এমন পরিবেশে তাঁরাও মর্মাহত।

গত কয়েক দিন কলেজে গিয়ে খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, ছাত্রলীগের আহ্বায়ক কমিটির সদস্যরা গভীর রাত পর্যন্ত কলেজ ক্যাম্পাসে কোনো কারণ ছাড়াই অবস্থান করেন। ছাত্রসংসদের নামে কলেজের একটি কক্ষ দখল করে সেখানে মাদক সেবন চলে। বাধা দিতে গেলে কলেজের নিরাপত্তাকর্মীদের তারা মারধর করে। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক নিরাপত্তাকর্মী বলেন, ‘গভীর রাত পর্যন্ত ছাত্রলীগ পরিচয়ধারীরা কলেজ ক্যাম্পাসে মাদক সেবন করে।’ সূত্র মতে, নিরাপত্তারক্ষীরা তাদের বাধা দিতে গিয়ে মারধরের শিকারও হয়েছে। এ নিয়ে কলেজ কর্তৃপক্ষ অনেকবার বৈঠক করেছে। তবে পরিস্থিতির পরিবর্তন হয়নি। অভিযোগ রয়েছে, ছাত্রলীগের আহ্বায়ক কমিটির শীর্ষস্থানীয় নেতা ও কিছু সদস্যের সঙ্গে অছাত্র ও  তাদের ঘনিষ্ঠ স্থানীয় বখাটেরা এ ঘটনায় সম্পৃক্ত। তাদের সঙ্গে অন্য রাজনৈতিক দলেরও কিছু কর্মী থাকে।

জানা গেছে, গত ৫ নভেম্বর বদরুল আমিন রনিকে আহ্বায়ক করে খিলগাঁও মডেল কলেজ শাখা ছাত্রলীগের ১১ সদস্যের তিন মাস মেয়াদি আহ্বায়ক কমিটি গঠন করা হয়। আহ্বায়ক রনি মাদক সেবন করেছেন এমন একটি ছবি এরই মধ্যে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ভাইরাল হয়েছে। এ ছাড়া কমিটির আরো তিনজনের বিরুদ্ধে রয়েছে গঠনতন্ত্রবিরোধী অভিযোগ। নিজেকে নিরপরাধ দাবি করে আহ্বায়ক কমিটির প্রধান রনি কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘কলেজে ছাত্রলীগের রাজনীতি নিয়ে আগে থেকেই কোন্দল আছে। বিরোধী পক্ষের কেউ এ ধরনের মিথ্যা তথ্য ছড়াচ্ছে। আমি ও আমার কমিটির কেউই মাদক সেবন করি না। আর কোনো ধরনের অপরাধে জড়িত থাকলে কেন্দ্রীয় কমিটি তদন্ত করে যা ব্যবস্থা নেবে মাথা পেতে নেব।’

যুগ্ম আহ্বায়ক মাজহারুল তনয় বলেন, ‘কলেজে একসময় মাদকসেবীদের আড্ডা ছিল, এটা সত্য। তবে এখন নেই। আমাদের কমিটি আসার পর সেটা অনেকটাই নিয়ন্ত্রণ করা হয়েছে। আমাদের বিরুদ্ধে কোনো অভিযোগ থাকলে মহানগর ও কেন্দ্রীয় ছাত্রলীগ যে ব্যবস্থা নেবে তা মাথা পেতে নেব।’

গত ৯ নভেম্বর এম আই খান নামে একজন ইউটিউবে বদরুল আমিন রনির একটি ভিডিও আপলোড করেন। এই ভিডিওতে দেখা গেছে, ‘বদরুল আমিন খালি গায়ে সিগারেটের মতো দেখতে একটি চিকন পাইপ মুখে দিয়ে বসে আছেন। পাশে বসা আরেক যুবক তাঁর সামনে অ্যালুমিনিয়াম ফয়েল ধরে রেখেছেন। তিনি সেটি টেনে নিচ্ছেন আর ধোঁয়া ছাড়ছেন।’ ভিডিওটি সম্পর্কে জানতে চাইলে রনি কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘আমার অজান্তে গোপন ক্যামেরা বা মোবাইলে ভিডিওটি ধারণ করা। তবে ওই ভিডিওটি দেড় বছর আগের। পুরনো ফেক ছবি আমাকে ঘায়েল করতে ফেসবুকে ছেড়ে দেওয়া হয়েছে।’ 

একাধিক ছাত্র ছাত্রলীগের বর্তমান কমিটির নেতাদের অনেকের বিরুদ্ধে কলেজে মাদক সেবনের অভিযোগ করে। এর আগে এক ছাত্রলীগ নেতার মাদক সেবনের প্রতিবাদ করতে গিয়ে কলেজের এক সাধারণ ছাত্রকেই উল্টো ইয়াবা দিয়ে পুলিশের কাছে ধরিয়ে দেওয়া হয়। পরে তদন্তে অভিযোগের সত্যতা না পেয়ে পুলিশ ওই ছাত্রকে ছেড়ে দেয়।

সার্বিক বিষয়ে জানতে চাইলে ছাত্রলীগের কেন্দ্রীয় কমিটির সভাপতি সাইফুর রহমান সোহাগ কালের কণ্ঠকে বলেন, কমিটি ঘোষণার আগে তাদের বিরুদ্ধে এসব তথ্য ছিল না। অভিযোগ পেলে যাচাই-বাছাই করে সাংগঠনিকভাবে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

ফুটপাতে চাঁদাবাজি : সরেজমিনে দেখা গেছে, ক্যাম্পাসের আশপাশের ফুটপাতগুলোতে অনেক চা-সিগারেটের দোকান। সেগুলো থেকে ছাত্রলীগের আহ্বায়ক কমিটির নেতারা নিয়মিত চাঁদা নেন বলে অভিযোগ শোনা গেছে। অর্ধশতাধিক দোকান তাঁদের মাসে দুই থেকে তিন হাজার টাকা চাঁদা দেয়। ভয়ে দোকানদাররা পুলিশের কাছেও অভিযোগ দেয় না।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক ফুটপাতের কয়েকজন দোকানদার কালের কণ্ঠকে বলে, স্বল্প পুঁজি নিয়ে তারা ফুটপাতে ব্যবসা করে। দিন শেষে তাদের কারো কাছ থেকে ৫০০ আবার কারো কাছ থেকে ২০০-৩০০ টাকা নেয় ছাত্রলীগ পরিচয়ধারীরা। এদের অনেকেই মাদকসেবী। তাদের অনেককেই কলেজ ক্যাম্পাসের বাইরেও মাদক সেবন করতে দেখা গেছে। তাদের দেখাদেখি আরো অনেক বখাটে কিশোর ও তরুণ অনেকটা প্রকাশ্যেই মাদক সেবন করছে। এতে একদিকে এলাকার পরিবেশ নষ্ট হচ্ছে অন্যদিকে এলাকায় ছিনতাই ও চাঁদাবাজি বাড়ছে বলে তারা মনে করছে। গত মাসে কলেজের আশপাশের এলাকায় বেশ কয়েকটি ছিনতাই হয় বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে। যেহেতু অপরাধীদের অনেকেই এলাকার চেনা মুখ তাই পুলিশের কাছে অভিযোগ দিতেও ভয় পায় স্থানীয়রা। ভুক্তভোগী একজন বলেন, এলাকায় কারা মাদক সেবন করে, মাদক বিক্রি করে, চাঁদাবাজি-ছিনতাইয়ের সঙ্গে সম্পৃক্ত তা পুলিশেরও জানা। তবে কেন ঠিকমতো ব্যবস্থা নেওয়া হয় না সেটাই প্রশ্ন।



মন্তব্য