kalerkantho


সরকারের নিয়ন্ত্রণ থাকছে না উবারে

পার্থ সারথি দাস   

৭ জানুয়ারি, ২০১৮ ০০:০০



সরকারের নিয়ন্ত্রণ থাকছে না উবারে

যাত্রীদের কাছ থেকে পাওয়া লভ্যাংশ বিদেশে স্থানান্তর এবং মোটরসাইকেলে ভাড়ার হারে নিয়ন্ত্রণারোপ ছাড়াই চূড়ান্ত হতে যাচ্ছে ‘রাইড শেয়ারিং সার্ভিস নীতিমালা’। অ্যাপভিত্তিক পরিবহনসেবা-বিষয়ক নীতিমালার খসড়া দ্রুত মন্ত্রিসভা বৈঠকে উপস্থাপন করার প্রস্তুতি চলছে। গত ১৪ ডিসেম্বর সড়ক পরিবহন ও সেতু মন্ত্রণালয় থেকে খসড়াটি মন্ত্রিপরিষদ বিভাগে পাঠানো হয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে।

প্রায় দুই কোটি মানুষের শহর ঢাকায় অ্যাপভিত্তিক পরিবহনসেবা বিস্তৃত হচ্ছে দ্রুত। যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক গাড়িসেবা প্রতিষ্ঠান ‘উবার’ ২০১৬ সালের ২২ নভেম্বর সেবা শুরু করে। গণপরিবহনের চরম সংকটের ফাঁকে অ্যাপভিত্তিক পরিবহনসেবায় যোগ হয়েছে মোটরসাইকেলও। দ্রুত এই সেবার বিস্তৃতি ঘটলেও এ বিষয়ে সরকারি নীতিমালা নেই। উবারের সেবা চালু হওয়ার পরপরই বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষ (বিআরটিএ) এই সেবা অবৈধ বলে ঘোষণা দিয়েছিল। তবে এরই মধ্যে উবারের সেবা বিস্তৃত হয়েছে। উবার কর্তৃপক্ষ নিজেরাই দুই দফা ভাড়া নির্ধারণ করেছে। উবার ছাড়াও মোটরসাইকেলে যাত্রীসেবা দিচ্ছে ‘পাঠাও’সহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান। ভাড়ার হার নির্ধারণে সরকারের নিয়ন্ত্রণ না থাকায় উবার কর্তৃপক্ষ ইচ্ছামতো ভাড়া আদায় করে বিদেশে অর্থ পাচার করছে বলে অভিযোগ রয়েছে।

মালিক ও চালকদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, প্রতিটি ট্রিপের ভাড়া থেকে ২৫ শতাংশ অর্থ সরাসরি কেটে নিচ্ছে উবার কর্তৃপক্ষ। বাংলাদেশ ব্যাংক ও বাংলাদেশ বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (বিডা) অনুমোদন না নিয়ে উবার কর্তৃপক্ষ বাংলাদেশ থেকে অর্থ স্থানান্তর করছে। কোনো বিদেশি কম্পানি ব্যবসা করে লাভের অংশ বিদেশে নিয়ে যেতে চাইলে বাংলাদেশ ব্যাংকের অনুমতি নিতে হয় কিংবা কমপক্ষে লভ্যাংশ পাঠানোর ৩০ দিনের মধ্যে বাংলাদেশ ব্যাংককে জানাতে হয়। উবার কর্তৃপক্ষকে এ বিষয়ে বাংলাদেশ ব্যাংক কোনো অনুমতিই দেয়নি।

এ অবস্থায় সড়ক পরিবহন ও সেতু মন্ত্রণালয় উবারসহ অন্য সব কম্পানির অ্যাপভিত্তিক পরিবহনসেবার জন্য রাইড শেয়ারিং সার্ভিস নীতিমালার খসড়া চূড়ান্ত করেছে। দেখা গেছে, অর্থ স্থানান্তর বিষয়ে এই নীতিমালায় কোনো বিষয় অন্তর্ভুক্ত করা হয়নি। এশিয়ার বিভিন্ন নগরীর মধ্যে ঢাকায় সবচেয়ে বেশি হারে বিস্তৃত হচ্ছে উবারের সেবা। উবারের হিসাব মতে, মাসে গড়ে ১০ শতাংশ হারে বাড়ছে যাত্রী। উবার এক্স চালু হওয়ার পর গত ১৫ সেপ্টেম্বর চালু হয়েছে উবার প্রিমিয়ার সেবা। উবার এক্সে কিলোমিটারপ্রতি ভাড়া ১৮ টাকা। উবার প্রিমিয়ারে তা ২২ টাকা। উবার চালকদের কাছ থেকে জানা যায়, আয়ের ২৫ শতাংশ কেটে রাখে উবার কর্তৃপক্ষ, বাকি ৭৫ শতাংশ পান গাড়ির মালিক।

জানা গেছে, ব্যক্তিগত গাড়ি ভাড়ায় চালাতে দেশে কোনো বিধি-বিধান নেই। মোটরযান অধ্যাদেশ ১৯৮৩-এর ৫৩ ধারার ক্ষমতাবলে পরীক্ষামূলকভাবে এ সেবা চালু করার জন্য নীতিমালার খসড়া প্রস্তুত করা হয়েছে। ওই নীতিমালা অনুসারে, মোটরগাড়ি ছাড়াও মোটরসাইকেল, জিপ, মাইক্রোবাস ও অ্যাম্বুল্যান্স যুক্ত হতে পারবে এ সেবায়। একজন মোটরযানচালক একটি মাত্র কম্পানির অধীনে রাইড শেয়ারিং সার্ভিসের আওতায় পরিচালনার অনুমতি পাবেন। প্রত্যেক গাড়িচালকের ছবি, জাতীয় পরিচয়পত্রের কপি, বর্তমান ঠিকানা, মোবাইল ফোন নম্বর, ড্রাইভিং লাইসেন্সের কপি সেবাদানকারী প্রতিষ্ঠানে সংরক্ষণ করতে হবে। প্রণীত নীতিমালায় ১০টি অনুচ্ছেদের মধ্যে ভাড়াসংক্রান্ত অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে, রাইড শেয়ারিং সার্ভিসের আওতায় চলাচলকারী ব্যক্তিগত মোটরগাড়ির ভাড়া ‘ট্যাক্সিক্যাব সার্ভিস গাইডলাইন ২০১০’ অনুযায়ী নির্ধারিত ভাড়া থেকে বেশি হতে পারবে না।

জানা গেছে, বর্তমানে উবার এক্সে ১০ দশমিক ৪৫ কিলোমিটারে যাত্রী পরিবহনের ভাড়া ৩৭০ টাকা। একই দূরত্বে হলুদ ট্যাক্সিতে এই ভাড়া ৪০০ টাকা।

প্রণীত নীতিমালায় বলা হয়েছে, ব্যক্তিগত গাড়ি কেনার পর কমপক্ষে এক বছর ব্যবহারের পর তা রাইড শেয়ারিংয়ের অধীনে পরিচালনা করা যাবে। এর জন্য প্রথমেই নিবন্ধন করতে হবে। রাইড শেয়ারিং সেবাদানকারী প্রতিষ্ঠানের ঢাকায় কমপক্ষে ১০০, চট্টগ্রামে ৫০ এবং অন্যান্য শহরে ২০টি গাড়ি থাকতে হবে। বিআরটিএ থেকে এসব গাড়ির নিবন্ধন লাগবে। সেবাদানে আগ্রহী প্রতিষ্ঠানের কর্তৃপক্ষকে প্রতিষ্ঠান তালিকাভুক্তির জন্য এক লাখ টাকা, ট্রেড লাইসেন্স, ইটিআইএন, ভ্যাটসহ নির্দিষ্ট আবেদনপত্রে আবেদন করতে হবে। লাইসেন্সের মেয়াদ শেষ হওয়ার তিন মাস আগে নবায়নের আবেদন করতে হবে। ফি লাগবে ১০ হাজার টাকা। প্রতিটি গাড়ি ও মোটরসাইকেলের লাইসেন্স নেওয়া ও নবায়নে বছরে যথাক্রমে এক হাজার ও ৫০০ টাকা হারে ফি দিতে হবে।

খসড়া নীতিমালায় বলা হয়েছে, যাত্রীদের অভিযোগ ও জরুরি যোগাযোগের জন্য এসওএস থাকতে হবে। প্রতিটি যাত্রায় পুলিশ নিয়ন্ত্রণ কক্ষ থেকে সরাসরি যোগাযোগের ব্যবস্থা রাখতে হবে। চালক ও যাত্রীর নিরাপত্তার জন্য অ্যাপটিতে বিশেষ বিধান থাকার বাধ্যবাধকতার বিষয়টিও যোগ করা হয়েছে।

উবার ঢাকার জেনারেল ম্যানেজার অর্পিত মুন্ড্রা জানান, ২০১৭ সালে ঢাকায় উবারে একজন যাত্রী সর্বোচ্চ ৬৯৫টি ট্রিপ নিয়েছেন। মোট অতিক্রম করেন ঢাকা থেকে টোকিওর দূরত্বের সমান দূরত্ব। একজন চালক ঢাকায় মোট তিন হাজার ৩৫০টি ট্রিপ দিয়েছেন। ঢাকায় নতুন বছরের প্রাক্কালে উবার ১২ হাজারেরও বেশি ট্রিপ শেষ করেছে। ঢাকা থেকে আয়ের অর্থ পাচারের অভিযোগের বিষয়ে উবার কর্তৃপক্ষের কাছে জানতে চাইলে জবাব মিলছে না।

ব্যক্তিগত গাড়ির মালিকরা অ্যাপ ডাউনলোড করে নিবন্ধনের মাধ্যমে উবারের চালক হয়ে যেতে পারেন। ঢাকায় উবারে যখন কেউ গাড়ি ডাকেন, তখন চালক অনুরোধে সাড়া দেওয়ামাত্রই তাঁর নাম, ছবি, রেটিং, গাড়ির লাইসেন্স নম্বর যাত্রীর স্মার্টফোনে ভেসে ওঠে; চালকও যাত্রীর নাম ও রেটিং দেখতে পান। দ্রুত যোগাযোগের ফলে অ্যাপভিত্তিক পরিবহনসেবা বিস্তৃত হচ্ছে।

‘চলো’ নামের অন্য একটি প্রতিষ্ঠান ভাড়া গাড়ির জন্য তাদের সেবা চালু করেছে। রয়েছে কলসেন্টার। চলোর প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা দেওয়ান শুভ বলেন, নীতিমালায় যাত্রী নিরাপত্তার বিষয়ে নয়, লাইসেন্সের বিষয়ে বেশি জোর দেওয়া হয়েছে। এটি তাই অপূর্ণাঙ্গ। লভ্যাংশ বিদেশে পাচার নিয়ে সরকারি নীতিমালায় কোনো অনুচ্ছেদ নেই।

এ বিষয়ে সড়ক পরিবহন ও সেতু মন্ত্রণালয়ের নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক কর্মকর্তা জানান, অর্থ মন্ত্রণালয় বিষয়টি দেখতে পারে। আমেরিকাভিত্তিক ডাটা ভক্সেল ইনকরপোরেটের সহযোগিতায় ডাটা ভক্সেল লিমিটেড ঢাকায় অ্যাপভিত্তিক মোটরসাইকেলসেবা দিচ্ছে ২০১৬ সালের ২১ নভেম্বর থেকে। এভাবে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের সেবা চলছে।



মন্তব্য