kalerkantho


শীতে জবুথবু উত্তরের লাখ লাখ মানুষ

♦ কুড়িগ্রামে দুই দিনে তিন শিশুর মৃত্যু
♦ শাহজালালে বিমান ওঠানামা বন্ধ ৭ ঘণ্টা

কালের কণ্ঠ ডেস্ক   

৬ জানুয়ারি, ২০১৮ ০০:০০



শীতে জবুথবু উত্তরের লাখ লাখ মানুষ

রংপুর অঞ্চলে জেঁকে বসেছে শীত। প্রয়োজনের তাগিদে বাড়ি থেকে বের হচ্ছে মানুষ। গতকাল তারাগঞ্জ উপজেলার ইকোরচালী এলাকা থেকে তোলা ছবি। ছবি : কালের কণ্ঠ

উত্তরাঞ্চলে তীব্র শীত জেঁকে বসেছে। শীতে কষ্ট পাচ্ছে শ্রমজীবী ও নিম্ন আয়ের মানুষ। কাজ ছাড়া বাসা-বাড়ি থেকে বের হচ্ছে না মানুষ। এর মধ্যে তীব্র কুয়াশায় দিনভর ঢাকা থাকছে আকাশ। কোথাও দিনে একবারও সূর্যের দেখা পাওয়া যায়নি। শীতজনিত রোগে আক্রান্ত হচ্ছে মানুষ। বিশেষ করে শিশু ও বৃদ্ধরা শীতজনিত রোগে বেশি আক্রান্ত হচ্ছে। কুড়িগ্রামে শীতজনিত রোগে দুই দিনে তিন শিশু মারা গেছে। ঘন কুয়াশার কারণে অন্যতম ব্যস্ত নৌরুট আরিচা-দৌলতদিয়ায় ফেরি পারাপার বিঘ্নিত হচ্ছে। এতে দেখা দিচ্ছে তীব্র যানজট। ঘন কুয়াশার কারণে গতকাল শুক্রবার সাড়ে সাত ঘণ্টা আন্তর্জাতিক বিমান ওঠানামা বন্ধ রাখতে হয়েছে। বাসস, নিজস্ব প্রতিবেদক ও প্রতিনিধিদের পাঠানো খবর :

বাসস জানায়, বাংলাদেশ বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষের মুখপাত্র এ কে এম রেজাউল করিম জানিয়েছেন, ঘন কুয়াশার কারণে বৃহস্পতিবার দিবাগত রাত ২টা ৪৫ মিনিট থেকে গতকাল শুক্রবার সকাল ১০টা ১১ মিনিট পর্যন্ত কর্তৃপক্ষ বিমান ওঠানামা বাতিল করতে বাধ্য হয়। তিনি বলেন, এ সময় শারজাহ থেকে এয়ার এরাবিয়ার দুটি এবং বাংলাদেশ বিমানের একটি আন্তর্জাতিক ফ্লাইটকে শাহজালালে অবতরণ করতে না দিয়ে কলকাতায় পাঠানো হয়েছে। এ ছাড়া দুবাই থেকে আগত বাংলাদেশ বিমানের একটি এবং কুয়ালালামপুর থেকে আগত ইউএস বাংলা এয়ারলাইনসের একটি ফ্লাইটকে চট্টগ্রামে পাঠানো হয়। কুয়ালালামপুর থেকে আগত ইউএস বাংলা এয়ারলাইনসের আরো একটি ফ্লাইটকে মিয়ানমারে মান্দালয়ে পাঠানো হয়। বিমান চলাচল বাতিল করার কারণে বাংলাদেশ বিমানের একটি ফ্লাইট কলকাতা ও রিজেন্ট এয়ারওয়েজের একটি ফ্লাইট ব্যাংকক যেতে বিলম্ব হয়। আন্তর্জাতিক ফ্লাইট ছাড়াও নভো এয়ারের চারটি, ইউএস বাংলার তিনটি, বাংলাদেশ বিমানের দুটি ও রিজেন্ট এয়ারওয়েজের একটি অভ্যন্তরীণ ফ্লাইট বিলম্বে চলাচল করে।

কুড়িগ্রাম : কুড়িগ্রামে শৈত্যপ্রবাহে জনজীবন বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে। গতকাল সকালে এ জেলার সর্বনিম্ন তাপমাত্রা রেকর্ড করা হয়েছে ৯.৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস। বৃহস্পতিবার ছিল ৮.৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস। শীতজনিত রোগে আক্রান্ত হয়ে দুই দিনে তিনটি শিশু মারা গেছে।

মৃতদের মধ্যে রাজারহাটের মীম (দেড় বছর) ডায়রিয়ায় আক্রান্ত হলে তার বাবা বুলবুল বৃহস্পতিবার রাজারহাট উপজেলা থেকে কুড়িগ্রাম হাসপাতালে এনে ভর্তি করান। আক্রান্ত শিশুটি আধাঘণ্টা পর মারা যায়। একই দিন রাজারহাটের চতুর্ভুজ গ্রামের দুলালী (২১ দিন) নিউমোনিয়ায় আক্রান্ত হয়ে মারা যায়। এ ছাড়া কুড়িগ্রাম পৌর এলাকার নয়নমনি নামের এক দিনের এক শিশু শুক্রবার সদর হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যায়। কুড়িগ্রাম সদর হাসপাতালের ভারপ্রাপ্ত আবাসিক মেডিক্যাল অফিসার ডা. মো. জাহাঙ্গীর আলম জানান, শীতে নয়, সে কম ওজন নিয়ে জন্মের (লো বার্থ ওয়েট) কারণে মারা যায়। তিনি জানান, শুক্রবার সদর হাসপাতালে শিশু ওয়ার্ডে শীতজনিত রোগে ৩৯ জন ভর্তি হয়েছে।

এদিকে কনকনে ঠাণ্ডা আর হিমেল হাওয়ায় খুব প্রয়োজন ছাড়া ঘর হতে বের হচ্ছে না মানুষ। গরম কাপড়ের অভাবে শীতে কষ্টে ভুগছে শিশু, বৃদ্ধসহ নিম্ন আয়ের কর্মজীবী মানুষ। সন্ধ্যা থেকে দুপুর পর্যন্ত ঘন কুয়াশায় ঢেকে থাকছে পুরো জনপদ। দিনের বেশির ভাগ সময় সূর্য়ের দেখা না মেলায় তাপমাত্রা নিম্নগামী হচ্ছে। এ অবস্থায় শীতকাতর মানুষ খড়-কুটো জ্বালিয়ে শীত নিবারণের চেষ্টা করছে। বিশেষ করে ব্রহ্মপুত্র, ধরলা, তিস্তাসহ ১৬টি নদ-নদীর অববাহিকায় ৪২০টি চরের মানুষ গরম কাপড়ের অভাবে তীব্র শীতে ভুগছে। এমতাবস্থায় কাজে বের হতে পারছে না শ্রমজীবী মানুষ।

কুড়িগ্রামের কৃষি আবহাওয়া পর্যবেক্ষণ অফিসের পর্যবেক্ষক মোফাখারুল ইসলাম জানান, শুক্রবার জেলায় সর্বনিম্ন তাপমাত্রা রেকর্ড করা হয়েছে ৯.৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস।

রংপুর : ‘কাম (কাজ) না করলে তো প্যাটোত (পেটে) ভাত যায় না। কঠিন ঠাণ্ডায় সারা দিন থরথর করি গাও কাঁপে। ইয়াতে কতক্ষণ কাম করা যায়!’ ঘন কুয়াশা উপেক্ষা করে কাদাপানিতে বোরো ধানের চারা রোপণকালে এমন কথা বলেন রংপুর নগরীর চব্বিশ হাজারী এলাকার হোসেন আলী। শুধু তিনিই নন, ঘন কুয়াশাসহ তীব্র শীত জেঁকে বসায় রংপুরের সর্বত্র শ্রমজীবী মানুষের দুর্ভোগ চরম আকার ধারণ করেছে। বিশেষ করে কৃষি শ্রমিকরা পড়েছে বেকায়দায়।

কনকনে হাওয়া ও শৈত্যপ্রবাহে তিন দিন ধরে তীব্র শীত জেঁকে বসেছে রংপুরসহ উত্তরের জেলাগুলোতে। সকাল থেকে সারা দিন প্রকৃতি ঢাকা থাকছে ঘন কুয়াশার চাদরে।

গতকাল শুক্রবার সকাল থেকে সারা দিন সূর্যের মুখ দেখা যায়নি। সকাল থেকে সারা দিনে বিভিন্ন সড়কে চলাচলকারী যানবাহনগুলোকে হেডলাইট জ্বালিয়ে চলাচল করতে দেখা গেছে। দিনের বেলায়ও কোনো কোনো এলাকায় আগুন জ্বালিয়ে শীত নিবারণ করতে দেখা গেছে নিম্ন আয়ের মানুষকে। সন্ধ্যার পরপরই শহর ও গ্রামের হাটবাজারের দোকানপাট বন্ধ হয়ে যায়। তীব্র শীতের কারণে শিশু ও বয়স্কদের মধ্যে ডায়রিয়া, নিউমোনিয়া, সর্দি-জ্বরের প্রকোপ বেড়েছে। আক্রান্তরা চিকিৎসা নিতে ভিড় করছে স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সগুলোতে।

পঞ্চগড় : গত কয়েক দিনের শৈত্যপ্রবাহ আর উত্তর থেকে ধেয়ে আসা ঠাণ্ডা বাতাসে পঞ্চগড়ে শীত জেঁকে বসেছে। ঘন কুয়াশার সঙ্গে ঠাণ্ডা বাতাসে জনজীবন বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে। শীত নিবারণে প্রয়োজনীয় বস্ত্রের অভাবে দুর্ভোগে পড়েছে নিম্ন আয়ের মানুষ। গতকাল পঞ্চগড়ে সর্বনিম্ন তাপমাত্রা ছিল ৮.৯ ডিগ্রি সেলসিয়াস।

গত বুধবার থেকে পঞ্চগড়ে পাল্লা দিয়ে বাড়ছে শীতের প্রকোপ। সন্ধ্যা হওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই হিমেল হাওয়া আর ঘন কুয়াশায় আচ্ছন্ন হয়ে পড়ছে চারদিক। মধ্যরাতে তাপমাত্রা আরো কমে যাচ্ছে। বর্তমানে জেলার তাপমাত্রা সর্বনিম্ন ১০ ডিগ্রি সেলসিয়াসের নিচে নেমে এসেছে। ঘন কুয়াশা চলে সকাল ১০টা থেকে ১১টা পর্যন্ত। দুপুরে সূর্যের দেখা মিললেও তাতে নেই উত্তাপ। প্রশাসনের পক্ষ থেকে সরকারের পাশাপাশি দরিদ্র শীতার্তদের পাশে বিত্তবানদের এগিয়ে আসার আহ্বান জানানো হয়েছে।

চুয়াডাঙ্গা : গতকালও চুয়াডাঙ্গায় ছিল তীব্র শীত। গত বুধ ও বৃহস্পতিবার চুয়াডাঙ্গায় ছিল দেশের সর্বনিম্ন তাপমাত্রা। বৃহস্পতিবার এ মৌসুমের সর্বনিম্ন তাপমাত্রা ছিল চুয়াডাঙ্গায় ৬.৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস। শুক্রবার তাপমাত্রা কিছুটা বেড়ে দাঁড়ায় ৮ ডিগ্রিতে।

শীতের সঙ্গে সঙ্গে দেখা দিয়েছে ঘন কুয়াশা। ঘন কুয়াশার কারণে বোরো ধানের বীজতলার ক্ষতি হওয়ার আশঙ্কা আছে। এ ব্যাপারে চুয়াডাঙ্গা সদর উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা তালহা জুবাইর মাসরুর জানান, বীজতলায় জমে থাকা শিশির ফেলে দেওয়ার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে কৃষকদের।

গোয়ালন্দ (রাজবাড়ী) : গতকাল শুক্রবার দুপরে দৌলতদিয়া ঘাটে সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, টার্মিনালের বিশাল পার্কিং ইয়ার্ড ট্রাক ও লোকাল বাসে পরিপূর্ণ হয়ে আছে। অন্যদিকে ফেরিঘাটের জিরো পয়েন্ট থেকে দৌলতদিয়া-খুলনা মহাসড়কের ইউনিয়ন বোর্ড এলাকা পর্যন্ত সাড়ে তিন কিলোমিটার ফোরলেন রাস্তার একপাশে পণ্যবাহী ট্রাক ও কাভার্ড ভ্যানের দীর্ঘ সারি।



মন্তব্য