kalerkantho


প্রদর্শনী

হাশেম খানের বিচিত্র ভুবন

নওশাদ জামিল   

৬ জানুয়ারি, ২০১৮ ০০:০০



হাশেম খানের বিচিত্র ভুবন

জাতীয় জাদুঘরে গতকাল থেকে শুরু হয়েছে শিল্পী হাশেম খানের ‘জোড়াতালির চালচিত্র’ শীর্ষক প্রদর্শনী। ছবি : কালের কণ্ঠ

বরেণ্য চিত্রশিল্পী হাশেম খান। ১৯৫৬ সাল থেকে ছবি আঁকাই তাঁর ধ্যানজ্ঞান। পেশা আর নেশাও। পাঠ্য বইয়ে অলংকরণের মধ্য দিয়ে তিনি উপস্থাপন করেছেন বাংলার রূপমাধুরীকে। বাংলার ফুল, পাখি, নিসর্গ, নদ-নদী, নীল আকাশকে তিনি এঁকে চলেছেন সারা জীবন ধরে। তিনি একই সঙ্গে চিত্রশিল্পী, প্রচ্ছদশিল্পী, বই নকশাকার, শিশু সংগঠক ও লেখক। ভাস্কর হিসেবেও রয়েছে তাঁর নামডাক। জাতীয় জাদুঘরের নলিনীকান্ত ভট্টশালী মিলনায়তনে তাঁর বহুমাত্রিক শিল্পকর্ম নিয়ে গতকাল শুক্রবার শুরু হয়েছে ভিন্নধর্মী প্রদর্শনী। ‘জোড়াতালির চালচিত্র’ শিরোনামের ২৭ দিনব্যাপী এ প্রদর্শনীতে উপস্থাপিত হয়েছে শিল্পীর ৭১টি শিল্পকর্ম।

প্রদর্শনী ঘুরে দেখা যায়, যশস্বী শিল্পী হাশেম খান কাঠ দিয়ে গড়েছেন বৈচিত্র্যময় ভাস্কর্য ও শিল্পকর্ম। এতে ফুটে উঠেছে বাংলাদেশের প্রকৃতি ও মানুষ এবং মহান মুক্তিযুদ্ধসহ দেশের গৌরবোজ্জ্বল ইতিহাস। পরিপক্ব সেগুন কাঠের গুঁড়ি দেখে এক অভূতপূর্ব শিল্পচিন্তা খেলে গেল হাশেম খানের মনে। সেই কাঠের সঙ্গে ইস্পাত নল, কাগজ আর ইচ্ছামতো নানা রঙের মিশেলে তৈরি করলেন কাঠ-চিত্র, কাঠ-ভাস্কর্য, ম্যুরাল ও চিত্র। কাঠের তক্তাকে কেটে-ছেঁটে, খোদাই ও উত্কীর্ণ করে নানা আকৃতির সমন্বয় ঘটিয়ে নতুন বৈশিষ্ট্যের শিল্পভাষায় তিনি তুলে এনেছেন বাঙালির ইতিহাস। কাঠের ভাস্কর্যে মূর্ত হয়েছে স্বাধীনতাসংগ্রামের ইতিহাস। উঠে এসেছে ছয় দফার প্রতীকী চিত্র।

জমকালো আয়োজনের মধ্য দিয়ে গতকাল সন্ধ্যায় প্রদর্শনীর উদ্বোধন করা হয়। এর আগে ছুটির দিনের সন্ধ্যায় জাদুঘরের কবি সুফিয়া কামাল মিলনায়তনে প্রদর্শনীর উদ্বোধনী অনুষ্ঠান হয়। এতে সম্মানিত অতিথি ছিলেন বাণিজ্যমন্ত্রী তোফায়েল আহমেদ ও সংস্কৃতিমন্ত্রী আসাদুজ্জামান নূর। আলোচনায় অংশ নেন শিল্পী রফিকুন নবী, বঙ্গবন্ধু চেয়ার অধ্যাপক মুনতাসীর মামুন ও বাংলা একাডেমির মহাপরিচালক অধ্যাপক শামসুজ্জামান খান। সভাপতিত্ব করেন অধ্যাপক বোরহান উদ্দিন খান জাহাঙ্গীর। স্বাগত বক্তব্য দেন হাশেম খানের সহধর্মিণী পারভীন হাশেম। অনুভূক্তি ব্যক্ত করে বক্তব্য দেন হাশেম খান।

তোফায়েল আহমেদ বলেন, ‘গত শতকের ষাটের দশক থেকেই হাশেম খানের সঙ্গে আমার পরিচয়। বাংলাদেশের শিল্প-ভুবনের তিনি এক উজ্জ্বল নক্ষত্র। চিত্রশিল্পী পরিচয়ের বাইরেও উনসত্তরের গণ-অভ্যুত্থান, মুক্তিযুদ্ধসহ বিভিন্ন স্বাধিকার আন্দোলনে তিনি রেখেছেন অগ্রণী ভূমিকা। তাই তাঁর চিত্রকর্মে খুঁজে পাওয়া যায় সেই সংগ্রামী রূপ।’

একুশে ও স্বাধীনতা পদকপ্রাপ্ত শিল্পী হাশেম খানের মূল্যায়ন করে আসাদুজ্জামান নূর বলেন,  ‘তিনি এমন একজন শিল্পী, যাঁকে আমরা পেয়েছি চারুকলার শিক্ষক হিসেবে, বাংলাদেশের প্রকাশনাজগতের বইয়ের অলংকরণে, বিশেষ করে শিশুদের পাঠ্য বইয়ের জন্য ছবি আঁকার একজন পারদর্শী ও নিষ্ঠাবান শিল্পী হিসেবে।’

হাশেম খানের নতুন আঙ্গিকের শিল্পকর্মের প্রতি মুগ্ধতা প্রকাশ করে রফিকুন নবী বলেন, ‘এই প্রদর্শনীর মাধ্যমে আমরা শিল্পী হাশেম খানকে অন্য রকমভাবে খুঁজে পেলাম। কাঠের ব্যবহারে তিনি যে ধরনের শিল্পকর্ম সৃজন করেছেন, তা অনবদ্য। ম্যুরাল, ভাস্কর্য কিংবা কাঠচিত্র—সব কিছুতেই তিনি রেখেছেন মুনশিয়ানার স্বাক্ষর।’

মুনতাসীর মামুন বলেন, ‘হাশেম খানের সঙ্গে আমার ৫০ বছরের পরিচয়। আমাদের প্রজন্মকে তিনি শিখিয়েছেন শিল্পকলা কিভাবে দেখতে হয় এবং কিভাবে শিল্পকলা বিষয়ে লিখতে হয়। শিল্পচর্চার ক্ষেত্রে অনবরত পরীক্ষা-নিরীক্ষার মাধ্যমে এগিয়েছেন এই শিল্পী। কর্মের মাঝেই তিনি মুক্তি খুঁজেছেন এবং তা পেয়েছেনও। সব মিলিয়ে ব্যক্তি হাশেম খান পরিণত হয়েছেন একটি প্রতিষ্ঠানে। আর এ প্রদর্শনীর মাধ্যমে আমরা নতুন এক হাশেম খানকে আবিষ্কার করলাম।’

হাশেম খান বলেন, ‘জোড়াতালির কাঠশিল্প ও অন্যান্য শিল্প নির্মাণে আমি সাড়ে ৯৯ শতাংশ সেগুন কাঠ ব্যবহার করেছি। সেগুনের রং, রঙের বিভিন্ন মাত্রা অর্থাৎ গাঢ়, হালকা রঙের সঙ্গে রেখার সমন্বয়ে কাঠের যে তল প্রাকৃতিক বৈশিষ্ট্যেই তৈরি হয়ে থাকে, তা আমার শিল্পচিন্তাকে আলোড়িত করেছে। কাঠের আঁশ, আঁশের রেখা, রঙের এই তারতম্যকে আমার ছবি আঁকার রং রেখার মতো ব্যবহার করেছি।

শিল্পীর ভাস্কর্যে উঠে এসেছে স্বাধীন বাংলাদেশের স্থপতি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের বীরত্বের গল্প ও বাঙালির ‘মুক্তির সনদ’ হিসেবে স্বীকৃত ছয় দফা দাবির আন্দোলনের কথা। মুক্তিযুদ্ধ, একাত্তরের ঘটনাবৃত্ত, যুদ্ধবিধ্বস্ত একটি দেশের মাথা তুলে দাঁড়ানোর ইতিহাস তুলে ধরেছেন শিল্পী।

প্রদর্শনীতে অর্ধশতাধিক ভাস্কর্যের পাশাপাশি উঠে এসেছে বেশ কিছু চিত্রকর্ম। এসব ছবিতে উঠে এসেছে বাংলার মানুষ, নিসর্গ। বাংলার নারী, শিশু আর লোকজ মোটিফে আঁকা নিত্য আসবাবের নকশা নিয়েও নিরীক্ষাধর্মী হয়েছেন শিল্পী।

বিশাল গ্যালারির মেঝে ও দেয়ালে ঠাঁই পেয়েছে কাঠ, ইস্পাত নল, কাগজ ও রঙের সমন্বয়ে গড়া শিল্পীর নতুন ধাঁচের শিল্পকর্মগুলো। সেখানে আছে ১৪টি জোড়াতালি-কাঠচিত্র, ৩১টি জোড়াতালি-কাঠ ভাস্কর্য, ১৮টি জোড়াতালি-চিত্র এবং শিল্পীর সৃজিত ম্যুরাল ও ভাস্কর্যের আটটি আলোকচিত্র। ৩১ জানুয়ারি পর্যন্ত চলবে এ প্রদর্শনী। প্রতিদিন সকাল সাড়ে ১০টা থেকে সন্ধ্যা সাড়ে ৭টা পর্যন্ত তা খোলা থাকবে। বৃহস্পতিবার সাপ্তাহিক বন্ধ।

 

রোহিঙ্গাদের নিয়ে আলোকচিত্র প্রদর্শনী

রাজধানীর জাতীয় জাদুঘরে শুরু হয়েছে ‘রোহিঙ্গা : দ্য স্টেটলেস রিফুজিস ইন বাংলাদেশ’ শিরোনামে আলোকচিত্র সাংবাদিক বায়েজীদ আকতারের একক আলোকচিত্র প্রদর্শনী। গতকাল শুক্রবার বিকেলে প্রদর্শনীর উদ্বোধন করেন অধ্যাপক ড. সৈয়দ আনোয়ার হোসেন। অনুষ্ঠানে আরো উপস্থিত ছিলেন আওয়ামী লীগের তথ্য ও গবেষণা সম্পাদক অ্যাডভোকেট আফজাল হোসেন, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের অধ্যাপক রোবায়েত ফেরদৌস। এতে স্বাগত বক্তব্য দেন জাদুঘরের শিক্ষা বিভাগের কিপার ড. শিহাব শাহরিয়ার।

প্রদর্শনীতে রোহিঙ্গাদের দৈনন্দিন জীবনের ৫১টি আলোকচিত্র স্থান পেয়েছে। দর্শকদের জন্য প্রদর্শনীটি উন্মুক্ত থাকবে আগামী ৯ জানুয়ারি পর্যন্ত।



মন্তব্য