kalerkantho


শীত বাড়ছে, উত্তরে কম্বল সংকট

নিজস্ব প্রতিবেদক   

৫ জানুয়ারি, ২০১৮ ০০:০০



শীত বাড়ছে, উত্তরে কম্বল সংকট

সিলেট অঞ্চলসহ রংপুর, রাজশাহী, ময়মনসিংহ, ঢাকা ও খুলনা বিভাগের ওপর দিয়ে মৃদু থেকে মাঝারি শৈত্যপ্রবাহ বয়ে যাচ্ছে। তা আরো কয়েক দিন বয়ে যেতে পারে এবং এসব অঞ্চলের আশপাশে বিস্তৃত হতে পারে। আবহাওয়া অধিদপ্তর সূত্রে এ পূর্বাভাস মিলেছে। প্রচণ্ড শীত হানা দিয়েছে উত্তরে। আবহাওয়া অধিদপ্তরের তথ্যানুসারে, উপমহাদেশীয় উচ্চচাপ বলয়ের বর্ধিতাংশ পশ্চিমবঙ্গ ও তত্সংলগ্ন এলাকা পর্যন্ত বিস্তৃত রয়েছে। মৌসুমের স্বাভাবিক লঘুচাপ দক্ষিণ বঙ্গোপসাগরে অবস্থান করছে। গতকাল বৃহস্পতিবার সকাল ৬টায় ঢাকায় বাতাসের আপেক্ষিক আর্দ্রতা ছিল ৮৩ শতাংশ।

গতকাল সকাল ৯টা থেকে পরবর্তী ২৪ ঘণ্টার আবহাওয়ার পূর্বাভাসে আবহাওয়া অধিদপ্তর জানিয়েছে, সারা দেশে রাতের তাপমাত্রা সামান্য কমতে পারে। দিনের তাপমাত্রা অপরিবর্তিত থাকতে পারে। এ ছাড়া অস্থায়ীভাবে আংশিক মেঘলা আকাশসহ সারা দেশের আবহাওয়া শুষ্ক থাকতে পারে। মধ্যরাত থেকে সকাল পর্যন্ত দেশের কোথাও কোথাও মাঝারি থেকে ঘন কুয়াশা পড়তে পারে।

উত্তরাঞ্চলের ১৬ জেলায় হানা দিয়েছে শীত। বইছে মৃদু শৈত্যপ্রবাহ। কনকনে শীতের কারণে কাহিল হয়ে পড়েছে প্রায় ৩০ লাখ দরিদ্র মানুষ। শীত মোকাবেলায় স্থানীয় প্রশাসনের প্রস্তুতি খুব সামান্য। পর্যাপ্ত শীতবস্ত্র না থাকায় খেটে খাওয়া মানুষের দুর্ভোগ বাড়ছে। বিশেষ করে চরাঞ্চলসহ প্রত্যন্ত এলাকার মানুষ চরম দুর্ভোগে পড়েছে। এ ছাড়া শীতজনিত রোগবালাইও বাড়ছে আশঙ্কাজনক হারে।

গত বুধবার থেকে শীতের তীব্রতা বৃদ্ধি পাওয়ায় কাহিল হয়ে পড়েছে উত্তরের জনজীবন। গতকাল রংপুরে সর্বনিম্ন তাপমাত্রা রেকর্ড করা হয়েছে ৯ ডিগ্রি সেলসিয়াস, যা এবারের শীত মৌসুমের সর্বনিম্ন তাপমাত্রা।

রংপুর আবহাওয়া দপ্তর সূত্রে জানা যায়, একটু দেরিতে হলেও চলতি সপ্তাহ থেকে এ অঞ্চলে শীত হানা দিয়েছে। অনেক স্থানে দুপুর পর্যন্ত মানুষ সূর্যের মুখ দেখছে না। কোথাও বা দেখা গেলেও তা ছিল খুব অল্প সময়ের জন্য। দু-এক দিনের মধ্যে তাপমাত্রা আরো কমবে বলে নিশ্চিত করে আবহাওয়া অফিস জানায়, একই সঙ্গে পশ্চিমা বাতাস বইবে। তখন মৃদু থেকে মাঝারি শৈতপ্রবাহ বইবে এ অঞ্চলে।

আমাদের রংপুর অফিস জানায়, শীতে অভাবী মানুষজনের জীবন বাঁচানো দায় হয়ে পড়েছে। তিস্তাপারের ধামুর এলাকার সত্তর বছরের ওমর আলী বলেন, ‘নদীপারের ঝুপড়ি ঘরোত হু হু করি বাতাস ঢোকে। ঠাণ্ডায় সারা রাইত নিন (ঘুম) ধরে না।’ একই এলাকার শহর বানু ও জাহানারা বেগম বলেন, ‘দুই দিন না খ্যায়া থাকা যায়, তয় ঠণ্ডার কষ্ট আর সওয়া যায় না।’ পৌষ মাসের মাঝামাঝি হঠাৎ করে শীতের তীব্রতা বৃদ্ধি পাওয়ায় দিশাহারা হয়ে পড়েছে চরাঞ্চলের অভাবী মানুষজন।

রংপুর নগরীর বাহাদুরসিংহ এলাকার দিনমজুর সেকেন্দার আলী বলেন, ‘থাকি থাকি এবার এমন ঠাণ্ডায় শরীল (শরীর) দুর্বল হয়া গেইছে। কাম (কাজ) করি ক্যামনে!’ ঠাণ্ডার কারণে শ্রম বিক্রি করতে না পারায় পরিবার-পরিজন নিয়ে কষ্টে আছেন বলে জানান তিনি।

এদিকে প্রচণ্ড শীতের কারণে সবচেয়ে বিপাকে পড়েছে সহায়-সম্বলহীন হতদরিদ্র লোকজন। শীতবস্ত্রের অভাবে তারা চরম দুর্ভোগে পড়েছে। শীতের কারণে কোল্ড ডায়রিয়া, নিউমোনিয়া, শ্বাসকষ্টসহ নানা রোগ ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়েছে। রংপুর মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালসহ বিভিন্ন স্বাস্থ্য কমপেক্স সূত্রে জানা গেছে, শীতজনিত কারণে আগের চেয়ে রোগীর সংখ্যা বেড়েছে। শীতজনিত রোগে আক্রান্ত সবচেয়ে বেশি শিশু ও বৃদ্ধরা।

রংপুরের সিভিল সার্জন ডা. আবু মো. জাকিরুল ইসলাম জানান, মূলত শিশুরাই শীতজনিত নানা রোগে আক্রান্ত হয়। শিশুদের গরম কাপড় পরানো এবং সকালে ও সন্ধ্যার পর তাদের ঘরের বাইরে বের না করার পরামর্শ দেন তিনি।

ত্রাণ অফিস সূত্রে জানা গেছে, প্রতিটি জেলা থেকে যে পরিমাণ শীতবস্ত্রের চাহিদা পাঠানো হয়েছিল, এর বিপরীতে বরাদ্দ এসেছে খুব সামান্য। জেলাপ্রতি গড়ে চাহিদা ছিল এক লাখ পিস শীতবস্ত্র। এর বিপরীতে সরকারিভাবে বরাদ্দ এসেছে ১৮ হাজার পিস। অন্যান্য মাধ্যমে ত্রাণ অফিসে এসেছে ২৫ থেকে ৩০ হাজার পিস। এসব শীতবস্ত্র ইতিমধ্যে বিভাগীয় কমিশনারের কার্যালয়ের মাধ্যমে বিভিন্ন উপজেলায় পাঠানো হয়েছে।

কম্বল বিতরণ : সাংবাদিক আব্দুল মজিদ-মোনাজাত উদ্দিন স্মৃতি সংসদের উদ্যোগে গতকাল রংপুরের গঙ্গাচড়ায় অসহায় দুস্থদের মাঝে কম্বল বিতরণ করা হয়েছে। চারণ সাংবাদিক মোনাজাত উদ্দিনের ২২তম মৃত্যুবার্ষিকী উপলক্ষে সংসদের আহ্বায়ক সাংবাদিক এস এম কামরুজ্জামান বাদশা গঙ্গাচড়া কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে কম্বল বিতরণ করেন।

শেরপুর প্রতিনিধি  জানান, শেরপুরের সীমান্তবর্তী পাহাড়ি এলাকার হতদরিদ্র মানুষ শীতে কাবু হয়ে পড়েছে। শহরের বিভিন্ন স্তরের ব্যবসায়ী দুপুর ১২টা পর্যন্ত রোদের দেখা না পাওয়ায় দোকানপাটও খোলেনি।

কুড়িগ্রাম প্রতিনিধি জানান, গতকাল সন্ধ্যা ও সকালে গুঁড়ি গুঁড়ি বৃষ্টির মতো পড়ছে কুয়াশা। দিনের বেশির ভাগ সময় থাকছে কুয়াশার চাদরে ঢাকা। দুপুর ১২টার আগে সূর্যের দেখা মিলছে না।  হিমশীতল ঠাণ্ডায় কাবু হয়ে পড়ছে শিশু, নারী ও বৃদ্ধরা। সকালে সর্বনিম্ন তাপমাত্রা রেকর্ড করা হয়েছে তাপমাত্রা ৮.৩ ডিগ্রি সেলসিয়াস।

চুয়াডাঙ্গা প্রতিনিধি জানান, দেশের সর্বনিম্ন তাপমাত্রা ৬.৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস রেকর্ড করা হয়েছে চুয়াডাঙ্গায়। আগের দিন বুধবারও দেশের সর্বনিম্ন তাপমাত্রা ছিল চুয়াডাঙ্গায়, ৯.৩ ডিগ্রি সেলসিয়াস। বৃহস্পতিবারের তাপমাত্রা এ মৌসুমের সর্বনিম্ন তাপমাত্রা বলে আবহাওয়া অফিস জানিয়েছে। বৃহস্পতিবার দুপুর ১২টা পর্যন্ত সূর্যের দেখা মেলেনি। এতে শীত আরো বেশি অনুভূত হয়।

নিজস্ব প্রতিবেদক, রাজশাহী জানান, রাজশাহীতে গতকাল বছরের সর্বনিম্ন তাপমাত্রা নেমে আসে। রাজশাহী আবহাওয়া অফিসের আবহাওয়া সহকারী আনোয়ারা বেগম জানান, রাজশাহীতে গত বুধবার চলতি শীত মৌসুমের মধ্যে সর্বনিম্ন তাপমাত্রা ছিল ১০.৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস। কিন্তু মাত্র এক দিনের ব্যবধানে গতকাল সকাল ৬টায় রাজশাহীতে তাপমাত্রা রেকর্ড করা হয় ৮ ডিগ্রি সেলসিয়াস। তিনি জানান, দিনের তাপমাত্রা বাড়ার সম্ভাবনা কম। রাতের তাপমাত্রা আরো কমতে পারে। আগামী এক সপ্তাহ শীতের তীব্রতা বাড়তে পারে।



মন্তব্য