kalerkantho


শিশুকে ইয়াবা চুরির অপবাদ

ব্রাহ্মণবাড়িয়া প্রতিনিধি   

৪ জানুয়ারি, ২০১৮ ০০:০০



তৃতীয় শ্রেণির ছাত্র নিলয়। ঘরে টিভি নেই। টিভি দেখতে প্রায়ই সে ছুটে যায় প্রতিবেশী আমীর হোসেনের বাড়িতে। টিভি দেখা অবস্থায় হঠাৎ একদিন তার দেহ তল্লাশি করে আমীর হোসেনের বাড়ির লোকজন। হাত শুঁকে দেখে। অভিযোগ করে নিলয় ইয়াবা চুরি করেছে। ইয়াবা ফেরত দিতে ভয়ভীতি দেখানো হয়। একদিন বাড়িতে এসেও নিলয়কে মারধর করা হয়। বাঁচাতে গিয়ে মারধরের শিকার হন নিলয়ের মা।

ঘটনাটি ব্রাহ্মণবাড়িয়ার আখাউড়া উপজেলার মোগড়া ইউনিয়নের নয়াদিল গ্রামের। নিলয় ওই গ্রামের দিনমজুর ইউসুফ মিয়ার ছেলে। অব্যাহত হুমকির মুখে ওই শিশুর পরিবার চরম নিরাপত্তাহীনতায় আছে। থানা পুলিশ, সর্দার মাতবরের কাছে ছুটে গিয়েও কোনো সুরাহা পাচ্ছে না। এ বিষয়ে থানায় লিখিত অভিযোগ দায়ের করা হয়েছে।

গতকাল বুধবার সরেজমিনে গিয়ে ও অভিযোগ সূত্রে জানা যায়, গত ২৬ ডিসেম্বর সকালে আমীর হোসেনের বাড়িতে টিভি দেখতে যায় নিলয়। আমীর হোসেনের ঘরে জুতার ভেতর থাকা ১২০ পিস ইয়াবা নিলয় চুরি করে নিয়ে গেছে বলে অভিযোগ করা হয়। ইয়াবা ফেরত দেওয়ার জন্য নিলয় ও তার পরিবারের লোকজনকে চাপ প্রয়োগ করা হয়। নিলয় ইয়াবা চুরি করেনি জানানো হলে গত ৩০ ডিসেম্বর আমীর হোসেন ও তাঁর পরিবারের লোকজনসহ আরো কয়েকজন এসে নিলয়কে মারধর করে। বিষয়টি দেখতে পেয়ে নিলয়ের মা জুলেখা বেগম এগিয়ে গেলে তাঁকেও মারধর করা হয়। ওই দিনই মা-ছেলে আখাউড়া উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে চিকিৎসা নেয়। গত ১ জানুয়ারি এ বিষয়ে নিলয়ের মা থানায় লিখিত অভিযোগ দেন। তবে থানায় গিয়ে জানতে পারেন আগেই নিলয়ের নামে টাকা চুরির অভিযোগ দেওয়া হয়েছে।

বাড়িতে গেলে নিলয় কাঁপা কাঁপা কণ্ঠে এ প্রতিবেদককে বলে, ‘আমি হেরার বাড়িত (আমীর হোসেনের বাড়িত) টিভি দেকতাম গেছিলাম। আতকা আমার সারা শরীর চেক কইরা আমার আত হুংইগা দেহে। আমারে কইছে আমি বুলে ইয়াবা ট্যাবলেট লইয়া গেছি গা। পরে একদিন বাড়িত আইয়া আমারে মারছে।’

জুলেখা বেগম বলেন, ‘আমীর হোসেন আর তাইনের বাড়ির মাইনসে আইয়া কইছে আমার পুলা বুলে জুতার বিতর তেইক্কা ইয়াবা ট্যাবলেট চুরি করছে। আমার পুলারে আমি জিগাইলে হে না করছে। কিন্তু হেরা খালি ডর দেহায়। ট্যাবলেট ফিরত না দিলে সমস্যা অইব কয়। একদিন নিলয় আর আমারে মারছে। থানায় গিয়া শুনি আমার পুলার নামে সাদেক দারোগার কাছে টেহা চুরির মামলা দিয়া রাকছে। ওসি সাব আমরার কথা শুইন্না ওই দারোগারে বকাবকি করছে। কইছে এলাকাত গিয়া বালা কইরা খোঁজ নিত।’

নিলয়ের বাবা ইউসুফ মিয়া জানান, থানায় অভিযোগ দেওয়ার পর গত মঙ্গলবার পুলিশ আসে। পুলিশের সামনেই তাঁকে ধাওয়া করে আমীর হোসেন ও তাঁর লোকজন। এখন তিনি চরম নিরাপত্তাহীনতার মধ্যে আছেন।

প্রতিবেশী নজরুল ইসলাম বলেন, ‘ঘটনার দিন মারধরের শিকার হয়ে জুলেখা আমার বাড়িতে যায়। পরে আমি ঘটনা জানতে পারি। ইয়াবা চুরি করেছে অভিযোগ তুলে ছোট্ট শিশুকেও মারধর করা হয়। বাড়ির সবাইকে এখন হুমকি দেওয়া হচ্ছে।’ এলাকার চৌকিদার চন্দু মিয়া বলেন, ‘নিলয়ের মা ঘটনাটি স্থানীয় ইউপি চেয়ারম্যানকে অবহিত করে। চেয়ারম্যানের কথামতো আমীরকে নিয়ে ওনার সামনে হাজির করি। বিষয়টি মীমাংসা করা হবে বলা হলেও পরে শুনি দুই পক্ষই থানায় অভিযোগ দিয়েছে।’

নয়াদিলের মসজিদে কুবার সাধারণ সম্পাদক আব্দুর রউফ বলেন, ‘মাদক বিক্রি করে বলে আমীরকে আমরা বেশ কয়েকবার পুলিশের কাছে ধরিয়ে দেই। শুনেছি সে নাকি ইয়াবা চুরির কথা বলে এক শিশু ও তার মাকে মারধর করেছে।’

নয়াদিল গ্রামের ফুল মিয়ার ছেলে আমীর মিয়া অবশ্য এ অভিযোগ অস্বীকার করেন। বাড়িতে গিয়ে পাওয়া না গেলেও পরে মোবাইল ফোনে তিনি বলেন, ‘আমার ঘর থেকে ওই ছেলেটা ২০ হাজার টাকা নিয়ে গেছে। সে ঘর থেকে যাওয়ার পর টাকাটা খোঁজ করে পাওয়া যায়নি।’

আখাউড়া থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. মোশারফ হোসেন তরফদার গতকাল বুধবার বিকেলে জানান, কারো অভিযোগই মামলা হিসেবে নথিভুক্ত হয়নি। তবে শিশুটিকে মারধরের বিষয়টির তদন্ত চলছে। মাদক বিক্রির অভিযোগে আমীর হোসেনকে একাধিকবার গ্রেপ্তার করা হয় বলে জানান তিনি।



মন্তব্য