kalerkantho


মানসিক স্বাস্থ্য আইনের খসড়া

ইচ্ছাকৃতভাবে মানসিক রোগী সাজালে জেল

আশরাফুল হক   

৩ জানুয়ারি, ২০১৮ ০০:০০



ইচ্ছাকৃতভাবে মানসিক রোগী সাজালে জেল

সম্পত্তি দখলের উদ্দেশ্যে কাউকে মানসিক রোগী সাজানো হলে অপরাধীর শাস্তির বিধান রেখে ‘মানসিক স্বাস্থ্য আইন, ২০১৭’-এর খসড়া করা হয়েছে। খসড়ায় মানসিক রোগী সম্পত্তি রক্ষণাবেক্ষণে অক্ষম হলে তার সম্পত্তি তদারকির জন্য সরকার ব্যবস্থাপক নিয়োগ করতে পারবে। প্রতি জেলায় মানসিক স্বাস্থ্য আদালত স্থাপনের বিধানও রয়েছে। খসড়াটি আজ বুধবার অনুমোদনের জন্য মন্ত্রিসভা বৈঠকে উপস্থাপন করা হবে। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সভাপতিত্বে তাঁর তেজগাঁওয়ের কার্যালয়ে এই বৈঠক অনুষ্ঠিত হবে।

স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের স্বাস্থ্যসেবা বিভাগের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, বিশ্বস্বাস্থ্য সংস্থার সমীক্ষা অনুযায়ী বাংলাদেশে প্রাপ্তবয়স্ক মোট জনসংখ্যার ১৬ শতাংশ মানসিক রোগী। আর ১৮ বছরের নিচে যাদের বয়স তাদের মধ্যে মানসিক রোগীর সংখ্যা ১৮ শতাংশের বেশি। অর্থাৎ শিশুরাই বেশি মানসিক সমস্যায় ভুগছে।

খসড়ায় জেলা প্রশাসকের (ডিসি) নেতৃত্বে মানসিক স্বাস্থ্য রিভিউ ও মনিটরিং কমিটি গঠনের প্রস্তাব করা হয়েছে। মানসিকভাবে অসুস্থ ব্যক্তির দীর্ঘমেয়াদি চিকিৎসার বিষয়ে কোনো অভিভাবক সন্তুষ্ট না হলে প্রতিকারের জন্য এই কমিটির কাছে আবেদন করতে পারবে। ৩০ দিনের মধ্যে কমিটি সেই আবেদন নিষ্পত্তি করবে। কমিটির আদেশ পছন্দ না হলে মানসিক স্বাস্থ্যবিষয়ক আদালতে আপিল করা যাবে।

এদিকে জেলা প্রশাসকদের এই কমিটির প্রধান করার প্রস্তাবে বিস্ময় প্রকাশ করেছেন স্বাস্থ্যসেবা-সংশ্লিষ্টরা। তাঁদের মতে, জেলাপর্যায়ে ডিসি অসংখ্য কমিটির প্রধান। তাঁর পক্ষে অনেক সময় এসব কমিটির বৈঠকই নিয়মিত করা সম্ভব হয় না। ডিসিদের নেতৃত্বে এ ধরনের কমিটি হলে সেটিও প্রয়োজনমাফিক কাজ করতে পারবে না। বরং এই কমিটির প্রধান হওয়া উচিত জেলা সিভিল সার্জনের। অথচ কমিটিতে সিভিল সার্জনের অংশগ্রহণ ঐচ্ছিক। তিনি ইচ্ছা করলে এই কমিটির সদস্যসচিব হতে পারবেন। আবার এই বিষয়সংশ্লিষ্ট অন্য কোনো চিকিৎসককেও এ পদে মনোনীত করতে পারবেন। তবে ডিসিকে প্রধান করায় সিভিল সার্জনরা নিজে কমিটির সদস্যসচিব না হয়ে অন্য চিকিৎসককেই মনোনীত করবেন এটা ধরে নেওয়া যায়।

অনেক সময় পারিবারিক সম্পত্তি দখলের উদ্দেশ্যে জোর করে পরিবারের সদস্যদের মানসিক রোগী সাজানো হয়। খসড়ায় এর প্রতিকারের বিধান রাখা হয়েছে। বলা হয়েছে, মানসিক অসুস্থতায় আক্রান্ত ব্যক্তি তাঁর সম্পত্তি রক্ষণাবেক্ষণে অক্ষম হলে আদালত একজন উপযুক্ত ব্যক্তিকে ব্যবস্থাপক নিয়োগ করতে পারবেন। এই ব্যবস্থাপকের মেয়াদ হবে তিন বছর। ব্যবস্থাপক দায়িত্ব নেওয়ার ছয় মাসের মধ্যে অসুস্থ ব্যক্তির স্থাবর-অস্থাবর সম্পত্তির তালিকা করবেন। তিনি মানসিক রোগীর পক্ষে তাঁর সম্পত্তি গ্রহণ, ব্যবস্থাপনা, নিয়ন্ত্রণ, ব্যবসা-বাণিজ্য পরিচালনা ও অংশীদারি কারবারের অবসান ঘটাবেন। তবে ব্যবস্থাপক আদালতের অনুমতি ছাড়া রোগীর সম্পত্তি বিক্রি বা ভাড়া দিতে পারবেন না। পাঁচ বছরের বেশি সময়ের জন্য কোনো সম্পত্তি লিজও দিতে পারবেন না। ব্যবস্থাপক রোগীর চিকিৎসা ব্যয় ছাড়া তাঁর সম্পত্তির অবশিষ্ট অর্থ সরকারি হিসাবে জমা করবেন। অভিভাবক ও ব্যবস্থাপক আদালত নির্ধারিত হারে পারিশ্রমিক পাবেন। আদালত ইচ্ছা করলে রোগীর ব্যবস্থাপকের মেয়াদ বাড়াতে পারবেন। মানসিক অসুস্থতায় আক্রান্ত কোনো ব্যক্তির অভিভাবক বা আত্মীয় রোগীর মানসিক অবস্থা তদন্তের জন্য আদালতে আবেদন করতে পারবেন। সে ক্ষেত্রে আদালত বিচার বিভাগীয় তদন্তের ব্যবস্থা করবেন।

প্রতিটি জেলায় জেলা জজের অধীন মানসিক স্বাস্থ্যবিষয়ক আদালত প্রতিষ্ঠা করতে পারবে সরকার। আইনের অধীন অপরাধ আমলযোগ্য ও আপস অযোগ্য। তবে অপরাধগুলোকে জামিনযোগ্য রাখা হয়েছে।

কোনো ব্যক্তি লাইসেন্স ছাড়া মানসিক হাসপাতাল পরিচালনা করলে পাঁচ লাখ টাকা জরিমানা এবং তিন বছরের সশ্রম কারাদণ্ড বা উভয় দণ্ডে দণ্ডিত হতে পারেন। একই অপরাধের পুনরাবৃত্তি হলে জরিমানা ও অর্থদণ্ড দুই-ই বাড়বে। মানসিক রোগীকে দিয়ে অপরাধ করালে প্ররোচনাকারী ব্যক্তির পাঁচ লাখ টাকা জরিমানা বা দুই বছরের সশ্রম কারাদণ্ড অথবা উভয় দণ্ড হবে। পরিবারের সদস্যরা রোগীর সম্পত্তি চিহ্নিত করতে অসহযোগিতা করলে পাঁচ লাখ টাকা জরিমানা বা তিন বছরের সশ্রম কারাদণ্ড অথবা উভয় দণ্ডে দণ্ডিত হবেন।

ইতিমধ্যে স্থাপিত সব বেসরকারি হাসপাতালকে আইন করার ৯০ দিনের মধ্যে লাইসেন্স নিতে হবে। হাসপাতালে চিকিৎসার জন্য অভিভাবক বা আত্মীয়দের আবেদন করতে হবে। আবেদন প্রাপ্তির ২৪ ঘণ্টার মধ্যে দায়িত্বপ্রাপ্ত মেডিক্যাল অফিসার রোগীর মানসিক স্বাস্থ্য পরীক্ষা করে ভর্তির সিদ্ধান্ত দেবেন। স্বেচ্ছায় ভর্তিকৃত রোগী চিকিৎসা প্রত্যাখ্যানের ইচ্ছা প্রকাশ করতে পারবেন। তবে অনিচ্ছাকৃত ভর্তির ক্ষেত্রে রোগী চিকিৎসা প্রত্যাখ্যান করতে পারবেন না।

চিকিৎসা নিতে অনিচ্ছাকৃত রোগী ভর্তির প্রক্রিয়াও খসড়া আইনে উল্লেখ করা হয়েছে। রোগীর আত্মীয় বা অভিভাবক স্থানীয় পুলিশ বা মেডিক্যাল অফিসারের কাছে আবেদন করবেন। মেডিক্যাল অফিসারের সুপারিশে ৭২ ঘণ্টার জন্য রোগী ভর্তি হতে পারবে। মানসিক রোগ বিশেষজ্ঞের সুপারিশ থাকলে ২৮ দিন চিকিৎসা দেওয়া যাবে। মানসিক স্বাস্থ্য রিভিউ ও মনিটরিং কমিটির সুপারিশে ৬০ দিনের জন্য ভর্তি করা হবে। রিভিউ কমিটি সুপারিশ করলে প্রয়োজনে রোগীর চিকিৎসা নেওয়ার সময় বাড়তে পারে।

আজকের মন্ত্রিসভা বৈঠকে মানসিক স্বাস্থ্য আইন ছাড়াও মন্ত্রীদের বিদেশে বিভিন্ন সভা-সেমিনারে অংশগ্রহণ ও চুক্তি স্বাক্ষর-সংক্রান্ত বিষয়ে ১২টি অবহিতকরণের বিষয় রয়েছে।



মন্তব্য