kalerkantho


কারওয়ান বাজার রেললাইন বস্তির ৫০ ঘর ভস্মীভূত

খোলা আকাশের নিচে নারী শিশু ত্রুটিপূর্ণ বৈদ্যুতিক খুঁটি থেকে আগুন!

নিজস্ব প্রতিবদক   

২ জানুয়ারি, ২০১৮ ০০:০০




কারওয়ান বাজার রেললাইন বস্তির ৫০ ঘর ভস্মীভূত

গতকাল দুপুরে রাজধানীর কারওয়ান বাজার রেললাইনের পাশের বস্তিতে আগু লেগে পুড়ে যায় বেশ কয়েকটি বসতঘর। পোড়া ঘরের পাশে দাঁঁড়িয়ে কান্নায় ভেঙে পড়েন ভূক্তভোগী এক নারী। ছবি : কালের কণ্ঠ

ভরদুপুরে যখন সবাই রান্নার আয়োজন কিংবা খাওয়াদাওয়ার আয়োজন নিয়ে ব্যস্ত তখন আগুন লাগে রাজধানীর কারওয়ান বাজার সংলগ্ন রেললাইন বস্তিতে। মুহূর্তেই ছড়িয়ে পড়া আগুনে আতঙ্কগ্রস্ত হয়ে দিগ্বিদিক ছুটতে শুরু করে বস্তির লোকজন। খবর পেয়ে ঘটনাস্থলে যায় ফায়ার সার্ভিসের ১০টি ইউনিট। গতকাল সোমবার দুপুর ১টার দিকে যখন আগুন নিয়ন্ত্রণে আসে, ততক্ষণে পুড়ে ছাই বস্তির অর্ধশতাধিক ঘর।

তবে আগুনে কেউ মারা যায়নি। আগুন লাগার কারণ সম্পর্কে ফায়ার সার্ভিস কিছু বলতে না পারলেও বাস্তিবাসীর দাবি, ‘কেউ পরিকল্পিতভাবে আগুন লাগাতে পারে।’ কারো কারো ধারণা, স্থানীয় লোকজনের কেউ আগুন ধরিয়ে দিতে পারে। তবে পুলিশের কাছে তথ্য রয়েছে, বস্তির একটি ঘর থেকে আগুনের সূত্রপাত হয়। 

ঘটনাস্থল পরিদর্শনকারী ফায়ার সার্ভিসের স্টেশন অফিসার ফয়সালুর রহমান বলেন, দুপুর ১২টা ২৫ মিনিটের দিকে আগুন লাগে। সোয়া ১টার দিকে আগুন নিয়ন্ত্রণে আসে। তবে আগুন লাগার কারণ এখনো জানা যায়নি।

ঘটনাস্থলে গিয়ে একাধিক বস্তিবাসীর সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, দুপুর সাড়ে ১২টার দিকে বস্তির একটি ঘর থেকে আগুন লেগেছিল। আগুন লাগার কারণ সম্পর্কে বস্তির লোকজনের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, বস্তির বাসিন্দা কাজলি বেগম নামের এক মহিলার ঘর থেকে আগুনের সূত্রপাত। এ সময় ওই ঘরে ছিল একটি গ্যাস সিলিন্ডার। আগুন গ্যাস সিলিন্ডারে লেগে দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে। বাঁশ, কাঠ, আর পলিথিনে মোড়ানো টিনের তৈরি ঘরগুলো দ্রুত পুড়ে যায়। 

সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, আগুনে ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারের নারী, শিশু, বৃদ্ধাসহ শতাধিক লোক এখন খোলা আকাশের নিচে। গতকাল বিকেল পর্যন্ত তাদের পাশে কেউ দাঁড়ায়নি বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে। 

তেজগাঁও শিল্পাঞ্চল থানার ওসি আব্দুর রশিদ বলেন, আগুন লাগার খবর পেয়ে পুলিশের দুটি টিম দ্রুত সেখানে যায়। এ সময় এলাকায় আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছিল। ট্রেনে চলাচলেও সাময়িক সমস্যা দেখা দেয়। তবে আগুনে হতাহতের কোনো খবর পাওয়া যায়নি।

বস্তির ভেতরে মাইনুদ্দিন নামে একজনের একটি মুদি দোকান ছিল। আগুনে তাঁর দোকানের প্রায় আড়াই লাখ টাকার মালামাল পুড়ে যাওয়ার দাবি করেন মাইনুদ্দিন। এই দোকান থেকে যা আয় হতো, তা দিয়ে তিনি সংসার চালাতেন। এখন তিনি নিঃস্ব।

মাইনুদ্দিন বলেন, অন্তত ১৫ বছর ধরে তিনি এই বস্তিতে বসবাস করেন। এর আগে আরো একবার আগুন লেগেছিল। তবে ঘর পুড়েছিল কম। এবার আগুনে সব পুড়ে গেছে। তাঁর পাশেই দাঁড়িয়ে অশ্রুসিক্ত সুরাইয়া বেগম। তিনি দাবি করেন, আগুনে তাঁর পরিবারের আটটি ঘর পুড়েছে। এর মধ্যে তাঁর একটি ঘরসহ ছেলে, মেয়ে ও নিকট স্বজনদের ঘর রয়েছে। রাশিদা দাবি করেন, আগুন বস্তির কাজলি নামে এক মহিলার ঘর থেকেই লেগেছে। তখন কাজলি ঘরে ঘুমাচ্ছিলেন। তাঁর পাশের ঘর থেকে বের হয়ে সবুজ নামের এক যুবক চিৎকার করতে থাকেন। তিনি বলেন, ‘কাজলি এক কাপড়ে বের হয়ে কোনোমত জানডা নিয়া সরবার পারছে।’ 

বস্তির পোড়া ঘরের কাছে মাথায় হাত দিয়ে বসে আছেন শুক্কুর আলী ও তাঁর স্ত্রী। পরিচয় দিয়ে কথা বলতে চাইলে শুক্কুর আলী বলেন, ‘আমি ট্রাকচালক। রাতে ডিউটি কইরা ক্লান্ত ছিলাম। সকালে ঘুম থেইক্যা উঠতে দেরি হয়, পাশেই ঘুমিয়ে ছিল দুই শিশুসন্তান। আগুনের চিৎকার হুনে স্ত্রী, সন্তানদের নিয়ে বের হই। আগুনে আমার সব পুড়ে গেছে।’

মজিবর রহমান কারওয়ান বাজারে কুলির কাজ করেন। তিনি বলেন, ‘আগুনে আমার ঘরের সব পুড়ে গেছে। নগদ টাকা, টেলিভিশন, এমনকি মোবাইলটাও পুইড়া যায়।’

প্রত্যক্ষদর্শী দুলালী বেগম বলেন, তিনি গার্মেন্টে কাজ করেন। আগুনের সময় তিনি বস্তির সামনের রেললাইনে বসা ছিলেন। হঠাৎ আগুন দেখে তিনি হাতের কাছে থাকা বালতি দিয়ে আগুন নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা করেন। কিন্তু গ্যাস সিলিন্ডারের কারণে আগুন দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে দাবি করে তিনি বলেন, বস্তির ভেতরে একটি সরু রাস্তা দিয়ে সবাই যাওয়া-আসা করে। এই রাস্তার পাশে একটি বিদ্যুতের খুঁটি আছে। বিদ্যুতের লাইন ত্রুটিপূর্ণ ছিল। বিদ্যুতের তার থেকে আগুন লেগে বস্তির ঘরে ধরে যায়। এরপর আগুন গ্যাস সিলিন্ডারে ছড়িয়ে পড়ে। বস্তির অনেক ঘরেই গ্যাস সিলিন্ডার ছিল। এ কারণে আগুন দ্রুত ছড়িয়ে পড়লে ব্যাপক আকার ধারণ করে।

গতকাল বিকেলে বস্তিটিতে গিয়ে দেখা যায়, পুড়ে যাওয়া ঘরের ছাই সরিয়ে ফের বসবাসের জায়গা করছে বস্তিবাসী। নারী, শিশুসহ ক্ষতিগ্রস্ত লোকজন ত্রাণের জন্য অপেক্ষায়। শীতের মধ্যে সব হারিয়ে তারা এখন খোলা আকাশের নিচে।



মন্তব্য