kalerkantho


বছরজুড়েই নজর থাকবে নির্বাচনে

কাজী হাফিজ   

১ জানুয়ারি, ২০১৮ ০০:০০



নতুন বছর ২০১৮ হতে যাচ্ছে নির্বাচনের বছর। বছরের শুরুতে আগামী সপ্তাহে ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের (ডিএনসিসি) মেয়র পদে এবং  সেই সঙ্গে ডিএনসিসি ও ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনে (ডিএসসিসি) সম্প্রতি যুক্ত হওয়া ১৮টি করে মোট ৩৬টি ওয়ার্ডের সাধারণ ও নারীদের জন্য সংরক্ষিত ১২টি কাউন্সিলর পদে নির্বাচনের তফসিল ঘোষণা হতে যাচ্ছে। এ নির্বাচনের ভোটগ্রহণ হতে পারে ফেব্রুয়ারির ২৫ থেকে ২৭ তারিখের মধ্যে।

এরপর আগামী এপ্রিল অথবা মে মাসে রাজশাহী, খুলনা, সিলেট, বরিশাল ও গাজীপুর সিটি করপোরেশনের নির্বাচন অনুষ্ঠানের প্রস্তুতি চলছে। নির্বাচন কমিশন বর্ষা মৌসুম শুরু হওয়ার আগেই এই পাঁচ সিটির নির্বাচন সম্পন্ন করতে চায়। ময়মনসিংহে নতুন সিটি করপোরেশন গঠন এবং নির্বাচনেরও সম্ভাবনা রয়েছে। এরপর একাদশ জাতীয়

সংসদ নির্বাচন। দশম সংসদের প্রথম অধিবেশন বসে ২০১৪ সালের ২৯ জানুয়ারি। এ কারণে ২০১৯ সালের জানুয়ারি মাসের ২৮ তারিখের মধ্যে একাদশ জাতীয় সংসদের নির্বাচন সম্পন্ন করার সাংবিধানিক বাধ্যবাধকতা রয়েছে। নির্বাচন কমিশন কিছুটা সময় হাতে রেখে আগামী বছর ডিসেম্বরের শেষ দিকে এ নির্বাচন অনুষ্ঠানে আগ্রহী। এর আগে নিয়মিত কাজ হিসেবে নির্বাচন কমিশনকে জাতীয় সংসদ ও স্থানীয় সরকারের বিভিন্ন উপনির্বাচন ও স্থগিত থাকা নির্বাচনও করতে হবে।

এ ছাড়া জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পরপরই ২০১৯ সালের প্রথম দিকে দেশজুড়ে উপজেলা নির্বাচনের প্রস্তুতিও এ বছরই সম্পন্ন করে রাখতে হবে।

নির্বাচন বিশেষজ্ঞরা বলছেন, নতুন বছর শুধু নির্বাচনী বছরই নয়; দেশে গণতন্ত্রকে এগিয়ে নেওয়ার ক্ষেত্রে একটি মাইলফলক হিসেবেও এ

বছরটি চিহ্নিত হতে পারে। ২০১৮ সাল নির্বাচন কমিশন, সরকার, আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী,  প্রশাসন, রাজনৈতিক দল—সবার জন্য একটি পরীক্ষার বছর। একটি অবাধ, অংশগ্রহণমূলক ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচন অনুষ্ঠানে সংশ্লিষ্ট সবার আন্তরিকতা ও  নিরপেক্ষতার ওপরেই ভবিষ্যৎ নির্ভর করছে।

গত ১৮ নভেম্বর রাজধানীর ‘বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব ইন্টারন্যাশনাল অ্যান্ড স্ট্র্যাটেজিক স্টাডিজ’ মিলনায়তনে ‘বাংলাদেশের নতুন মধ্যবিত্ত, গণতন্ত্র ও ধর্মের প্রশ্ন’ শীর্ষক এক সেমিনারে বিশিষ্টজনরা আশঙ্কাও ব্যক্ত করেন যে দেশের রাজনীতিতে জবাবদিহি না এলে এবং অংশগ্রহণমূলক নির্বাচন না হলে দেশ দীর্ঘ মেয়াদে কর্তৃত্ববাদী শাসনে চলে যাবে।

এ বিষয়ে সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা এম হাফিজ উদ্দিন খান গতকাল রবিবার কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘নতুন বছরের নির্বাচনগুলো, বিশেষ করে জাতীয় সংসদ নির্বাচন কেমন হবে সে সম্পর্কে এখন পর্যন্ত কংক্রিট কোনো ধারণা পাওয়া যাচ্ছে না। ২০১৭ সালের শেষ প্রান্তে রংপুর সিটি নির্বাচন সুষ্ঠুভাবে সম্পন্ন হওয়াতে খুশি হয়েছিলাম। কিন্তু এর পরেই গত ২৮ ডিসেম্বর ইউনিয়ন পরিষদ (ইউপি) নির্বাচনসহ অন্যান্য নির্বাচনে যেসব অনিয়মের ঘটনা ঘটেছে, তা দুঃখজনক। নির্বাচন কমিশন এসব অনিয়মের বিরুদ্ধে কী ধরনের ব্যবস্থা নিয়েছে বা আদৌ নেবে কি না তাও পরিষ্কার নয়। বছরের প্রথম দিকে ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশন ও উত্তর-দক্ষিণ দুই সিটিতেই নতুন ওয়ার্ডগুলোতে কাউন্সিলর পদের নির্বাচন হতে যাচ্ছে। এ নির্বাচন কেমন হয় তা আমরা দেখার অপেক্ষায় আছি।’

নির্বাচন কমিশনার মাহবুব তালুকদার বলেন, ‘২০১৮ সাল হচ্ছে আমাদের জন্য মূল চ্যালেঞ্জের বছর। আমরা দায়িত্বগ্রহণের পর এই বছরে অনুষ্ঠেয় জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে কর্মপরিকল্পনা গ্রহণ করেছি। রাজনৈতিক দলসহ বিভিন্ন অংশীজনের সাথে সংলাপ করেছি। তবে ওই কর্মপরিকল্পনা অনুসারে সীমানা নির্ধারণের কাজ সম্পন্ন করতে পারিনি। এটাকে আবার রিশিডিউল করতে হবে।’

প্রসঙ্গত, কাজী রকিবউদ্দীন আহমদের নেতৃত্বাধীন আগের নির্বাচন কমিশন ২০১৩ সালে রাজশাহী, খুলনা, সিলেট, বরিশাল ও গাজীপুর সিটির নির্বাচন অংশগ্রহণমূলক ও সুষ্ঠুভাবে সম্পন্ন করে প্রশংসিত হলেও ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারি অনুষ্ঠিত দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে অংশগ্রহণমূলক করতে সফল হয়নি। ওই নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয় বিএনপি নেতৃত্বাধীন ২০ দলীয় জোটের বর্জন ও প্রতিহত করার কর্মসূচির মধ্যে। এতে ৩০০ আসনের মধ্যে ১৫৩ আসনেই বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় সংসদ সদস্য নির্বাচিত হওয়ার রেকর্ড সৃষ্টি হয়। ভোটগ্রহণ হয় ১৪৭টি আসনে। এ কারণে দেশের পাঁচটি জেলা জয়পুরহাট, রাজবাড়ী, মাদারীপুর, শরীয়তপুর ও চাঁদপুরে ভোটগ্রহণের কোনো প্রয়োজনই হয়নি। ঢাকা জেলার ২০টি আসনের মধ্যে ১১টিতে ভোটগ্রহণের প্রয়োজন হয়নি। চট্টগ্রামের ১৬টি আসনের আটটিতে ভোটাররা তাদের ভোটাধিকার প্রয়োগের সুযোগ পায়নি। সিরাজগঞ্জের ছয়টির মধ্যে পাঁচটি আসনেই ভোট হয়নি। নোয়াখালীর ছয়টি আসনের মধ্যে ভোট হয় মাত্র একটি আসনে। গাজীপুরের পাঁচ আসনের মধ্যে মাত্র একটিতে ভোটগ্রহণ হয়। নারায়ণগঞ্জেও পাঁচ আসনের মাত্র একটিতে ভোটগ্রহণ হয়। সিলেটের ছয়টি আসনের মধ্যে ভোটগ্রহণ হয় দুটিতে। দেশের ৪৯টি জেলায় আংশিক নির্বাচন সম্পন্ন হয়ে যায় বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতার ফলে। সব আসনে ভোটগ্রহণ হয় এমন জেলার সংখ্যা ছিল মাত্র ১০টি। এগুলো হচ্ছে পঞ্চগড়, মেহেরপুর, চুয়াডাঙ্গা, ঝিনাইদহ, বরগুনা, শেরপুর, গোপালগঞ্জ এবং পার্বত্য চট্টগ্রামের খাগড়াছড়ি, বান্দরবান ও রাঙ্গামাটি জেলা। ওই নির্বাচনে দেশের মোট ৯ কোটি ১৯ লাখ ৬৫ হাজার ৯৭৭ ভোটারের মধ্যে ভোট দেওয়ার সুযোগ ছিল চার কোটি ৩৯ লাখ ৩৮ হাজার ৯৩৮ জনের। এর মধ্যে নির্বাচন কমিশনের হিসাবে ভোট দিয়েছিল এক কোটি ৭১ লাখ ২৯ হাজার ৮৫০ জন। অর্থাৎ দশম সংসদ নির্বাচনে ভোট দেয়নি বা ভোট দেওয়ার প্রয়োজন হয়নি সাত কোটি ৪৮ লাখ ৩৬ হাজার ১২৭ জন ভোটারের।

দশম সংসদ নির্বাচনে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রসহ ঢাকাস্থ বিদেশি দূতাবাসগুলো নির্বাচন পর্যবেক্ষণে অংশ নেয়নি। ওই নির্বাচনে নির্বাচন কমিশনের আমন্ত্রণে সার্কভুক্ত দেশগুলোর নির্বাচন কমিশনের সংগঠন ফোরাম অব ইলেকশন ম্যানেজমেন্ট বডিস অব সাউথ এশিয়া (ফেমবোজা)-এর সদস্যদের মধ্যে  ভারত ও ভুটানের দুজন করে প্রতিনিধি পর্যবেক্ষণে আসেন। 

২০১৪ সালের জাতীয় সংসদ ও এরপর উপজেলা নির্বাচনের পর নির্বাচন কমিশনের (ইসি) সঙ্গে জাতিসংঘ ও উন্নয়ন সহযোগী বিভিন্ন দেশ ও সংস্থার দূরত্ব বাড়ে। জাতিসংঘের পক্ষ থেকে দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচন এবং এ নির্বাচনের পরে উপজেলা নির্বাচনের গ্রহণযোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন তুলে বাংলাদেশের নির্বাচনব্যবস্থাকে শক্তিশালী করার বিষয়ে চলমান প্রকল্পের লক্ষ্য (এসএএমবি প্রকল্প) পরিবর্তনের এবং এতে অর্থ সহযোগিতা কমিয়ে দেওয়ার সিদ্ধান্তের কথা জানায়। পরে ওই প্রকল্প বন্ধ করে দেওয়া হয়। বর্তমানে জাতিসংঘ ও উন্নয়ন সহযোগী বিভিন্ন দেশ ও সংস্থা আবার নির্বাচন কমিশনের সঙ্গে যোগাযোগ স্থাপন করেছে। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাও জানিয়ে রেখেছেন  আগামী সংসদ নির্বাচন প্রশ্নবিদ্ধ দেখতে চান না তিনি।



মন্তব্য