kalerkantho


‘মরে যাব, তবু এমপিও ছাড়া বাড়ি ফিরব না’

আমরণ অনশনে ৪২ শিক্ষক অসুস্থ

নিজস্ব প্রতিবেদক   

১ জানুয়ারি, ২০১৮ ০০:০০




‘মরে যাব, তবু এমপিও ছাড়া বাড়ি ফিরব না’

এমপিওভুক্তির দাবিতে জাতীয় প্রেস ক্লাবের সামনে গতকাল দ্বিতীয় দিনের মতো আমরণ অনশন কর্মসূচি পালন করেন শিক্ষকরা। ছবি : কালের কণ্ঠ

‘মরে যাব, তবুও এমপিও ছাড়া বাড়ি ফিরব না। কারণ বাড়িতে ফিরে গেলেও না খেয়ে মরতে হবে। এর চেয়ে ঢাকার রাজপথেই মরব। তাও আগামী প্রজন্ম জানতে পারবে, তাদের শিক্ষকরা কতটা অসহায়।’

গতকাল রবিবার জাতীয় প্রেস ক্লাবের সামনে অনশন পালন করা শিক্ষক এনামুল হক এসব কথা বলেন। তিনি ঠাকুরগাঁওয়ের পীরগঞ্জ উপজেলার একান্নপুর আদর্শ নিম্ন মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষক। ১৯৯৯ সাল থেকে তিনি বিনা বেতনে চাকরি করে আসছেন।

টানা পাঁচ দিন জাতীয় প্রেস ক্লাবের সামনে অবস্থান কর্মসূচি পালন শেষে গতকাল থেকে আমরণ অনশন কর্মসূচি শুরু করেছেন নন-এমপিও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান শিক্ষক-কর্মচারীরা। সরকার স্বীকৃত সব মাধ্যমিক বিদ্যালয়, কলেজ, মাদরাসা ও কারিগরি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এমপিওভুক্ত করার দাবিতে গত মঙ্গলবার থেকে তাঁরা অবস্থান কর্মসূচি পালন করার পর অনশন শুরু করেছেন। নন-এমপিও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান শিক্ষক-কর্মচারী ফেডারেশনের ডাকে এই কর্মসূচি চলছে। গতকাল রাতে শেষ খবর পাওয়া পর্যন্ত ৪২ জন শিক্ষক অসুস্থ হয়ে পড়েছেন বলে জানিয়েছেন সংগঠনের নেতারা।

অনশনস্থলে শিক্ষকদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায় তাঁদের দুঃখ-দুর্দশার কথা। কোনো রকম খেয়ে না খেয়ে জীবন পার করছেন তাঁরা। নিজের সন্তানদের ভালোভাবে পড়ালেখা তো দূরের কথা, একটা আবদারও ঠিকমতো পূরণ করতে পারছেন না। ১০ থেকে ২০ বছর পর্যন্ত বিনা বেতনে চাকরি করে যাচ্ছেন এসব শিক্ষক।

কথা হয় পটুয়াখালীর দশমিনা উপজেলার রনগোপালী তালিমুল কোরআন দাখিল মাদরাসার শিক্ষক মো. আরিফুল ইসলামের সঙ্গে। তিনি ২০০০ সাল থেকে বিনা বেতনে চাকরি করছেন। তিনি কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘দুঃখের কথা আর কী বলব? ছয় দিন আগে যখন ঢাকায় আসি আমার ছেলে তৃতীয় শ্রেণির শিক্ষার্থী বলেছে, একটা নতুন ব্যাগ কিনে আনতে। কিন্তু এই অবুঝ বাচ্চাকে কী করে বলব, আমার ব্যাগ কেনারও সামর্থ্য নেই। তাই সিদ্ধান্ত নিয়েছি, দাবি পূরণ না হলে কোনোভাবেই বাড়ি ফিরে যাব না।’

ময়মনসিংহের গফরগাঁওয়ের হুরমত উল্লাহ কলেজের শিক্ষক হারুনুর রশিদ বলেন, ‘১৮ বছর ধরে বিনা বেতনে চাকরি করছি। আর কত করা যায়? আমাদের কলেজের ফলাফল উপজেলার মধ্যে প্রথম। ২০১৭ সালের এইচএসসি পরীক্ষায় ৭৮ শতাংশ শিক্ষার্থী পাস করেছে। বিনা বেতনে চাকরি করলেও কর্তব্যে কোনো অবহেলা করিনি। এর পরও যদি এমপিওভুক্তির মতো ন্যূনতম দাবি সরকার পূরণ না করে তাহলে আমরা কোথায় যাব?’

গত ছয় দিন ধরে টানা কর্মসূচি পালন করলেও এখনো সরকারের পক্ষ থেকে কোনো আশ্বাস পাননি শিক্ষকরা। তবে গত শনিবার সচিবালয়ে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে শিক্ষামন্ত্রী নুরুল ইসলাম নাহিদ নন-এমপিও শিক্ষক-কর্মচারীদের আন্দোলন ছেড়ে বাড়ি ফিরে যেতে আহ্বান জানিয়েছেন। তিনি বলেছেন, ‘আমরা কোনো শিক্ষকের বেতনের বাইরে রাখতে চাই না। তাঁরা তো আমাদেরই পরিবারের অংশ। আমরা চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছি। এমপিওভুক্তির সঙ্গে অর্থ মন্ত্রণালয়ের অনুমোদন ও অর্থ ছাড়ের বিষয় জড়িত। আগামী বাজেটে এ বিষয়ে নতুনভাবে অর্থ বরাদ্দ দেওয়ার আশ্বাসও দেওয়া হয়েছে।’

ফেডারেশনের সভাপতি অধ্যক্ষ গোলাম মাহমুদুন্নবী ডলার গতকাল কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘শিক্ষামন্ত্রী আমাদের বাড়ি ফিরে যেতে বললেও আমরা যাব না। বাড়ি ফিরে তিলে তিলে মরার চেয়ে ঢাকার রাজপথেই মরব। আর এ রকম আশ্বাস আমরা আগেও পেয়েছি, কিন্তু তাতে কোনো কাজ হয়নি। যতক্ষণ আমাদের দাবি আদায় না হবে আমরা আমরণ অনশন চালিয়ে যাব।’

বর্তমানে সরকার কর্তৃক স্বীকৃত নন-এমপিও স্কুল, কলেজ ও মাদরাসার সংখ্যা পাঁচ হাজার ২৪২টি। এতে ৮০ হাজারের মতো শিক্ষক-কর্মচারী বিনা বেতনে চাকরি করছেন।



মন্তব্য