kalerkantho


যুদ্ধশিশু আনোয়ারা স্বজনদের খুঁজছেন

মাহতাব হোসেন   

১৬ ডিসেম্বর, ২০১৭ ০০:০০



যুদ্ধশিশু আনোয়ারা স্বজনদের খুঁজছেন

টঙ্গী শিশুসদনে শিশুকালে (বাঁয়ে); নেদারল্যান্ডসে নার্সিংয়ে পড়ার সময় (মাঝে) এবং বর্তমানে

‘আমার দুই মেয়ে, একজনের বয়স ১০ আরেকজনের ১১। তারা যখন জিজ্ঞেস করে তাদের নানা-নানি কে? আমি উত্তর দিতে পারি না। আমার হৃদয় চূর্ণবিচূর্ণ হয়ে যায়, কেননা আমি জানি না কে আমার মা কে আমার বাবা! এই দূর দেশে বসে আমার মন উতলা হয়ে যায় দেশের জন্য, আমার হারিয়ে যাওয়া স্বজনের জন্য।’ নেদারল্যান্ডস থেকে স্কাইপে কথাগুলো বলছিলেন আনোয়ারা, যাকে প্রায় ৪০ বছর আগে এদেশ থেকে যুদ্ধশিশু হিসেবে নেদারল্যান্ডসে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল। একটি সংস্থার মাধ্যমে নেদারল্যান্ডসের একটি পরিবারে পালিত সন্তান হিসেবে বেড়ে উঠেন আনোয়ারা। তাঁর বর্তমান নাম আনোয়ারা বেগম ডেকার নিউ।

নেদারল্যান্ডসের একটি শিক্ষক পরিবারে ঠাঁই হয় আনোয়ারার। পালক বাবা এভার্ট ডেকার হাই স্কুল শিক্ষক আর মা ম্যারিয়েন রেজনেভেল্ড বেসিক (প্রাথমিক) স্কুল শিক্ষক। নতুন মা-বাবার আশ্রয়ে জীবন বদলে যায় আনোয়ারার। বেসিক ও হাই স্কুল শেষ করে নার্সিংয়ে পড়াশোনা শুরু করেন। এখন স্থানীয় একটি হাসপাতালে কর্মরত। স্বামী টমাস নিউ একজন ব্যাংকার।

আনোয়ারা শুধু নিজের নাম বলতে পারেন। আর স্মৃতি হিসেবে মনে আছে ঢাকার অদূরে টঙ্গীর একটি শিশুসদনের কথা। সেখান থেকেই তাকে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল বিদেশে। আনোয়ারা বলেন, ‘ওই শিশুসদনে একটা গ্রুপে আমরা ৮-১০ জন ছিলাম, এতটুকুই মনে পড়ে। মাঝে মাঝে সম্ভবত আমাদের দিয়ে কাজ করানো হতো। আরেকটু স্পষ্ট করলে মনে পড়ে, আমি বাম হাত দিয়ে কী যেন গুঁড়া করতাম। আর ডান হাত দিয়ে কিছু একটা টেনে দিতে হতো আমাকে। ১৯৭৮ সালের ঘটনা এটা। এটা সংস্থার কাগজটায় পেয়েছিলাম। পরে বাসা পরিবর্তন করার সময় কাগজগুলো হারিয়ে যায়।’

নেদারল্যান্ডসের শিক্ষক পরিবারে মমতাময় পরিবেশে বেড়ে ওঠেন আনোয়ারা। নার্সিংয়ে পড়শোনা শেষ করার পর বিয়ে হয় তাঁর টমাস নিউয়ের সঙ্গে। পরে তাঁদের ঘর আলো করে আসে দুই সন্তান। স্বামী-সন্তান নিয়ে সুখের সংসার আনোয়ারার। কিন্তু রয়ে গেছে বড় এক শূন্যতা।

আনোয়ারা নিজের শিকড়ের সন্ধানে ১৯৯২ সালে প্রথম বাংলাদেশে এসেছিলেন। কিন্তু পরিচিত তেমন কেউ না থাকায় বেশি দিন থাকা সম্ভব হয়নি। টঙ্গী গিয়েও তিনি ছোটবেলার সেই স্থানটি খুঁজে বের করতে পারেননি। এরপর ২০০৫ সালে আবার বাংলাদেশে আসেন আনোয়ারা। সে সময়ই কিছু ডাচ্ বন্ধুর সহায়তায় বাংলাদেশি পাসপোর্ট সংগ্রহ করেন। আনোয়ারার ডাচ্ বন্ধুদের বাংলাদেশি বন্ধুরা এ বিষয়ে সহায়তা করেছিলেন।

আনোয়ারা কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘সে সময় বাংলাদেশি যাদের সঙ্গে কথা হয়েছে, আমি চেষ্টা করেছি আমার মা ও স্বজনদের খুঁজে পেতে। বাংলাদেশে আমার পরিচিত নেদারল্যান্ডসের কেউ গেলেই আমি একই কথা বলি। আমার স্বজনদের খুঁজে পাওয়া যায় কি না যাতে চেষ্টা করে। কিন্তু প্রতিবার নিরাশ হয়েছি।’

দূর দেশে বসে স্বজনদের কথা ভেবে চোখ ছলছল করে উঠত। নিরুপায় আনোয়ারা সবার অলক্ষ্যেই সেই চোখের জল আড়াল করেন। মেয়েরা যখন স্বজনদের কথা জিজ্ঞেস করত তখন আনোয়ারা উত্তর দিতে পারতেন না। তখনই তাগিদ অনুভব করেন নিজের মা ও অন্য স্বজনকে খুঁজে বের করতে। আনোয়ারা বিশ্বাস করেন, তাঁর মা এখনো বেঁচে আছেন।

মুক্তিযুদ্ধ সম্পর্কে অনেক কিছুই জানেন আনোয়ারা। পাকিস্তানি হায়েনারা যে এ দেশে নারকীয় হত্যাযজ্ঞ ও নির্যাতন চালিয়েছে তার জন্য তাদের বিচার হওয়া উচিত বলে মনে করেন তিনি। আনোয়ারা বলেন, ‘আজ আমার মতো কত শিশুর যে এই পরিণতি তার জন্য যারা দায়ী তাদের কঠোর ও দৃষ্টান্তমূলক বিচার হওয়া উচিত।’

সম্প্রতি আনোয়ারার এক বন্ধু বাংলাদেশে আসেন একটি প্রতিষ্ঠানে চাকরি নিয়ে। তখন আনোয়ারা তাঁর হারিয়ে যাওয়া স্বজনদের কথা বলেন তাঁকে। সেই বন্ধু নানাভাবে খোঁজ নেওয়ার চেষ্টা করে যাচ্ছেন। একপর্যায়ে স্থানীয় এক বন্ধুর মাধ্যমে শরণাপন্ন হন গণমাধ্যমের। সেই সূত্রেই আনোয়ারার সঙ্গে যোগাযোগ। আনোয়ারা বাংলা বলতে পারেন না।

আনোয়ারা বলেন, ‘আমার কাছে কোনো তথ্য নেই, আমি শুধু টঙ্গীর কথা জানি। আর আমার সে সময়ের দুটো ছবি রয়েছে। আমি জানি না এটা দিয়ে আমার স্বজনকে খুঁজে পাওয়া সম্ভব কি না। তবে আমি মনে-প্রাণে আমার হারিয়ে যাওয়া স্বজনকে খুঁজে পেতে চাই। আমি চাই, আমার মেয়েরা যেন জানে তাদের মায়ের শিকড়ের কথা, মায়ের স্বজনের কথা। তাদের মানসিক উন্নয়নে এটা খুবই প্রয়োজন।’ তিনি বাংলাদেশে যোগাযোগের জন্য ০১৮৪৭২৮৮১৯৪ এই নম্বরটি দিয়েছেন।



মন্তব্য