kalerkantho


লক্ষ্মীপুরে সিভিল সার্জনকে সাজা

নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটরা ক্ষমতার অপব্যবহার করছেন : হাইকোর্ট

নিজস্ব প্রতিবেদক   

১৪ ডিসেম্বর, ২০১৭ ০০:০০



ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনাকারী নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটরা ক্ষমতার অপব্যবহার করছেন বলে মন্তব্য করেছেন হাইকোর্ট। নিজ স্বার্থ রক্ষা ও ক্ষমতা প্রদর্শনের জন্য তাঁরা এই আইনেরও অপব্যবহার করছেন বলে মন্তব্য সর্বোচ্চ আদালতের।

লক্ষ্মীপুরে সাবেক ভারপ্রাপ্ত সিভিল সার্জনের সঙ্গে হাতাহাতি ও পরে তাঁকে ভ্রাম্যমাণ আদালতের মাধ্যমে সাজা দেওয়ার ঘটনায় অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (সার্বিক) শেখ মুর্শিদুল ইসলাম ও ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনাকারী সদর উপজেলার নির্বাহী কর্মকর্তা মো. নুরুজ্জামানের বিষয়ে আদেশের পর্যবেক্ষণে হাইকোর্ট এসব মন্তব্য করেন।

গতকাল বুধবার হাইকোর্টের বিচারপতি কাজী রেজা-উল হক ও বিচারপতি মোহাম্মদ উল্লাহর বেঞ্চ এ মন্তব্য করেন।

এদিকে ওই ঘটনায় শেখ মুর্শিদুল ইসলাম ও মো. নুরুজ্জামান যে ব্যাখ্যা দিয়েছেন তা পড়ে হাইকোর্ট বিস্ময় প্রকাশ করেছেন।

দুই নির্বাহী কর্মকর্তা ব্যাখ্যায় বলেছেন, লক্ষ্মীপুরের ডিসি কলোনির কাকলী স্কুলে পরীক্ষায় নকল ধরতে অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক সেখানে গিয়েছিলেন।

আদালত এ প্রসঙ্গে বলেন, ‘এটা প্রাইমারি স্কুল। যে স্কুলে প্রথম শ্রেণি থেকে চতুর্থ শ্রেণি পর্যন্ত ছাত্র-ছাত্রীদের পরীক্ষা হবে। আর সেই পরীক্ষায় নকল ধরতে একজন এডিসিকে পাঠানো হয়েছে, কী চমৎকার!’

আদালত অবশ্য দুই নির্বাহী কর্মকর্তাকে ক্ষমা করে দেন। তবে ভ্রাম্যমাণ আদালত সম্পর্কে বেশ কিছু পর্যবেক্ষণ দেন। একই সঙ্গে অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক ও নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটের এ রকম কর্মকাণ্ডের জন্য তাঁদের ভবিষ্যতে যেন এমন কোনো পর্যায়ে নিয়োগ দেওয়া না হয়, যেন তাঁরা ক্ষমতার অপব্যবহার করতে না পারেন সে জন্য আইনসচিব, স্বরাষ্ট্রসচিব ও জনপ্রশাসন সচিবকে নির্দেশ দেওয়া হয়।

লক্ষ্মীপুরের ডিসি কলোনিতে কাকলী শিশু অঙ্গন বিদ্যালয়ে প্রবেশ করাকে কেন্দ্র করে গত ৪ ডিসেম্বর সাবেক সিভিল সার্জন সালাহ উদ্দিন শরীফ ও অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক শেখ মুর্শিদুল ইসলামের মধ্যে প্রথমে কথা-কাটাকাটি ও পরে হাতাহাতি হয়। এ ঘটনায় সদর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মোহাম্মদ নুরুজ্জামান ভ্রাম্যমাণ আদালত বসিয়ে সালাহ উদ্দিন শরীফকে তিন মাসের বিনাশ্রম কারাদণ্ড দেন। এরপর তাঁকে পুলিশের হাতে তুলে দেওয়া হয়। পরে লক্ষ্মীপুর জেলা হাকিম আদালত থেকে জামিন পান সালাহ উদ্দিন শরীফ। এ নিয়ে বিভিন্ন গণমাধ্যমে সংবাদ প্রকাশিত হয়।

পরে গত ৫ ডিসেম্বর সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী কামাল হোসেন মিয়াজী এবং আশফাকুর রহমান সাবেক সিভিল সার্জনকে সাজা দেওয়ার বৈধতা চ্যালেঞ্জ করে রিট আবেদন করেন। ওই দিন শুনানি শেষে আদালত অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (সার্বিক) শেখ মুর্শিদুল ইসলাম এবং ইউএনও মোহাম্মদ নুরুজ্জামানকে তলব করেন। আদালতে হাজির হয়ে সাবেক ভারপ্রাপ্ত সিভিল সার্জনকে সাজা দেওয়ার বিষয়ে ব্যাখ্যা দিতে নির্দেশ দেওয়া হয়।

এই নির্দেশনার পাশাপাশি রুল জারি করেন। রুলে ক্ষমতার অপব্যবহার করে সালাহ উদ্দিন শরীফকে ভ্রাম্যমাণ আদালতের দেওয়া সাজা কেন অবৈধ ঘোষণা করা হবে না তা জানতে চাওয়া হয়। আইন, স্বরাষ্ট্র ও জনপ্রশাসন সচিব, লক্ষ্মীপুর জেলা প্রশাসক, অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক, ইউএনও এবং সিভিল সার্জনকে রুলের জবাব দিতে বলা হয়। গতকাল দুই নির্বাহী কর্মকর্তা আদালতে হাজির হয়ে নিঃশর্ত ক্ষমা চান।

আদালত আদেশে বলেন, রাষ্ট্রীয় ও সামাজিক প্রেক্ষাপটে ভ্রাম্যমাণ আদালতের প্রয়োজন রয়েছে তবে ক্ষমতার ও আইনের অপব্যবহার হচ্ছে।

আদালত আদেশে বলেন, একটি সভ্য সমাজে সরকারি কর্মকর্তার বিরুদ্ধে এমন কর্মকাণ্ড সম্পূর্ণ অনভিপ্রেত। এর আগে দেখা গেছে, নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট দিয়ে ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনার জন্য প্রণীত আইন অমান্য করে নিজ ইচ্ছামতো ক্ষমতার অপব্যবহার করে আদালতের কার্যক্রম পরিচালনা করা হয়েছে।

দুই নির্বাহী কর্মকর্তার ব্যাখ্যায় বলা হয়, স্কুল কর্তৃপক্ষের আবেদনেই জেলা প্রশাসক সেদিন অতিরিক্ত জেলা প্রশাসককে দায়িত্ব দিয়েছিলেন।

আদালত এ ব্যাখ্যা গ্রহণ না করে আদেশে বলেন, ‘প্রাথমিক একটি বেসরকারি বিদ্যালয়ে পরীক্ষা তদারকির জন্য একজন এডিসিকে নিয়োগ করেন, যা আদালতের কাছে সম্পূর্ণরূপে মিথ্যা-বানোয়াটরূপে প্রতীয়মান হয়েছে। কোথাও কোনো বেসরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে নকল তদারকির জন্য দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে বলে কখনোই দেখা যায়নি। তা ছাড়া কাকলী প্রাথমিক বিদ্যালয়টির পরীক্ষা তত্ত্বাবধানের জন্য বিদ্যালয় কর্তৃপক্ষই যথেষ্ট।’

আদালত বলেন, ‘স্বীয় স্বার্থের কারণে ঘটনা (হাতাহাতির) ঘটে যাওয়ার পর অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক টেলিফোনে তাঁকে (সদর উপজেলার নির্বাহী কর্মকর্তা মোহাম্মদ নুরুজ্জামানকে) তলব করেন। পরে তিনি ঘটনাস্থলে উপস্থিত হয়ে দণ্ডবিধির ১৮৬ ধারা অনুযায়ী ডাক্তার সালাহ উদ্দিনকে অযৌক্তিক শাস্তি দেন। ফলে স্পষ্ট হয় যে ঘটনা চলাকালে তিনি ঘটনাস্থলে উপস্থিত ছিলেন না। তাঁর সামনে ঘটনা ঘটেনি। নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট ঘটনাস্থলে উপস্থিত না থেকেই অতিরিক্ত জেলা প্রশাসকের নির্দেশে ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা করে ডাক্তার সালাহউদ্দিনকে শাস্তি দেন বলে স্পষ্ট প্রমাণ হয়।’

শুনানির সময় আদালতের জ্যেষ্ঠ বিচারক বলেন, ‘বাড়িতে বসে ভ্রাম্যমাণ আদালত চালানো হবে না। ম্যাজিস্ট্রেট বাড়িতে বসে আদেশ দিচ্ছেন, চলবে না।’

আদেশে আদালত সাবেক সিভিল সার্জন ও অতিরিক্ত জেলা প্রশাসকের হাতাহাতি সম্পর্কে বলেন, ‘সিভিল সার্জন একজন অবসরপ্রাপ্ত উচ্চপদস্থ সরকারি কর্মকর্তা। তাঁর আচরণ অনেক বেশি সহনশীল, গ্রহণযোগ্য পর্যায়ে থাকবে বলে আশা করি।’

আদালতে লক্ষ্মীপুরের অতিরিক্ত জেলা প্রশাসকের পক্ষে শুনানি করেন অ্যাডভোকেট আব্দুল বাসেত মজুমদার। সঙ্গে ছিলেন সাঈদ আহমেদ রাজা। আর ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনাকারী ইউএনও মোহাম্মদ নুরুজ্জামানের পক্ষে শুনানি করেন অ্যাডভোকেট ইউসুফ হোসেন হুমায়ুন।



মন্তব্য