kalerkantho


রোহিঙ্গা সংকটে গুরুতর নিরাপত্তা ও রাজনৈতিক ঝুঁকি দেখছে আইসিজি

কালের কণ্ঠ ডেস্ক   

৮ ডিসেম্বর, ২০১৭ ০০:০০



ব্রাসেলসভিত্তিক আন্তর্জাতিক গবেষণা ও পরামর্শ প্রতিষ্ঠান ইন্টারন্যাশনাল ক্রাইসিস গ্রুপ (আইসিজি) এক গবেষণা প্রতিবেদনে বলেছে, বাংলাদেশে রোহিঙ্গাদের দীর্ঘমেয়াদি অবস্থানের কারণে ‘মারাত্মক নিরাপত্তা ও রাজনৈতিক ঝুঁকির’ ইঙ্গিত পাওয়া গেছে। সংস্থাটি সতর্ক করে বলেছে, বেপরোয়া রোহিঙ্গাদের মধ্য থেকে উগ্রবাদী কর্মী সংগ্রহ করে তাদের মাধ্যমে আন্তঃসীমান্ত হামলা চালানোর আশঙ্কাও দিন দিন বাড়ছে।

এর মধ্য দিয়ে রোহিঙ্গাদের প্রত্যাবর্তনের সম্ভাবনাও বিনষ্ট হয়ে যেতে পারে, যার প্রভাব পড়বে এই অঞ্চলে।

গতকাল বৃহস্পতিবার ব্রাসেলসে ‘মিয়ানমারের রোহিঙ্গা সংকট নতুন অধ্যায়ে প্রবেশ করছে’ শীর্ষক প্রতিবেদনটি প্রকাশ করে পৃথিবীব্যাপী সংঘাত বন্ধে কর্মরত বেসরকারি ও স্বাধীন অ্যাডভোকেসি প্রতিষ্ঠান আইসিজি। মিয়ানমারের রোহিঙ্গা সংকট নিয়ে প্রতিবেদন বিশ্লেষণ, আরাকান রোহিঙ্গা স্যালভেশন আর্মির (আরসা) হামলার খবরের তথ্য-উপাত্ত, আরসার কয়েক সদস্যের সঙ্গে সাক্ষাত্কার এবং বাংলাদেশ ও মিয়ানমারের অন্যান্য উত্স থেকে প্রাপ্ত তথ্য নিয়ে এই প্রতিবেদন তৈরি করা হয়।

গবেষণা প্রতিবেদনে বলা হয়, রোহিঙ্গাদের সংকট সমাধানে মিয়ানমারের ওপর নতুন করে যেকোনো ধরনের নিষেধাজ্ঞা পরিস্থিতির বিপর্যয় ঘটাবে এবং রোহিঙ্গাদের প্রতি মিয়ানমার জনগোষ্ঠীর বিদ্বেষ বাড়িয়ে তুলবে। তাই আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের উচিত আনান কমিশনের সুপারিশ বাস্তবায়নের জন্য মিয়ানমার সরকারকে চাপের মধ্যে রাখা, যাতে রোহিঙ্গাদের প্রতি বৈষম্য ও জনবিচ্ছিন্নতার অবসান এবং নাগরিকত্ব প্রদানের বিষয় উল্লেখ রয়েছে।

প্রতিবেদনে বলা হয়, আরসার গত ২৫ আগস্ট হামলার জবাবে বিদ্বেষপরায়ণ রোহিঙ্গা সেনাবাহিনী ছয় লাখ ২০ হাজারের বেশি রোহিঙ্গাকে রাখাইন রাজ্য থেকে বাংলাদেশে পালাতে বাধ্য করেছে। সেই আরসা এখন সংঘবদ্ধ হতে দৃঢ়প্রতিজ্ঞ মনে হয়েছে। তারা বাংলাদেশে আশ্রয়শিবিরগুলোতে হতাশ রোহিঙ্গাদের ভবিষ্যৎ পরিকল্পনার অংশ হিসেবে নিজেদের দিকে টানতে পারে। আরসা বাংলাদেশে ঘাঁটি গেড়ে সদস্য সংগ্রহ ও প্রশিক্ষণ পরিচালনা এবং একপর্যায়ে তাদের আন্তঃসীমান্ত হামলায় ব্যবহার করতে পারে।

আইসিজির মতে, এর মধ্য দিয়ে একটি গভীর ‘সহিংসতা চক্র’ তৈরির আশঙ্কা খুবই প্রবল হয়ে উঠেছে।

এ ধরনের হামলার ঘটনা ঘটলে এর ফল হবে খুবই নেতিবাচক, যা বাংলাদেশ-মিয়ারমারের সম্পর্ককে চাপের মধ্যে ফেলবে। এতে রোহিঙ্গাদের প্রতি অবজ্ঞা আরো বাড়বে। তা শেষ পর্যন্ত রোহিঙ্গাদের প্রত্যাবাসনের সম্ভাবনাকেও ধূলিসাৎ করবে।

সাম্প্রতিক ইতিহাসে অন্যতম ভয়াবহ ঘটনা রোহিঙ্গা সংকটের কারণে বিশ্বব্যাপী তীব্র সমালোচনা চলছে। এই আন্তর্জাতিক প্রতিক্রিয়ায় দেশটির অভ্যন্তরে অত্যধিক প্রতিরক্ষামূলক ব্যবস্থা নিতেও দেখা গেছে। কারণ আরসার আবির্ভাবে দেশটিতে রোহিঙ্গাবিরোধী মনোভাবও কঠোর হয়ে উঠেছে।

আইসিজির প্রতিবেদনে সতর্ক করে আরো বলা হয়, চলমান সংকটের আরো ভয়াবহ ঝুঁকি হলো, এর মাধ্যমে আল-কায়েদা, ইসলামিক স্টেট ও অন্য আন্তর্জাতিক জিহাদি গ্রুপগুলোর মিয়ানমারে হামলার আহ্বানের ঘটনা মুসলিম বিশ্বে চাঞ্চল্য সৃষ্টি করেছে। আবার মিয়ানমার সেনাবাহিনীও বারবার রাখাইন রাজ্যে সামরিক অভিযানের পক্ষে ‘সন্ত্রাসী হুমকি’কে অজুহাত হিসেবে ব্যবহার করছে। যদিও আরসা আন্তর্জাতিক জিহাদি গ্রুপগুলোর সঙ্গে ব্যাপক যোগাযোগও রাখেনি। সংস্থাটি বলেছে, তারা কেবলই রোহিঙ্গাদের অধিকার রক্ষায় সংগ্রাম করছে।

এই পরিস্থিতিতে মিয়ানমারের ওপর আন্তর্জাতিক চাপ বাড়ছে। এই সপ্তাহেই জাতিসংঘের মানবাধিকার সংস্থার প্রধান বলেছেন, মিয়ানমারে গণহত্যা পরিচালনার উপাদান তাঁরা দেখছেন। একই সঙ্গে তিনি রোহিঙ্গাদের নিরাপদ ও টেকসই প্রত্যাবাসনের আহ্বান জানিয়েছেন। তবে মিয়ানমার দাবি করে আসছে, তারা কেবলই আরসার হামলার জবাবে প্রতিরক্ষামূলক ব্যবস্থা নিয়েছে এবং তাতে তারা অন্যায় কিছু করেনি। চীন রোহিঙ্গা সংকটে মধ্যস্থতার ভূমিকা পালন করলেও পশ্চিমা দেশগুলো থেকে চাপ বেড়েই চলেছে; বিশেষ করে ওয়াশিংটনের পক্ষ থেকে। ওয়াশিংটন চায় মিয়ানমারের সামরিক বাহিনীর কিছু কর্মকর্তার ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করতে। অথচ দেশটিতে সামরিক জান্তার সরাসরি শাসনের অবসানের পর গণতান্ত্রিক যাত্রার পুরস্কার হিসেবে নিষেধাজ্ঞা আস্তে আস্তে তুলে নেওয়া হয়েছিল। কিন্তু আইসিজির গবেষণা বলছে, নতুন কোনো নিষেধাজ্ঞা মিয়ানমার পরিস্থিতিকে আরো অবনতির দিকে নিয়ে যাবে এবং রোহিঙ্গাদের প্রতি বিদ্বেষ আরো বাড়াবে। সূত্র : এএফপি ও আইসিজি ওয়েবসাইট।


মন্তব্য