kalerkantho


সৌদিতে গ্রেপ্তার আতঙ্কে প্রবাসী বাংলাদেশিরা

হায়দার আলী   

২০ নভেম্বর, ২০১৭ ০০:০০



সৌদিতে গ্রেপ্তার আতঙ্কে প্রবাসী বাংলাদেশিরা

সৌদি আরবে অভিবাসী ও শ্রমিক আইন লঙ্ঘনের অভিযোগের ভিত্তিতে আটক অভিযান শুরু করেছে দেশটির নিরাপত্তা বাহিনী। গত তিন দিনে দেশটির বিভিন্ন রাজ্যে ২৪ হাজার অবৈধ প্রবাসীকে আটক করা হয়েছে।

তাদের মধ্যে বাংলাদেশির সংখ্যাটা সুনির্দিষ্ট করে জানা না গেলেও কয়েক শ হবে বলে ধারণা করা হচ্ছে। এ অবস্থায় অবৈধ হয়ে পড়া প্রবাসী বাংলাদেশিরা গ্রেপ্তার আতঙ্কে ভুগছে।

বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় শ্রমবাজার সৌদি আরবে ২৪ লাখের বেশি বাংলাদেশি রয়েছে। এদের মধ্যে দুই থেকে আড়াই লাখ প্রবাসী নানা কারণে সেখানে অবৈধ হয়ে পড়েছে। তাদের কাছে বৈধ কোনো কাগজপত্রও নেই। অবৈধ অভিবাসী গ্রেপ্তারে অভিযান শুরুর পর থেকে তাদের মধ্যে আতঙ্ক বিরাজ করছে। যে যার মতো করে নিজেকে আড়াল করে রাখার চেষ্টা করছে। গ্রেপ্তার এড়াতে অনেকে মরুভূমি এলাকায় কর্মরত পরিচিত বন্ধু কিংবা স্বদেশিদের বাড়িতে আশ্রয় নিচ্ছে।

সৌদি আরবে বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূত গোলাম মসীহর সঙ্গে মোবাইল ফোনে যোগাযোগ করা হলেও তিনি ফোন রিসিভ করেননি।

তবে দূতাবাসের একজন কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, ‘অবৈধ অভিবাসী আটকে সৌদি আরবজুড়েই সাঁড়াশি অভিযান চালানো হচ্ছে। এর মধ্যে মক্কা ও রিয়াদে সৌদি পুলিশের অভিযানে আটককৃতদের মধ্যে অনেক বাংলাদেশি কর্মী রয়েছে বলে আমরা মনে করছি। আমরা খোঁজখবর নিচ্ছি, বৈধকর্মীদের ভয়ের কোনো কারণ নেই। ’

দেশটির রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যম সৌদি গেজেট জানায়, অভিবাসী ও শ্রমিক আইন লঙ্ঘনের অভিযোগে সৌদি আরবে তিন দিনে প্রায় ২৪ হাজার অভিবাসীকে আটক করা হয়েছে। এদের মধ্যে অভিবাসী আইনে ১৫ হাজার ৭০২ এবং সীমান্ত নিরাপত্তা আইনে তিন হাজার ৮৮৩ জনকে আটক করা হয়। আর চার হাজার ৩৫৩ জনকে শ্রমিক আইনে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। এদের মধ্যে কোন দেশের কতজন নাগরিক রয়েছে তা নির্দিষ্ট করে জানানো হয়নি।

গেজেটে আরো বলা হয়, আটককৃতদের মধ্যে ৪২ শতাংশ মক্কা নগরী থেকে এবং ১৯ শতাংশ রিয়াদ থেকে আটক করা হয়েছে। এর বাইরে ১১ শতাংশ আসির, ৬ শতাংশ জাজান ও ৫ শতাংশ দেশটির পূর্বাঞ্চলীয় প্রদেশগুলো থেকে আটক করা হয়। অবৈধভাবে সীমান্ত পার হয়ে সৌদিতে প্রবেশের অভিযোগে গ্রেপ্তার করা হয় ৩৯৪ জনকে। গ্রেপ্তারকৃতদের মধ্যে আট হাজার ৪৩৩ জনকে সৌদি আরবের প্রবাসী দপ্তরে রাখা হয়েছে। তাদের মধ্যে সাত হাজার ৪৯১ জন পুুরুষ ও ৯৪২ জন নারী। আর অবৈধভাবে প্রবেশে সহায়তা করার অভিযোগে ২৫ সৌদি নাগরিককেও গ্রেপ্তার করা হয়েছে।

প্রথম দিনের অভিযানে সাত হাজার অবৈধ অভিবাসীকে আটকের পর সৌদি স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র মেজর জেনারেল মানসুর আল তুর্কি এক সংবাদ সম্মেলনে গত বৃহস্পতিবার জানান, দেশটির শ্রম আইন ও বসবাসসংক্রান্ত আইন ভঙ্গকারীদের বিরুদ্ধে বৃহস্পতিবার থেকে অভিযান শুরু করেছে নিরাপত্তা বাহিনী। অভিযানে বসবাসসংক্রান্ত আইন ভঙ্গকারীদের পাশাপাশি কাগজপত্রের মেয়াদ শেষ হয়ে যাওয়া ব্যক্তিদেরও আটক করা হচ্ছে। এমনকি যেসব সৌদি প্রতিষ্ঠান অবৈধ শ্রমিক নিয়োগ করেছে তাদেরও গ্রেপ্তার  করা হবে। গ্রেপ্তারকৃতদের অপরাধী হিসেবে বিবেচনা করা হবে না। তবে যাদের মেয়াদ শেষ হয়ে গেছে তাদের যত দ্রুত সম্ভব নিজ নিজ দেশে ফেরত পাঠানো হবে।

নারায়ণগঞ্জের বন্দর উপজেলার ধামগড় ইউনিয়নের জাঙ্গাল গ্রামের মৃত আবেদ আলীর তিন ছেলে তাহের আলী, রমজান আলী ও মোশারফ হোসেন থাকেন সৌদি আরবে। রমজান ও মোশারফ দাম্মাম শহরে থাকলেও তাহের থাকেন রিয়াদে। গতকাল রবিবার সন্ধ্যায় মোবাইল ফোনে কথা হয় রমজান আলীর সঙ্গে। কালের কণ্ঠকে তিনি বলেন, ‘বৃহস্পতিবার থেকে সৌদি আরবে কঠোর অভিযান শুরু করেছে পুলিশ। বিগত দিনের তুলনায় এই অভিযান অনেক কঠোর বলে মনে করছি আমরা। দাম্মাম প্রদেশে আমাদের সঙ্গে যাদের বৈধ কাগজপত্র নেই তারা কাজে বের হচ্ছে না। গ্রেপ্তার এড়াতে অনেকেই মরু অঞ্চলে পরিচিতজনদের বাড়িতে আশ্রয় নিয়েছে। ’ রিয়াদে বসবাসকারী তাহের আলী বলেন, ‘এখানে কঠোরভাবে অভিযান চালাচ্ছে পুলিশ। বৈধতার মেয়াদ শেষ হয়ে যাওয়া আমার পরিচিত তিন বাংলাদেশিও আটক হয়েছে। ’

টাঙ্গাইল সদর উপজেলার গালা ইউনিয়নের আনোয়ার হোসেনের ছেলে মিরাজ হোসেন থাকেন মক্কা নগরীতে। মিরাজ এখন নিজের কর্মস্থলে না গিয়ে দুই দিন আগে মরুভূমির পরিচিত এক ভারতীয় বন্ধুর সঙ্গে আছেন। তিনি বলেন, ‘ছয় বছর আগে সৌদি আরবে এসেছি। দেড় বছর ধরে আমার কাগজপত্র নেই। বাড়িতে যাব বলে আর কাগজ বৈধ করা হয়নি। পুলিশের চোখ ফাঁকি দিয়ে এত দিন পার করতে পারলেও এখন খুবই ভয়ে আছি। দুই দিন আগে মরুভূমিতে কর্মরত এক ভারতীয় বন্ধুর কাছে আছি। আমার সঙ্গে আরো চারজন আছে, যাদের কাগজপত্র নেই। ’

নরসিংদীর শিবপুর উপজেলার বাঘাব ইউনিয়নের আসলাম মিয়ার ছেলে ইস্রাফিল আলম থাকেন মক্কায়। অবৈধ হয়ে পড়া এই বাংলাদেশি বলেন, ‘শত শত পুলিশ একসঙ্গে বিভিন্ন কারখানা, প্রতিষ্ঠান ও মার্কেটে অভিযান চালাচ্ছে। মার্কেটের ছাদে ট্যাংকির এক কোণে লুকিয়ে থাকায় প্রথম যাত্রায় বেঁচে গেছি। আমার পরিচিত কয়েকজন গ্রেপ্তার হয়েছে। ’


মন্তব্য