kalerkantho


ইলিশ ধরা শুরু, আগের চেয়ে বেশি পাওয়ার প্রত্যাশা

শওকত আলী   

২৩ অক্টোবর, ২০১৭ ০০:০০



ইলিশ ধরা শুরু, আগের চেয়ে বেশি পাওয়ার প্রত্যাশা

২২ দিন বন্ধ থাকার পর গতকাল রবিবার থেকে রাত ১২টার পর আবারও শুরু হলো ইলিশ মাছ ধরা। মত্স্য অধিদপ্তর বলছে, নিষেধাজ্ঞার এ সময়টায় প্রচুর মা ইলিশ নদীতে এসেছে এবং ডিম ছেড়েছে।

ফলে এবার আগের চেয়ে বেশি পরিমাণ ইলিশ ধরা পড়বে বলে আশা করছে প্রতিষ্ঠানটি। প্রজনন মৌসুম উপলক্ষে ১ থেকে ২২ অক্টোবর পর্যন্ত ইলিশ ধরা, সংরক্ষণ, পরিবহন, বাজারজাতকরণ ও কেনাবেচার ওপর নিষেধাজ্ঞা জারি ছিল। গত রাত ১২টার পর ওই নিষেধাজ্ঞা উঠে গেছে।

এদিকে ইলিশ মাছ ধরা শুরু হলেও আগামী ১ নভেম্বর থেকে আসছে নতুন নিষেধাজ্ঞা। ওই সময় থেকে কোনো ধরনের জাটকা ইলিশ ধরা, সংরক্ষণ, পরিবহন, বাজারজাতকরণ ও কেনাবেচা করা যাবে না। জাটকা ইলিশ বলতে সাধারণত ১০ ইঞ্চির কম আকারের ইলিশকে বোঝানো হয়ে থাকে।

মত্স্য অধিদপ্তরের একাধিক কর্মকর্তা জানান, নদ-নদীর যেসব জায়গায় ইলিশ মাছ ডিম ছাড়ে সেখানে এই ২২ দিনে বিভিন্ন গবেষণা প্রতিষ্ঠান ও গবেষকরা ইলিশ নিয়ে প্রচুর পরীক্ষা-নিরীক্ষা করেছেন। তাঁদের দেওয়া তথ্য মতে, নির্ধারিত এ সময়ে প্রচুর ইলিশ নদীতে এসেছে এবং ডিম ছেড়েছে। এতে মাছ ধরা পুনরায় শুরু হওয়ার পর প্রচুর পরিমাণে ডিম ছাড়া এবং বড় আকারের ইলিশ ধরা পড়বে বলে আশা করছে মত্স্য অধিদপ্তর।

মত্স্য অধিদপ্তরের সহকারী পরিচালক মাসুদ আরা মমি কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘আমরা সব দিক থেকে চেষ্টা করেছি, যাতে কেউ এই ২২ দিন কোনো প্রকার ইলিশ ধরতে বা বিক্রি করতে না পারে। সেটাতে আমরা ভালো কাজ করেছি। কারণ আমাদের বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, প্রচুর পরিমাণে ইলিশ নিরাপদে ডিম ছাড়তে পেরেছে। এখন ইলিশ ধরা শুরু হলে প্রচুর পরিমাণে বড় ও ডিম ছাড়া ইলিশ পাওয়া যাবে বলে আমরা আশা করছি। ’ নিষেধাজ্ঞার সময়ে অভিযানের কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘আমরা অনেক বেশি সজাগ ছিলাম। আমাদের মানিকগঞ্জ সদর ও মুন্সীগঞ্জের লৌহজং উপজেলার দুই মত্স্য কর্মকর্তা জেলেদের ধরতে গিয়ে আহতও হয়েছেন। আশা করছি এর ফল আমরা পাব। ’ মত্স্য অধিদপ্তরের কর্মকর্তারা মনে করছেন, গত মধ্যরাত থেকে ইলিশ ধরা শুরু হওয়ায় দু-একদিনের মধ্যেই আবার ইলিশের বাজার জমজমাট হয়ে উঠবে, যেমনটা ছিল নিষেধাজ্ঞা জারি হওয়ার আগমুহূর্তে। ওই সময় অনেক সস্তায় ইলিশ পাওয়া গেছে।

নিষেধাজ্ঞার সময়েও অনেকে ইলিশ ধরতে গেছে। অভিযানের মাধ্যমে অনেককে শাস্তির আওতায় আনা হয়েছে। গত ২১ অক্টোবর পর্যন্ত পাওয়া তথ্যে দেখা গেছে, দুই হাজার ২৮৬ জন জেলেকে বিভিন্ন মেয়াদে সাজা দিয়েছেন ভ্রাম্যমাণ আদালত। গত বছর সাজা দেওয়া হয়েছিল এক হাজার ১৪১ জন জেলেকে। গত বছরের চেয়ে এবার নিষেধাজ্ঞার সময়ে জেলেদের ইলিশ ধরতে যাওয়ার প্রবণতা বেশি থাকার কারণ জানতে চাইলে মাসুদ আরা মমি বলেন, ‘আমরা জোর অভিযান চালিয়েছি, যার ফলই হচ্ছে এতগুলো মানুষকে জেল-জরিমানা করা। ’

সেপ্টেম্বরের শেষ দিক থেকে ডিমওয়ালা ইলিশ বিভিন্ন নদীতে আসতে শুরু করে। তারা নদীতে এসে ডিম ছাড়ে। এ সময়টায় যাতে ইলিশগুলো নিরাপদে ডিম ছাড়তে পারে, সে জন্য অক্টোবরের ২২ দিন ইলিশ ধরা পুরোপুরি নিষিদ্ধ থাকে। গত বছরও এ সময়টায় ইলিশ ধরা নিষিদ্ধ ছিল। যদিও আগের বছরগুলোতে নিষেধাজ্ঞা ছিল ১৫ দিন করে। মূলত চান্দ্রমাসের ভিত্তিতে প্রধান প্রজনন মৌসুম ধরে এ বছর আশ্বিন মাসের প্রথম পূর্ণিমার দিন এবং এর আগের চার দিন এবং পরের ১৭ দিনসহ মোট ২২ দিন ইলিশ ধরা বন্ধ রাখা হয়।

মত্স্য অধিদপ্তরের কর্মকর্তারা জানান, ইলিশ ধরা বন্ধ থাকার সময় ২৫টি জেলার মোট ১২২টি উপজেলায় জেলেদের মধ্যে ভিজিএফের আওতায় চাল বিতরণ করা হয়েছে। মোট সাত হাজার ৬৮৯ টন চাল দেওয়া হয়েছে তিন লাখ ৮৪ হাজার ৪৬২টি জেলে পরিবারকে। প্রতিটি পরিবার ২০ কেজি করে চাল পেয়েছে। আরো ৯টি উপজেলার আট হাজার ২৪৮টি পরিবারকে এই চাল দেওয়ার কার্যক্রম চলমান রয়েছে।

সাগরে ইলিশ ধরার তোড়জোড়

বরিশাল থেকে রফিকুল ইসলাম জানান, নিষেধাজ্ঞার ২২ দিন পর দক্ষিণ উপকূলে এখন চলছে সাগরে ইলিশ আহরণের প্রস্তুতি। তবে বৈরী আবহাওয়ার কারণে জেলেদের উত্কণ্ঠাও রয়েছে।

বরিশাল, পটুয়াখালী, ভোলা ও বরগুনা জেলার প্রত্যন্ত উপজেলার ট্রলার মালিক ও জেলেদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, কয়েক দিন থেকেই শুরু হয়েছে বৈরী আবহাওয়া। এর পরও সাগরে ইলিশ আহরণের প্রস্তুতি নিচ্ছে জেলেরা। তবে আবহাওয়া ভালো হলে সোমবার ভোর থেকে মাছ ধরার ট্রলারগুলো দল বেঁধে গভীর সাগরের পথে রওনা দেবে। দুর্যোগপূর্ণ আবহাওয়ার সময় সাগরে সাধারণত ঝাঁকে ঝাঁকে ইলিশ ধরা পড়ে। তা ছাড়া নিষেধাজ্ঞার পর জালে প্রচুর ইলিশ ধরা পড়ে।

বরগুনা ট্রলার মালিক সমিতির সভাপতি গোলাম মোস্তফা চৌধুরী সাংবাদিকদের বলেন, পাথরঘাটার প্রায় ৫০০ মাছ ধরার ট্রলার সাগরে ইলিশ আহরণের প্রস্তুতি নিচ্ছে। এ ছাড়া বরগুনা, আমতলী ও তালতলী উপজেলার শত শত ট্রলার মাছ ধরার প্রস্তুতি নিচ্ছে। প্রতিটি ট্রলারে গড়ে দেড় লাখ টাকার জ্বালানি, ২০-২২ জন মাঝিমাল্লার খাদ্য, তাদের বেতন, ওষুধপত্র, বরফসহ আনুষঙ্গিক তিন লাখ থেকে সাড়ে তিন লাখ টাকার ওপরে খরচ পড়ছে।

বরিশাল মত্স্য অধিদপ্তরের পরিচালক ড. কে এম আমিনুল হক বলেন, বিগত বছরগুলোর তুলনায় এ বছরের নিষেধাজ্ঞা অধিক কার্যকর হয়েছে। ২২ দিনের মধ্যে পূর্ণিমা ও অমাবস্যা হওয়ায় ৮০ শতাংশ মা ইলিশ ডিম ছাড়তে পেরেছে। তিনি বলেন, ডিম ছাড়ার পর মা ইলিশ দুর্বল অবস্থায় ঝাঁকে ঝাঁকে সাগরে ফিরে যাওয়ার পথে জেলেদের জালে ধরা পড়ে।


মন্তব্য