kalerkantho


জনস্বার্থে আদেশ দিতে পিছপা হন না সুপ্রিম কোর্ট

এম বদি-উজ-জামান   

১৮ জুলাই, ২০১৭ ০০:০০



জনস্বার্থে আদেশ দিতে পিছপা হন না সুপ্রিম কোর্ট

দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী হতদরিদ্র শানু মিয়ার সংসার চলত অন্যের সাহায্যে কিংবা ভিক্ষাবৃত্তির মাধ্যমে। ঢাকা ওয়াসার খোলা ম্যানহোলে পড়ে তিনি মারা গেলে সংসারে নেমে আসে ঘোর অন্ধকার।

কিন্তু সেই অন্ধকার বেশি দিন স্থায়ী হতে দেননি দেশের সর্বোচ্চ আদালত। সুপ্রিম কোর্টের হাইকোর্ট বিভাগ স্বতঃপ্রণোদিত হয়ে শানু মিয়ার পরিবারকে ৫০ লাখ টাকা ক্ষতিপূরণ দিতে নির্দেশ দিলেন ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন এবং ঢাকা ওয়াসাকে। এ ছাড়া পল্লী বিদ্যুতের ছেঁড়া তারে জড়িয়ে দুই হাত হারানো শরীয়তপুরের সিয়াম খানকে ক্ষতিপূরণ হিসেবে ৫০ লাখ টাকা দিতে নির্দেশ দিয়েছেন হাইকোর্ট এক জনস্বার্থ মামলার রায়ে। একইভাবে রাজধানীর একটি অংশে ভয়াবহ পরিবেশ দূষণ এবং জনস্বাস্থ্যের মারাত্মক ক্ষতি সাধন করা সত্ত্বেও যেসব চামড়াশিল্প মালিক নির্ধারিত সময়ের মধ্যে হাজারীবাগ থেকে তাঁদের শিল্পপ্রতিষ্ঠান সরাতে পারেননি তাঁদের প্রত্যেককে সংশ্লিষ্ট শ্রমিকদের কল্যাণে রাষ্ট্রীয় কোষাগারে ৫০ হাজার করে টাকা জমা দিতে নির্দেশ দিয়েছেন সুপ্রিম কোর্ট।

জনস্বার্থমূলক বিষয়ে এমন আরো অনেক দৃষ্টান্তমূলক আদেশ দিয়ে চলেছেন সুপ্রিম কোর্ট। ওই সব আদেশ দিতে গিয়ে সেটা কার বিরুদ্ধে যাচ্ছে তা দেখছেন না দেশের সর্বোচ্চ আদালত। যত ক্ষমতাধর বা অর্থবিত্তশালীই জড়িত থাকুন না কেন, দৃষ্টান্তমূলক আদেশ দিতে আদালত পিছপা হচ্ছেন না। এ ক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য হলো রাজধানীর হাতিরঝিলে থাকা বিজিএমইএ ভবন ভেঙে ফেলার চূড়ান্ত নির্দেশ, আমিনবাজারে মধুমতী মডেল টাউন প্রকল্পের জায়গা থেকে ভরাট করা মাটি অপসারণ করে আগের অবস্থায় ফিরিয়ে নেওয়ার আদেশ, ঢাকার চার নদী বুড়িগঙ্গা, শীতলক্ষ্যা, বালু ও তুরাগের সীমানা রক্ষার আদেশ, গুলশান ও বারিধারা লেক রক্ষার আদেশ ইত্যাদি। বাংলাদেশ তৈরি পোশাক প্রস্তুত ও রপ্তানিকারক সমিতির (বিজিএমইএ) ভবনসংক্রান্ত মামলায় শুনানিতে ব্যারিস্টার রফিক-উল হক ভবন রক্ষার পক্ষে বলেছিলেন, এ ভবন ভাঙা হলে দেশের অর্থনীতির চরম ক্ষতি হবে।

কিন্তু দেশের সর্বোচ্চ আদালত রায় দিয়েছেন ভবন ভেঙে ফেলতে।

ওই সব আদেশ প্রসঙ্গে প্রধান বিচারপতি সুরেন্দ্র কুমার সিনহা সম্প্রতি প্রকাশ্য আদালতে বলেছেন, ‘আমাদের বিচার বিভাগ বিচারের ক্ষেত্রে দৃষ্টান্ত রেখে চলেছে। নারায়ণগঞ্জের সাত খুনের মামলা গোটা দুনিয়ায় চাঞ্চল্যের সৃষ্টি করল। দেশের মানুষ ন্যায়বিচারের প্রত্যাশা করল। এই সুপ্রিম কোর্টের হস্তক্ষেপেই ওই মামলার জট খুলে গেল। এ ছাড়া সুপ্রিম কোর্টের হস্তক্ষেপে হাজারীবাগের ট্যানারি স্থানান্তরিত হয়েছে। এই শহর দূষণের হাত থেকে রক্ষা পেল। গুলশান ও বারিধারা লেক এবং শীতলক্ষ্যা, বুড়িগঙ্গা সুপ্রিম কোর্টের হস্তক্ষেপেই রক্ষা পেয়েছে। ’ তিনি বলেন, ‘আমরা বিচার করি বিচার বিভাগের স্বার্থে নয়, ন্যায়বিচারের স্বার্থে। দেশের জনগণের স্বার্থে ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠায় বিচার বিভাগ সব সময় পদক্ষেপ নিয়েছে। জনগণের স্বার্থ জড়িত থাকলে সেখানে যতই ক্ষমতাশালী থাকুক না কেন, বিচারকরা বিচার করতে ভয় পান না। ’

রাষ্ট্রের প্রধান আইন কর্মকর্তা অ্যাটর্নি জেনারেল মাহবুবে আলম কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘জনস্বার্থে আদেশ দিতে আমাদের সুপ্রিম কোর্ট কখনোই পিছপা হন না; এ রকম অনেক উদাহরণ রয়েছে। ’ তিনি বলেন, ‘হাতিরঝিল প্রকল্প দেখুন, বুড়িগঙ্গাসহ ঢাকার চারপাশের চারটি নদী রক্ষা, হাজারীবাগের ট্যানারি কারখানা স্থানান্তর—এমন অনেক উদাহরণ রয়েছে। ’

পরিবেশবাদী সংগঠন হিউম্যান রাইটস অ্যান্ড পিস ফর বাংলাদেশের (এইচআরপিবি) প্রেসিডেন্ট সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী অ্যাডভোকেট মনজিল মোরসেদ কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘কোনো মামলায় জনস্বার্থ জড়িত এবং পরিবেশ রক্ষার প্রশ্ন থাকলে সে ক্ষেত্রে আদেশ দিতে আদালত কুণ্ঠাবোধ করছেন না। প্রতিপক্ষ যতই শক্তিশালী হোক না কেন, তা দেখছেন না আদালত। ’


মন্তব্য