kalerkantho


‘মৃত্যু অবধারিত, কিন্তু যাব কই?’

এস এম রানা, কাউখালী (রাঙামাটি) থেকে ফিরে   

২০ জুন, ২০১৭ ০০:০০



‘মৃত্যু অবধারিত, কিন্তু যাব কই?’

বাড়ির ওপর এত দিন অটল দাঁড়িয়ে ছিল যে পাহাড়, তার অর্ধেকটা ধসে পড়েছে। বাকিটা ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায় কোনো রকমে ঝুলে আছে।

ফের ভারি বৃষ্টি হলে যেকোনো মুহূর্তে ধসে পড়তে পারে। কারো পুরো ঘর, কারো ঘরের একাধিক কক্ষ চাপা পড়েছে ধসের মাটিতে। মূল্যবান সব জিনিসপত্র চাপা পড়েছে। রান্নাঘরও ভেঙে গেছে। নষ্ট হয়েছে বিছানাপত্র। তবে আর কোনো বিকল্প না থাকায় ঝুঁকি জেনেও ভাঙা ঘর মেরামত করে নতুন করে বসতির আয়োজন চলছে পাহাড়ে। দুর্গত মানুষ যেন মৃত্যুর সঙ্গে সন্ধি করেই বেঁচে থাকার পথ খঁজছে।  

গত শনিবার রাঙামাটির কাউখালী এবং চট্টগ্রামের রাঙ্গুনিয়া উপজেলার পাহাড়ি এলাকা ঘুরে এই দৃশ্য দেখা গেছে। দুই উপজেলায় পাহাড়ধস ও বন্যার পানির স্রোতে মারা গেছে ৪৮ জন এবং সম্পূর্ণ বিধ্বস্ত ও আংশিক ক্ষতিগ্রস্ত ঘরের সংখ্যা প্রায় সাড়ে তিন হাজার।

দুই উপজেলার বিধ্বস্ত জনপদ ঘুরে দেখা গেছে, পাহাড় ধসে পড়েছে বিভিন্ন স্থানে। তবে ক্ষতি বেশি হয়েছে জনবসতি আছে এমন পাহাড়ে। কাউখালীর বেতছড়ি পাইনবাগান এলাকার বাসিন্দা রোজিনা বেগম (৫২) জানান, তাঁদের আদি বাড়ি সিলেটে। স্বামী আবদুস সাত্তারের সঙ্গে বিয়ের পর থেকেই তিনি কাউখালীতে বসত করছেন। ৩২ বছর ধরে আছেন সেখানে। গত মঙ্গলবার ভোরে সাহরি খাওয়ার পর ঘুমিয়ে ছিলেন। হঠাৎ প্রচণ্ড শব্দে শুনে চমকে ওঠেন। দেখেন ঘরের বেড়া ভেঙে পাহাড়ের মাটিতে চাপা পড়েছে বিছানাসহ ঘর। তখন মেয়েকে নিয়ে কোনো রকমে ঘর থেকে বেরিয়ে প্রাণ বাঁচান। সাত সদস্যের পরিবার, এখন ঘরে রান্না করে খাওয়ার ব্যবস্থাও নেই। ঘরের তিনটি কক্ষ বিধ্বস্ত  হয়েছে। তাঁর ছেলে মোহাম্মদ রুবেল পেশায় রাজমিস্ত্রি। এখন মা-ছেলে মিলে মাটি সরিয়ে ঘর সংস্কারের চেষ্টা করছেন। এই ঘরেই তাঁরা বসত করবেন। আর কোথাও যাওয়ার জায়গা নেই।

রুবেল জানান, ‘আমার বাবা এই পাহাড়ের কিছু অংশ কিনেছিলেন। অন্য কোনো জায়গা তো নেই যে সেখানে গিয়ে বসত করব। এ কারণেই ঘর সংস্কার করে থাকার চেষ্টা করছি। ’ পাহাড় যদি আবারও ধসে পড়ে?—রুবেলের সাফ জবাব, ‘মৃত্যু ছাড়া উপায় নেই। কিন্তু যাব কই?’

রুবেলদের পাশের ঘরটিও মাটিচাপায় ক্ষতিগ্রস্ত। রাজমিস্ত্রি মিজানুর রহমান ও তাঁর স্ত্রী রোজিনা আক্তার সেখানে দুই সন্তান নিয়ে বসত করেন। মঙ্গলবার সকালে তাঁদের ঘরেও মাটিচাপা পড়ে। পরে সন্তানদের নিয়ে অন্যের বাড়িতে গিয়ে আশ্রয় নেন। দুই দিন অন্য জায়গায় থাকার পর নিজের বাড়ি সংস্কার করে বসতির চেষ্টা করছেন। ঝুঁকিপূর্ণ পাহাড়ে কেন বসতি করছেন—জানতে চাইলে মিজানুর রহমানের মুখেও অভিন্ন কথা, ‘যাব কই, মৃত্যু হাতে নিয়েই পাহাড়ে আছি। ’

কাউখালী উপজেলা সদরের অদূরে ইছামতী নদীর ভাঙনে কচুখালীপাড়ার পাঁচ-ছয়টি ঘর বিলীন হয়ে গেছে। উপজেলা সদর রক্ষার্থে বাঁধ দিয়ে এই খালের গতিপথ পরিবর্তন করে দেওয়া হয়েছে। সেখানে বাঁকে পানির তোড়ে ভেসে গেছে ঘরগুলো। ঘর হারিয়ে এখন অন্যের ঘরে আশ্রয় নিয়েছেন মং থোয়াই মারমা (৭০), উক্রই মারমা (৪০), চাই হ্লা প্রু মারমা (৬০) ও মানু চিং মারমা (৫০)।

গত শনিবার দুপুরে দেখা গেছে, বৃদ্ধ ও নারীরা মিলে বিধ্বস্ত ঘর সংস্কারের চেষ্টা করছেন। চাই হ্লা প্রু মারমা জানান, তাঁদের ঘর নেই। অন্যের ঘরে আশ্রয় নিয়েছেন। খাবারও নেই। অর্থ সংকটের কারণে নতুন করে ঘর বানাতে পারছে না। স্থানীয় প্রশাসন ও সরকারিভাবে তাঁদের আর্থিক সহযোগিতা দেওয়া হয়নি। সরকারি সহযোগিতা তাঁদের খুবই বেশি প্রয়োজন। উক্রই মারমা, মানু চিং মারমাও বললেন একই কথা।  

কাউখালী বাজারের পাশেই ইছামতী খালের তীরে বাড়ি মোহাম্মদ কামাল হোসেনদের। তিন ভাই মিলে নতুন একটি টিনের বাড়ি করেছিলেন বছরখানেক আগে। বছর না ঘুরতেই ইছামতী খালের পানির তোড়ে ভেসে গেছে ঘর। ঘরের টিনগুলো এলোমেলো হয়ে আছে। সঙ্গে আসবাবপত্রও। কামাল বলেন, ‘তিন ভাই পরিবার নিয়ে ঘরটিতে থাকতাম। এখন ঘরও নেই। নতুন ঘর করার টাকাও নেই। ঘর হারিয়ে সন্তানদের নিয়ে প্রথমে স্কুলে আশ্রয় নিয়েছিলাম। এখন স্কুল থেকে এসে একটি এনজিও সংস্থার ঘরে আশ্রয় নিয়েছি। পরিবার পরিজন নিয়ে কিভাবে চলব বুঝতে পারছি না। ’

দুর্গতরা জানান, ঘর হারিয়েছেন প্রায় এক সপ্তাহ হতে চলল। এর মধ্যে নতুন তৈরি সম্ভব হয়নি। সংস্কারও ঠিকমতো করতে পারছেন না। অর্থ সংকটের চেয়ে বড় সমস্যা বৃষ্টি। বৃষ্টিতে নষ্ট হচ্ছে ঘরের জিনিসপত্র। ঠিকমতো খাবারও মিলছে না। অর্ধাহার-অনাহারে দিন কাটছে।


মন্তব্য