kalerkantho


তিন দিনের টানা বর্ষণ

হাওরের বাঁধ ভেঙে ডুবে গেছে হাজারো হেক্টর বোরো ধান

সুনামগঞ্জ ও হাওরাঞ্চল প্রতিনিধি   

১ এপ্রিল, ২০১৭ ০০:০০



হাওরের বাঁধ ভেঙে ডুবে গেছে হাজারো হেক্টর বোরো ধান

সুনামগঞ্জের দিরাই উপজেলায় ববমি হাওরের তুফানখালি ফসল রক্ষা বাঁধ ভেঙে তলিয়ে গেছে ফসল। বাঁধ মেরামতের চেষ্টা করেও ফসল বাঁচাতে পারেনি কৃষকরা। ছবি : কালের কণ্ঠ

সুনামগঞ্জ জেলার হাওরের একমাত্র ফসল বোরো ধান। কিন্তু তিন দিনের টানা বর্ষণ ও উজান থেকে নেমে আসা পাহাড়ি ঢলে পানি উন্নয়ন বোর্ডের বাঁধ ভেঙে তলিয়ে গেছে হাজার হাজার হেক্টর জমির বোরো ধান। ধর্মপাশার ডুবাইল, ফাঁশুয়া ও গুরমার হাওরের ফসল রক্ষা বাঁধ ভেঙে আধাপাকা ধান তলিয়ে যায়। অন্যান্য হাওরের ধানও রয়েছে ঝুঁকিতে। গত বৃহস্পতিবার রাত থেকে গতকাল শুক্রবার সকাল পর্যন্ত হাজার হাজার হেক্টর জমির ধান ডুবে গেছে বলে খবর পাওয়া গেছে; যার আর্থিক ক্ষতি প্রায় ১২ কোটি টাকা।

সংশ্লিষ্ট এলাকার কৃষকদের অভিযোগ, সুনামগঞ্জের পানি উন্নয়ন বোর্ডের অধীনে স্থানীয় জনপ্রতিনিধিদের দিয়ে গঠিত প্রকল্প বাস্তবায়ন কমিটি (পিআইসি) ও ঠিকাদাররা সময়মতো বাঁধ মেরামত না করার কারণে এই অবস্থার সৃষ্টি হয়েছে।

পানি উন্নয়ন বোর্ড সূত্রে জানা যায়, তিন দিন ধরে সুনামগঞ্জে মাঝারি ধরনের বৃষ্টিপাত হচ্ছে। বৃদ্ধি পেয়েছে পাহাড়ি ঢলও। এর ফলে হাওরে পানির চাপ বৃদ্ধি পাচ্ছে। ঝুঁকির মুখে পড়েছে ১৩৩টি হাওরের কাঁচা বোরো ধান। গত বৃহস্পতিবার রাত থেকে ধর্মপাশা, জামালগঞ্জ, বিশ্বম্ভরপুর ও দিরাই উপজেলার পাঁচটি হাওরের এক হাজার ৭০০ হেক্টর জমির সম্পূর্ণ বোরো ধান তলিয়ে গেছে। ধর্মপাশা উপজেলার চন্দ্রসোনার তাল, ডুবাইল, ফাঁশুয়া ও গুরমার হাওরের প্রায় এক হাজার ৫০০ হেক্টর জমির বোরো ধান তলিয়ে গেছে।

বিশ্বম্ভরপুর উপজেলার সোনাতলা কাইক্কার দাইর হাওরের ২০০ হেক্টর জমির বোরো ফসল তলিয়ে গেছে। গতকাল সকাল থেকে দিরাই উপজেলার বরাম হাওরের কাদিরপুর-সংলগ্ন তুফানখালী বাঁধ ভেঙে হাওরে পানি ঢুকতে শুরু করেছে। স্থানীয় কৃষকরা বাঁশ, বস্তা সংগ্রহ করে পানি আটকানোর চেষ্টা করছে। এ হাওরে তিন হাজার ২০০ হেক্টর জমি রয়েছে। এ ছাড়া ধর্মপাশা উপজেলার টগার হাওর, বোয়ালিয়া, শালদিঘা, কাইল্যানি, বাইনচাপড়া, ফোল দোয়ারি, বিশ্বম্ভরপুর উপজেলার খরচার হাওর, সদর ও দক্ষিণ উপজেলা দেখার হাওর, তাহিরপুর উপজেলার শনি ও মাটিয়ান হাওর, জগন্নাথপুর উপজেলার নলুয়া ও মইয়ার হাওর, জামালগঞ্জ উপজেলার পাগনার হাওরসহ জেলার অন্তত ১৩৩টি হাওরের ফসল ঝুঁকিতে রয়েছে। অন্যান্য হাওরে বিভিন্ন স্থান দিয়ে পানি ঢুকছে বলে কৃষক ও জনপ্রতিনিধিরা জানান।

সংশ্লিষ্ট এলাকাবাসী জানায়, কংস নদের পানির চাপে গত বৃহস্পতিবার রাত ৯টার দিকে ডুবাইল, মারাধারিয়া, চাদরা, কাইলানী পেরের খেও, উইরবন্ধ হাওরসহ ছোট-বড় ১০টি হাওরের প্রায় দুই হাজার হেক্টর জমির বোরো ফসল তলিয়ে যায়। রাত সাড়ে ১০টার দিকে বৌলাই নদের পানির চাপে উপজেলার চামরদানী ইউনিয়নের ফাঁশুয়া নামক স্থান দিয়ে ফসল রক্ষা বাঁধ ভেঙে ফাঁশুয়া হাওর ও এর লাগোয়া গুরমার হাওরে পানি ঢুকে প্রায় তিন হাজার হেক্টর জমির বোরো তলিয়ে গেছে।

ধর্মপাশা উপজেলার বানারসীপুর গ্রামের কৃষক শামছু মিয়া বলেন, ‘ফাঁশুয়া হাওরে আমার পাঁচ একর জমি আবাদ করেছিলাম। আর মাত্র এক সপ্তাহ পরেই ওই জমির ধান কাটার কথা ছিল। কিন্তু অসময়ে হাওরে পানি ঢুইক্ক্যা (ঢুকে) আমার সব শেষ হইয়া গেছে।’

জানা যায়, ২০১৬-১৭ অর্থবছরে পানি উন্নয়ন বোর্ড ৪৮টি হাওরের বোরো ফসল রক্ষা বাঁধের কাজ মেরামত, সংস্কার ও নতুন বাঁধ নির্মাণে ৫৫ কোটি টাকা বরাদ্দ পেয়েছিল। গত বছরের ১৫ ডিসেম্বর কাজ শুরুর কথা থাকলেও কাজ শুরু হয়েছিল এ বছরের ফেব্রুয়ারি মাসে। ফলে এখনো বাঁধের কাজ শেষ হয়নি। কোনো কোনো বাঁধে এখনো মাটি ফেলা হয়নি। গতকাল সকালে ধর্মপাশা উপজেলার সুখাইর রাজাপুর দক্ষিণ ইউনিয়নের ডুবাইল হাওরের ফসল রক্ষা বাঁধে মাটি না দেওয়ায় পানি ঢুকে ফসল তলিয়ে গেছে। পানি উন্নয়ন বোর্ড একজন ঠিকাদারকে বাঁধ নির্মাণের দায়িত্ব দিয়ে নিজেরাই তদারকির দায়িত্ব নিয়েছিল। ওই ঠিকাদার কাজ না করায় পানি ঢুকে ফসল তলিয়ে গেছে বলে কৃষকরা অভিযোগ করেছে।

সুখাইর রাজাপুর দক্ষিণ ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান আমানুর রাজা চৌধুরী বলেন, ‘ডুবাইল বাঁধে মাটি না ফেলায় পানি ঢুকে হাওরের ফসল তলিয়ে গেছে। পার্শ্ববর্তী অন্যান্য হাওরেরও একই অবস্থা। ফসল পাকার আগেই হাওর ডুবে যাওয়ায় এবার কৃষকরা বড় ক্ষতির মুখে পড়বে। একমুঠো ধানও এবার গোলায় তুলতে পারবে না কোনো কৃষক।’

সুনামগঞ্জের কৃষক নেতা ও জেলা সিপিবির সভাপতি চিত্তরঞ্জন তালুকদার বলেন, ‘যুক্তফ্রন্ট নির্বাচনের সময়েই আমরা হাওরাঞ্চলের নদ-নদী খননের দাবি জানিয়েছিলাম। সেই দাবি এখনো বাস্তবায়িত হয়নি। হাওরাঞ্চলের নদ-নদী-খাল ভরাট হয়ে যাওয়ায় সামান্য বৃষ্টিপাতেই হাওর তলিয়ে যায়। প্রতিবছর এভাবে অর্ধেকেরও বেশি ফসল নষ্ট হচ্ছে।’

সুনামগঞ্জ পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী মো. আফসর উদ্দিন বলেন, হঠাৎ প্রবল বর্ষণ ও পাহাড়ি ঢলে পানি বৃদ্ধি পাচ্ছে। এতে বিভিন্ন হাওরে পানি ঢুকে ফসলহানি ঘটাচ্ছে। ধর্মপাশায় চন্দ্রসোনার তাল হাওরের ফসল তলিয়ে গেছে। এ ছাড়া তাহিরপুর, জামালগঞ্জ, জগন্নাথপুর, বিশ্বম্ভরপুর হাওরের ফসলও ঝুঁকিতে রয়েছে বলে জানান।


মন্তব্য